
পাবনার সাঁথিয়ায় নিজের সন্তানের কাছে আশ্রয় ও ভরণপোষণ না পাওয়া অসহায় মা মুন্নি খাতুনের পাশে দাঁড়িয়েছেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) পাবনা জেলা শাখার সদস্যসচিব ডা. আহমেদ মোস্তফা নোমান। তিনি ওই মায়ের ভরণপোষণ ও চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছেন। একই সঙ্গে মুন্নি খাতুনকে আর্থিক সহায়তাও দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সাঁথিয়া পৌর এলাকায় মুন্নি খাতুনের বোনের বাড়িতে গিয়ে তার ভরণপোষণ ও চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানান ডা. আহমেদ মোস্তফা নোমান। তিনি পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং ড্যাবের পাবনা জেলা শাখার সদস্যসচিব।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে মা ও ছেলের ভরণপোষণ-সংক্রান্ত শুনানির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে মায়ের দায়িত্ব নিতে ছেলের অনীহার বিষয়টি উঠে এলে তা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভিডিওটি দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে অসহায় ওই মায়ের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন বলে জানান আহমেদ মোস্তফা নোমান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মুন্নি খাতুনের ছেলে সাগর হোসেন পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদে গ্রামপুলিশ হিসেবে কর্মরত। মায়ের ভরণপোষণ ও আশ্রয়ের বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে শুনানি হয়।
শুনানিতে ইউএনও সেলিম আহমেদ ছেলেকে মায়ের সঙ্গে থাকার জন্য বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেন। তবে মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে রাজি হননি সাগর। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করব। তাও আমার মাকে সঙ্গে নিতে পারব না। স্যার, আপনি বলে দেন, আমি মাকে মাসে কত টাকা দেব?’
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিষয়টি সমাধানের জন্য সাগরকে কয়েক দিনের সময় দেন ইউএনও। এ সময়ের মধ্যে মায়ের ভরণপোষণ ও আশ্রয়ের বিষয়ে একটি সম্মানজনক সমাধানে আসতে তাকে নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
বিএনপি নেতা আহমেদ মোস্তফা নোমান বলেন, ‘অসহায় এই মায়ের দুর্দশার কথা শোনার পর নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারিনি। একজন মা জীবনের শেষ সময়ে এসে এমন অসহায় অবস্থায় থাকবেন, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাই তাঁর পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ থেকেই ছুটে এসেছি। আমি মনে করি, মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই মুন্নি খাতুনের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছি। যতদিন প্রয়োজন, সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁর পাশে থাকার চেষ্টা করব। সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষদেরও এ ধরনের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।’
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মুন্নি খাতুনের স্বামী সিরাজুল ইসলাম অনেক আগেই মারা গেছেন। তাঁদের দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বৃদ্ধ ও অসুস্থ মুন্নি খাতুনের এখন একমাত্র অবলম্বন ছেলে সাগর। কিন্তু ছেলের বিয়ের পর থেকেই তাঁদের পারিবারিক কলহ শুরু হয়। একপর্যায়ে মাকে ভরণপোষণ দেওয়া বন্ধ করে দেন সাগর এবং নিজের সঙ্গে রাখতেও অনীহা প্রকাশ করেন।
মুন্নি খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার স্বামী অনেক আগেই মারা গেছেন, মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে। আমি একজন হার্টের রোগী। এই অবস্থায় ছেলেকে ছাড়া আমার আর কে আছে? আমি তো টাকা-পয়সা চাই না; নুন-পান্তা খেয়ে হলেও ছেলের সঙ্গে বাকি জীবনটা পার করে দিতে চাই। আমি মায়ের অধিকার নিয়ে ছেলের ঘরে একটু আশ্রয় চেয়েছি, এর বেশি তো কিছু চাইনি।’
নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান বলেন, মা-ছেলের এই বিরোধ মেটাতে তিনি শুরু থেকেই চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ছেলে কিছুতেই রাজি হয়নি। স্থানীয়ভাবে তাঁরা ব্যর্থ হওয়ার পরই মুন্নি খাতুন ইউএনওর কাছে যান।
সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর উভয় পক্ষকে ডেকে শুনানি করা হয়েছে। একজন বৃদ্ধ ও অসুস্থ মা তাঁর ছেলের কাছে আশ্রয় ও ভরণপোষণ প্রত্যাশা করছেন। ছেলেকে বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার জন্য বোঝানো হয়েছে এবং তাকে কয়েক দিনের সময় দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কীভাবে বিষয়টি সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পারিবারিক বিষয়টি যেন আরও জটিল না হয় এবং বৃদ্ধা মা যেন কষ্ট না পান, সেদিকে খেয়াল রেখেই সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।