
ঢাক-ঢোল ও কাঁশি-সানাইয়ের বাদ্য-বাজনা ছাড়া পূর্ণতা পায় না দুর্গাপূজা। পূজার প্রতিটি পর্বে তাই প্রয়োজন ঢাকের গর্জন ও সুরের আবহ। এই প্রয়োজন থেকেই প্রতি বছরের মতো এবারও কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বসেছে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট।
প্রতি বছরের মতো এবারও এ হাটে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দুই শতাধিক বাদকদল নানা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে হাজির হয়েছেন। গতকাল বুধবার (১৪ অক্টোবর) থেকে জমতে শুরু করেছে হাট। চলবে শুক্রবার ষষ্ঠীর গভীর রাত পর্যন্ত।
আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে হাটে গিয়ে দেখা যায়, বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনায় মুখর হয়ে উঠেছে কটিয়াদী সদরের পুরান বাজার এলাকা। ঢাক-ঢোল, কাঁশি-সানাই, করতাল ও বাঁশির শব্দে জমে উঠেছে হাটের পরিবেশ। সুরের তালে তালে চলছে প্রতিযোগিতা—কে বাজাবেন সেরাটা, কার সুরে মুগ্ধ হবেন পূজা আয়োজকেরা। মণ্ডপে বাজানোর সুযোগ পেতে বাদকেরা নিজেদের সুর ও দক্ষতা উজাড় করে দিচ্ছেন। অন্যদিকে, পূজা আয়োজকেরা ঘুরে ঘুরে বাজনা শুনছেন, পছন্দ করছেন এবং দরদাম করছেন। যার বাজনা ভালো লাগছে, তার সঙ্গেই হচ্ছে চুক্তি।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা থেকে ঢাকের হাটে এসেছেন পূজা আয়োজক বিমল চন্দ্র পাল। তিনি বলেন, প্রতিবছর দুর্গাপূজার জন্য বাদ্যযন্ত্রের দল নিতে এ ঐতিহ্যবাহী হাটে আসেন। এবারও সকাল থেকে অনেক দলের বাজনা শুনেছেন। এর মধ্যে একটি বাদকদল তার পছন্দ হয়েছে। দলটি ভালো বাজায়। তাদের সঙ্গে ৬০ হাজার টাকায় চুক্তি হয়েছে।
গাজীপুরের টঙ্গী থেকে এসেছেন শ্যামল পণ্ডিত। তিনি বলেন, এবারই প্রথম এ হাটে এসে মুগ্ধ হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে বাদকদল এসেছে। এর মধ্যে বিক্রমপুরের পাঁচ সদস্যের একটি বাদকদল নিয়েছেন তিনি। দলটির সঙ্গে ৭৮ হাজার টাকায় চুক্তি হয়েছে।
নাম ‘ঢাকের হাট’ হলেও এখানে কোনো বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। এখানে আসা সবাই বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে থাকেন। তাদের বাজনা শুনে ও দক্ষতা যাচাই করে পূজা আয়োজকেরা মণ্ডপে বাজানোর জন্য ভাড়া করেন। দল বা সদস্যসংখ্যা, বাদ্যযন্ত্র ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় সম্মানী।
বিক্রমপুরের ঢাকি পরিমল দাস বলেন, ফোনে অনেকে যোগাযোগ করেছিলেন, কিন্তু তিনি যাননি। তার ভাষায়, “এখানে না আসলে মন মানে না। অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। এর আনন্দটাই আলাদা।” তিনি ৩০ হাজার টাকা চেয়েছেন। এখনো দর-কষাকষি চলছে। কমবেশি করে চুক্তি হলে তিনি চলে যাবেন।
দশ সদস্যের একটি দল নিয়ে কুমিল্লা থেকে এসেছেন কাজল মণিঋষি। তাদের দলে ঢাকের পাশাপাশি রয়েছে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র। তিনি এক লাখ ২০ হাজার টাকা সম্মানী চাচ্ছেন। এ নিয়ে অনেকেই দরদাম করছেন। কাজল মণিঋষি বলেন, “লাখের কম হলে বাজাতে যাব না।”
এই ঢাকের হাট শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অন্য ধর্মের মানুষও এখানে ভিড় করেন। তাদের কাছে এ হাট শুধু বাদ্যযন্ত্রের আয়োজন নয়, বরং ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ।
এবারের হাটে বিক্রমপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাদকদল এসেছে। ঢাক-ঢোল ছাড়াও রয়েছে বাঁশি, সানাই, করতাল, খঞ্জনি, মন্দিরা, ঝনঝনিসহ বিভিন্ন আধুনিক বাদ্যযন্ত্র।
স্থানীয়রা জানান, এ হাট এখন আর শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সব ধর্মের মানুষ ঢাক-ঢোল ও সুরের মূর্ছনা শুনতে এখানে আসেন। হাটটি যেন এক উৎসবে পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে এটি স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শ্রীমা সংঘ হাটটির তত্ত্বাবধান করছে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জীবন কুমার সাহা বলেন, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের সময় কটিয়াদীর এ ঢাকের হাটের সূচনা হয়। রাজপ্রাসাদে পূজার জন্য সেরা ঢাকির সন্ধানে বিক্রমপুরে বার্তা পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে বহু ঢাকি নৌপথে কটিয়াদীতে আসেন। রাজা নিজে তাদের বাজনা শুনে সেরা দল বেছে নেন। সেই থেকেই এ ঐতিহ্যের যাত্রা শুরু।
তিনি আরও বলেন, হাটে আসা বাদকদের থাকা-খাওয়া, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করে শ্রীমা সংঘ। কোনো বাদক ভাড়ায় যেতে না পারলে তার বাড়ি ফেরার ব্যবস্থাও সংগঠনের পক্ষ থেকে করা হয়।