
বন্যার পানিতে ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল আবদুল মালেকের পরিবারের। কিন্তু সেই পথই হয়ে উঠল মৃত্যুর ফাঁদ। ঝোড়ো বাতাসে ডিঙি নৌকা উল্টে তার স্ত্রী ও দুই সন্তান প্রাণে বাঁচলেও নিখোঁজ হন ১৩ বছরের মেয়ে হাসনাতুল জন্নাত ঝর্ণা। টানা চার ঘণ্টার উদ্বেগ, কান্না আর অপেক্ষার পর অবশেষে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তার নিথর মরদেহ উদ্ধার করে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ এলাকায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
দুপুর দেড়টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তার মরদেহ উদ্ধার করে। নিহত হাসনাতুল জন্নাত ঝর্ণা (১৩) ওই এলাকার কৃষক আবদুল মালেকের মেয়ে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বাড়ির চারপাশ তলিয়ে যায়। পানি বাড়তে থাকায় স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন আবদুল মালেক। প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র নিয়ে একটি ছোট ডিঙি নৌকায় রওনা হন তারা। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ঝোড়ো বাতাসে নৌকাটি ডুবে যায়।
পরিবারের সদস্যরা প্রাণপণ চেষ্টা করে বাঁচতে সক্ষম হলেও স্রোতের পানিতে ভেসে যায় ঝর্ণা। তার মা লাকি আক্তার (৩১) এবং দুই বোন জেরিন মনি (৯) ও শাওরিন মনি (৭) সাঁতার কেটে তীরে উঠতে পারলেও ঝর্ণাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
খবর পেয়ে চকরিয়া ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। পরে চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি দল এনে পানির নিচে তল্লাশি চালানো হয়।
চকরিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা দিদারুল হক বলেন, বন্যার পানিতে নৌকাডুবির ঘটনায় এক কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। পরে ডুবুরি দলের সহায়তায় প্রায় চার ঘণ্টা পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য কাইছার উদ্দিন বলেন, পরিবারটি শুধু নিরাপদ স্থানে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু দুর্যোগের মধ্যে সেই যাত্রাই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়াল।
তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় আহত দুই বোন জেরিন মনি ও শাওরিন মনিকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ঝর্ণার মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, গত পাঁচ দিনের ভারী ও অতিভারী বর্ষণে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়ার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল পাহাড়ি ঢল ও জলাবদ্ধতায় প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় নৌকাই এখন অনেকের একমাত্র ভরসা। তবে প্রতিকূল আবহাওয়ায় এসব নৌযাত্রা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।