ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

দিনাজপুরে পাটের নতুন বীজে প্রতিবছর সাশ্রয় ১০০ কোটি টাকা

দিনাজপুরে পাটের নতুন বীজে প্রতিবছর সাশ্রয় ১০০ কোটি টাকা

পাট রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম স্থানে থাকলেও একটি বড় বাধা ছিল এর বীজ। প্রতিবছর ভারত থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার পাটের বীজ আমদানি করতে হতো। তবে এই পরনির্ভরশীলতা কাটাতে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)।

সংস্থাটি উদ্ভাবিত ‘বিজেআরআই তোষা পাট-৯’ জাতের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পাটবীজে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে এই জাতটি মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের প্রদর্শনী প্লটে দেওয়া হয়েছে। এতে ভালো উৎপাদন পেয়েছেন কৃষকরা। পাটের ভালো আঁশের পাশাপাশি নিজ জমিতেই ব্যবহারের জন্য পাটবীজ উৎপাদন করছেন তারা, যা কৃষকদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। সেই সঙ্গে এবার পাটের ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা এ জাতের উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

বিজ্ঞানীদের মতে, নতুন এই জাতটি স্বল্পমেয়াদি ও অধিক ফলনশীল। এ জাতের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—মাত্র ১০০ থেকে ১১০ দিনের মধ্যে ভালো মানের বীজ পাওয়া যায়। প্রতি হেক্টরে আঁশের ফলন প্রায় ৩ দশমিক ২৫ টন। গোড়া পচা রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ অনেক কম হয়। জলাবদ্ধ মাটি বা পরিত্যক্ত জমিতেও এ পাট ভালো জন্মে। স্বল্প জীবনকাল হওয়ায় একই জমিতে বছরে ৩ থেকে ৪টি ফসল ফলানো সম্ভব।

দিনাজপুরের নশিপুর এলাকার পাটবীজ উৎপাদন ও গবেষণা কেন্দ্রে ১০ একর জমিতে এ জাতের প্রজনন বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে। এই বীজ দেওয়া হবে বাংলাদেশ এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (বিএডিসি)-কে। বিএডিসি এই পাটবীজ তাদের জমিতে আবাদ করে আরও বেশি উৎপাদন করবে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে দেবে। এ ছাড়া জেলার ৪৫ জন কৃষককে এই বীজের প্রদর্শনী প্লট দেওয়া হয়েছে।

চিরিরবন্দরের কৃষক সেকেন্দার আলী জানান, নতুন জাতটি লম্বা ও সতেজ হওয়ায় আঁশ যেমন ভালো পাওয়া যায়, তেমনি বীজ রেখে পরের বছরের জন্য নিশ্চিন্ত থাকা যায়। পাট পচানোর জায়গার অভাব থাকলেও ভালো দাম পাওয়ায় তারা এখন কৃত্রিমভাবে জলাশয় তৈরি করে পাট পচাতেও আগ্রহী।

পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. নার্গীস আক্তার জানান, দেশে বছরে পাটবীজের চাহিদা ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টন। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রজনন বীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই প্রজনন বীজ বিএডিসির মাধ্যমে সারাদেশের কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান জানান, পাটকে আবারও সোনালি আঁশের গৌরবে ফিরিয়ে আনতে ২৫ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য একটাই—বিদেশি বীজের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের লাভবান করা এবং পরিবেশবান্ধব পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি করা।

চিরিরবন্দরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুভাশীষ অধিকারী বলেন, এবার পাটের দাম ভালো। এ কারণে কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। তোষা পাট-৯ জাতটি ভালো এবং কৃষকরা সহজলভ্যভাবে এই বীজ পাচ্ছেন। এই জাতে নিড়ানি কম লাগে এবং পতিত জমিতেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। পাট ও বীজ উৎপাদনকারী কৃষকরাও ভালো দাম পাচ্ছেন। কৃষকরা ভালো দাম পেলে কৃত্রিমভাবেই জলাশয় তৈরি করে পাট পচানোর ব্যবস্থা করবেন।

দিনাজপুর পাটবীজ উৎপাদন ও গবেষণা কেন্দ্রের জেএফএ মোজাম্মেল হক বলেন, দিনাজপুর অঞ্চলে পাটচাষিদের বীজের ঘাটতি রয়েছে। তোষা পাট-৯-এর জীবনকাল ১০০ দিন এবং ফলনও ভালো। এই ঘাটতি সমাধানে আমরা ৪৫ জন কৃষকের মাধ্যমে বীজ উৎপাদন করেছি। তারা নিজেরাই বীজ উৎপাদন করছেন। এতে তাদের চাহিদা পূরণ হবে এবং বীজ বিক্রি করে অন্য কৃষকদের ঘাটতিও পূরণ করতে পারবেন।

দিনাজপুর পাটবীজ উৎপাদন ও গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোস্তানছির বিল্লাহ বলেন, পাট চাষের জন্য নতুন তোষা পাট-৯ জাতটি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। ফলাফলে আমরা সন্তুষ্ট এবং এটি মাঠ পর্যায়ে দেওয়ার উপযোগী।

কৃষকদের প্রদর্শনী প্লট দেওয়া হয়েছে, যার ফলাফল অনেক ভালো। পাটের উপযুক্ত দাম নিশ্চিত করা গেলে এবং পচানোর সময় কমানো সম্ভব হলে কৃষকরা পাট চাষে আরও আগ্রহী হবেন। এতে এ বছর প্রচুর পাট উৎপাদন হবে। তবে পাট পচানোর জন্য জলাশয়ের অভাব রয়েছে। এ জন্য নতুন প্রযুক্তিও উদ্ভাবন করা হচ্ছে। পাশাপাশি মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করা হচ্ছে।

১০০ কোটি টাকা,প্রতিবছর সাশ্রয়,পাটের নতুন বীজ,দিনাজপুর
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত