
প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে দিনাজপুরে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বেতের তৈরি বিভিন্ন পণ্য। একসময় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হাতপাখা, কুলা, ডালি, ঝুড়ি কিংবা মাছ ধরার ডার্কি এখন ক্রমেই জায়গা হারাচ্ছে আধুনিক ও সস্তা প্লাস্টিক সামগ্রীর কাছে। ফলে চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এই কুটির শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগররা।
দিনাজপুরের বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, শ্রম ও সময়ের যথাযথ মূল্য না পাওয়ায় বাঁশ-বেতের পণ্য তৈরির সঙ্গে জড়িত কারিগরদের অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েছেন। আধুনিকতার ছোঁয়া এবং বাজারে সস্তা প্লাস্টিক পণ্যের ব্যাপক সরবরাহের কারণে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি এখন বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সেতাবগঞ্জ হাটে সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁশের তৈরি পণ্যের বেচাকেনা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। একই সঙ্গে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত বাঁশের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারজাতকরণের নানা জটিলতা। ফলে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না কারিগররা।
এ অবস্থায় জীবন-জীবিকার তাগিদে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দিনমজুরি কিংবা ইজিবাইক চালানোর মতো বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকছেন।
৪০ বছর ধরে বাঁশের কাজের সঙ্গে জড়িত অভিজ্ঞ কারিগর বিপ্লব পাল আক্ষেপ করে বলেন, ‘‘আগে বাঁশের কাজ করে সংসার খুব ভালো চলত। এখন আর চলে না। ছেলে-মেয়েরাও এই কাজ শিখতে চায় না, সবাই অন্য কাজ খুঁজছে।’’
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ৩০ বছর ধরে এ পেশায় থাকা মহেশচন্দ্র রায় ও প্রবীণ কারিগর অনিল পাল। তাদের ভাষ্যমতে, পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখার তাগিদেই তারা নামমাত্র লাভে এখনও এই পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন।
কারিগর নিখিল সরকার জানান, অভাবের কারণে বড় ছেলেকে বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় পাঠাতে হয়েছে।
তবে এই সংকটের মধ্যেও বাঁশের পণ্যে আধুনিকতার ছোঁয়া এনে আশার আলো দেখাচ্ছেন শফিকুল ইসলামের মতো কিছু দূরদর্শী কারিগর। বর্তমান সময়ের মানুষের রুচির কথা মাথায় রেখে বাঁশের তৈরি পণ্যে নতুন রূপ, নকশা ও রঙের বৈচিত্র্য আনায় তিনি সাফল্য পাচ্ছেন।
কারিগর শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘নতুন প্রজন্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এখন রং-চং করে নতুন আঙ্গিকে পণ্য তৈরি করছি। এতে বিক্রি ভালো হচ্ছে এবং ভালো লাভও পাচ্ছি।’’
তরুণ উদ্যোক্তা আরিফ হোসেন মনে করেন, বাঁশের পণ্য শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ নয়, এটি দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক ডিজাইন এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), দিনাজপুরের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাহেদুল ইসলাম জানান, শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। কারিগরদের দক্ষতা বাড়াতে কমপক্ষে তিন মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি আগ্রহী কারিগরদের ঋণ সহায়তা ও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে এই শিল্পকে টেকসই করার আশ্বাস দেন তিনি।