
আমের মৌসুম শেষের পথে। অথচ আশ্বিনেও দিনাজপুরের বাজারে মিলছে হলুদ রঙের মিষ্টি কাটিমন আম। ফলে অনেক ক্রেতার মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে—এতদিন পরও আমগুলো কীভাবে সতেজ রয়েছে, এতে কোনো কেমিক্যাল বা ফরমালিন ব্যবহার করা হয়েছে কি না।
সম্প্রতি দিনাজপুর শহরের গোর-এ শহীদ ময়দানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ভ্যানে করে কাটিমন আম বিক্রি করতে দেখা যায়। হলুদ রঙের আম দেখে অনেকেই কিনতে ভিড় করলেও কেউ কেউ কেমিক্যাল ব্যবহারের আশঙ্কায় আম কিনতে আগ্রহ দেখাননি।
দিনাজপুর সদর উপজেলার আউলিয়াপুর গ্রামের রফিকুলও কাটিমন আম সম্পর্কে ধারণা না থাকায় মেয়ের আবদার পূরণ না করেই ফিরে যান। তার মতো অনেক ক্রেতাই মনে করেন, আমের স্বাভাবিক মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বাজারে এত সতেজ আম থাকার পেছনে কেমিক্যালের ব্যবহার থাকতে পারে।
বর্তমানে দিনাজপুরের বাজারে কাটিমন, বারি-৪, গৌড়মতি ও আশ্বিনা জাতের আম পাওয়া যাচ্ছে। এসব আমের কেজি ২০০ থেকে ২২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কাটিমন আমগুলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলা থেকে দিনাজপুরে আসছে। ফলের দোকানের পাশাপাশি ভাসমান দোকানেও এখন কাটিমন আমের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ থেকে কাটিমন আম নিয়ে দিনাজপুরে আসা বাগান মালিক খুরশেদ আলম বলেন, তিনি ২৩ একর জমিতে কাটিমন আমের চাষ করেছেন। ১৪ মণ আম নিয়ে দিনাজপুরে এসেছেন তিনি।
খুরশেদ আলম বলেন, ‘কাটিমন আম বর্তমান সময়ের আম। এ আম কোনো কীটনাশক বা ফরমালিন ছাড়াই গাছ থেকে নামানোর পর ১৫-২০ দিন স্বাভাবিক থাকে। কাজেই এই আমে ফরমালিন বা ক্ষতিকর কীটনাশক দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে অনেকে আতঙ্কিত হয়ে এই আম কিনতে বা খেতে চান না। তারা আসলে ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে রয়েছেন।’
বাহাদুর বাজারের ফল ব্যবসায়ী সোহেল রানা, লিটন হোসেন ও রানা বলেন, বাজারে বর্তমানে কাটিমন, বারি-৪, গৌড়মতি ও আশ্বিনা জাতের আমের মৌসুম চলছে। তবে এসব আমে ‘মেডিসিন’ দেওয়া হয়েছে—এমন ধারণা অনেক ক্রেতার মধ্যে রয়েছে। আশ্বিন মাসেও এসব আম পাওয়া যায়, এ বিষয়েও অনেক ক্রেতার ধারণা নেই। ফলে বিক্রি তুলনামূলক কম হচ্ছে।
দিনাজপুর জেলা ক্যাবের প্রচার সম্পাদক মাসউদ রানা বলেন, কাটিমন আম প্রাকৃতিকভাবেই দীর্ঘদিন শক্ত ও সতেজ থাকে। এ জাতের আমে পানির পরিমাণ কম এবং আঁশ ও শাঁস ঘন হওয়ায় দীর্ঘদিন ভালো থাকে। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দ্রুত পাকানো বা দীর্ঘক্ষণ সংরক্ষণের জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড বা অন্যান্য প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করতে পারেন বলেও তিনি জানান।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) কৃষি অনুষদের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. হাসানুর রহমান রাজু জানান, বর্তমানে কাটিমন, বারি-৪, গৌড়মতি ও আশ্বিনা আমের ভরা মৌসুম চলছে।
তিনি বলেন, এসব আম অন্য জেলা থেকে আসায় দিনাজপুরের মানুষ এ জাতের আমের সঙ্গে তেমন পরিচিত নন। তবে বর্তমানে দিনাজপুরে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে কাটিমন আম। হলুদ রঙের হওয়ায় এবং দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ায় সহজেই ক্রেতাদের দৃষ্টি কাড়ে। আমের আঁশ ও শাঁস ঘন হওয়ায় এটি দীর্ঘদিন ভালো থাকে। গাছ থেকে পাড়ার পরও ২০-২৫ দিন পর্যন্ত আমে তেমন পরিবর্তন হয় না বলে জানান তিনি।
কাটিমন আম খাওয়ার বিষয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে ড. মো. হাসানুর রহমান রাজু বলেন, ‘কোনো প্রকার সংশয় ছাড়াই এই আম সবাই খাবেন। স্বাদ বেশি পেতে একটু শক্ত থাকা অবস্থাতেই খাবেন।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন বলেন, এসব আম সাধারণত ব্যাগিং পদ্ধতিতে চাষ করা হয়। ফলে স্প্রে বা কীটনাশক দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। এছাড়া আমগুলোর আঁশ ও শাঁস ঘন এবং পানির পরিমাণ কম হওয়ায় দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়।
তিনি বলেন, পরিপক্ব আম খেতে হলে বড় আকারের আম কেনা উচিত। ছোট আকারের আম অনেক সময় অপরিপক্ব হতে পারে।