
একই সীমানাপ্রাচীরের অভ্যন্তরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। একপাশে ধূপের সুবাস আর দেবীর আবাহনে ঢাকের আওয়াজ, অন্যপাশে ধ্বনিত হয় পবিত্র আজানের সুমধুর সুর। কোনো ধরনের উসকানি কিংবা সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা ছুঁতে পারেনি এই আঙিনাকে। বরং যুগ যুগ ধরে এখানে পাশাপাশি চলছে দুই ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের প্রার্থনা।
টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা সদরের চৌধুরী বাড়িতে দেখা মিলেছে ধর্মীয় সম্প্রীতির এই চিরন্তন ও গৌরবময় দৃষ্টান্তের। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মতে, এখানে কোনো শঙ্কা নেই। বরং এই সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে পড়া উচিত সমগ্র বাংলাদেশে।
সরেজমিনে জানা যায়, নাগরপুর সদরের চৌধুরী বাড়িতে স্থানীয় শ্রী পরেশ চন্দ্র ও শৈলেশ চন্দ্র প্রথমে দেবী দুর্গার একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এর কয়েক বছর পর, ১৯৬২ সালে একই চত্বরে মুসলমানদের জন্য নির্মিত হয় ‘চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ’। সেই থেকে প্রায় ৫৬ বছর ধরে একই প্রাঙ্গণে পাশাপাশি রয়েছে এই দুই উপাসনালয়। সীমানাপ্রাচীরের পশ্চিম পাশে মন্দির এবং পূর্ব পাশে মসজিদ। মসজিদের দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে মুসল্লিদের ওজুর ব্যবস্থা।
বর্তমানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে মুখরিত মন্দির প্রাঙ্গণ। ঢাকের আওয়াজ, বর্ণিল আলোকসজ্জা আর ভক্তদের উপস্থিতিতে উৎসবের আমেজ থাকলেও সেখানে অক্ষুণ্ন রয়েছে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। মসজিদে আজানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরের ঢাক-ঢোল, আতশবাজিসহ সব ধরনের বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ ও আনুষ্ঠানিকতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে থেমে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বাহ্যিক নির্দেশনা ছাড়াই এই অলিখিত নিয়ম নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।
চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা হুমায়ুন কবির জানান, দীর্ঘদিন ধরে একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির আপন মহিমায় বিরাজমান। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মন্দিরকে কেন্দ্র করে এবং স্থানীয় মুসলমানরা মসজিদকে কেন্দ্র করে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালন করছেন। আজ পর্যন্ত কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি। কাউকে কোনো বিষয়ে সতর্কও করতে হয়নি। সবাই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকেই এই সম্প্রীতি টিকিয়ে রেখেছেন।
পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ঝন্টু কুমার সাহা বলেন, ধর্মীয় উৎসবে যাতে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়ে স্থানীয় মুসলমান ভাইয়েরা অত্যন্ত সজাগ ও সহনশীল। তারা চান, নাগরপুরের এই সৌহার্দ্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ুক, যাতে কোথাও সাম্প্রদায়িক হানাহানির অবকাশ না থাকে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবার টাঙ্গাইল জেলার ১২টি উপজেলায় মোট ১ হাজার ৩৫৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে মির্জাপুর উপজেলায় সর্বোচ্চ ২৭০টি এবং দেলদুয়ার উপজেলায় সর্বনিম্ন ৩৪টি মণ্ডপ রয়েছে। তবে নাগরপুরের ঐতিহাসিক চৌধুরী বাড়ির মণ্ডপটি এর অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে জেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত।
নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিখন বনিক জানান, বাংলাদেশ আবহমানকাল ধরেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। নাগরপুরের চৌধুরী বাড়ি এর একটি জীবন্ত ও উজ্জ্বল উদাহরণ। একই প্রাঙ্গণে মুসলমানরা নামাজ আদায় করছেন এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পূজা উদযাপন করছেন। বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় এবারও অত্যন্ত সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব উদযাপিত হচ্ছে।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার জানান, জেলায় এবার ১ হাজার ৩৫৭টি পূজামণ্ডপে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উৎসব নির্বিঘ্ন করতে জেলাজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। নাগরপুরের চৌধুরী বাড়ির সহাবস্থান একটি বিরল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সেখানে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। তবে জেলাজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল-৬ (দেলদুয়ার-নাগরপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়াল লাভলু জানান, এই মাটিতে ‘সংখ্যালঘু’ বলে কোনো শব্দ নেই, সবাই এ দেশের নাগরিক। প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে ও মর্যাদার সঙ্গে পালন করবেন—এটাই আমাদের ঐতিহ্য। একই আঙিনায় পূজার্চনা ও নামাজ আদায় হচ্ছে, যা আমাদের হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণ সর্বাত্মক তৎপর রয়েছেন।