ঢাকা বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

দিনাজপুরে কেঁচো সার উৎপাদনে ঘুরে দাঁড়ালেন নাঈম

দিনাজপুরে কেঁচো সার উৎপাদনে ঘুরে দাঁড়ালেন নাঈম

ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন নাঈম হুদা। কিন্তু চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফেরার পর আর্থিক সংকটে পড়েন তিনি। করোনাকালে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ কমে যাওয়ায় সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে স্ত্রীর দেওয়া স্বর্ণের আঙটি বিক্রি করে শুরু করেন কেঁচো সার উৎপাদনের উদ্যোগ। পরপর দুই দফা ব্যর্থ হওয়ার পর নিজের ব্যবহৃত ল্যাপটপ বিক্রি করে আবারও শুরু করেন কাজ। সেই উদ্যোগেই এখন স্বাবলম্বী তিনি। মাসে উৎপাদন করছেন ৮ থেকে ১০ টন ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার। এ উদ্যোগে কর্মসংস্থান হয়েছে ৮ থেকে ১০ জনের।

দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার বৈকণ্ঠপুর গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে নাঈম হুদা। উপজেলার ভুসির বন্দর বাজারসংলগ্ন এলাকায় ৫ থেকে ৬ শতক জমিতে গড়ে তুলেছেন কেঁচো সার উৎপাদনের খামার। পাইকারিতে প্রতি টন সার বিক্রি করছেন ১৩ হাজার টাকা দরে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজির দাম ১৬ থেকে ১৮ টাকা। সেই হিসাবে মাসে ৮ থেকে ১০ টন সার বিক্রি করতে পারলে মোট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। তবে এটি মোট বিক্রির হিসাব; উৎপাদন ও অন্যান্য খরচ বাদে তার প্রকৃত মুনাফা কত, তা জানা যায়নি।

নাঈমের এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম। নিজের ফল ও সবজিবাগানে জৈব সার ব্যবহারের প্রয়োজন থেকেই কেঁচো সার তৈরির চিন্তা আসে তার মাথায়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রংপুর থেকে ১০ কেজি কেঁচো কিনে আনেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার অভাবে প্রথমবারই ব্যর্থ হন। বৃষ্টির পানি জমে কেঁচো মারা যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় উদ্যোগ। পরে বন্ধুদের কাছ থেকে ১৪ হাজার টাকা ধার করে আবারও ১০ কেজি কেঁচো কেনেন। কিন্তু সঠিক পদ্ধতি জানা না থাকায় দ্বিতীয়বারও সফল হতে পারেননি।

দুই দফা ব্যর্থতার পর হতাশ হলেও কৃষিতে কিছু করার স্বপ্ন ছাড়েননি নাঈম। পরিবারের পক্ষ থেকে চাকরিতে ফিরে যাওয়ার চাপ ছিল। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে ব্যবহৃত ল্যাপটপটি এক বন্ধুর কাছে বিক্রি করেন। সেই টাকা দিয়ে আবার কেঁচো কেনেন। এবার খামারে ছাউনি তৈরি করে গোবরের নির্দিষ্ট স্তরে কেঁচো ছাড়েন। প্রায় ১৫ দিন পর সার উৎপাদন শুরু হয়। নিজের বাগানে ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়ার পর স্থানীয় কৃষকদের কাছে সার বিক্রি শুরু করেন। জমিতে এ সার ব্যবহারে ইতিবাচক ফল পাওয়ার কথা জানাতে থাকেন কৃষকেরা। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে চাহিদা।

বর্তমানে তার খামারে কেঁচো সার উৎপাদন, গোবর প্রস্তুত ও বিপণনের কাজে নিয়মিত যুক্ত রয়েছেন ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন হযরত আলী, সাদিকুল ইসলাম ও মরিয়ম বেগম। খামারে কাজ করে তাঁরা নিয়মিত আয় করছেন।

শ্রমিক হযরত আলী বলেন, এ খামারে কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় তার কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রতিদিন কাজ করে আয় করতে পারছেন, যা সংসার চালাতে সহায়তা করছে।

আরেক শ্রমিক সাদিকুল ইসলাম বলেন, খামারে কাজ করে নিয়মিত উপার্জনের সুযোগ হয়েছে তার। আগে কাজের নিশ্চয়তা নিয়ে চিন্তা থাকলেও এখন আয় দিয়ে সংসারের খরচ মেটাতে পারছেন। এ ধরনের উদ্যোগ আরও বড় হলে এলাকার অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে।

খামারের কর্মী মরিয়ম বেগম বলেন, এখানে কাজ করে নিজের আয় করতে পারছেন। সেই আয় পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করছে। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় তাদের মতো মানুষের উপকার হচ্ছে।

স্থানীয় কৃষক রতন কুমার মহন্ত বলেন, ‘ভার্মি কম্পোস্ট সার ব্যবহারের পর জমিতে ভালো ফল পাচ্ছি। এ কারণে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে কেঁচো সার প্রয়োগ করছি। এতে ফসল ভালো হচ্ছে, সেচের প্রয়োজনও কম লাগছে।’

কৃষক গোলাম রব্বানী বলেন, জমিতে ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করে ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি রাসায়নিক সারের তুলনায় খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এ কারণে কৃষকদের মধ্যে কেঁচো সারের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

উদ্যোক্তা নাঈম হুদা বলেন, নিজের বাগানের জন্য সার তৈরি করতে গিয়েই তার এ উদ্যোগের শুরু। প্রথম দিকে বারবার ব্যর্থ হলেও চেষ্টা বন্ধ করেননি। এখন নিজের খামারে সার উৎপাদনের পাশাপাশি অন্যদেরও এ কাজে উৎসাহিত করছেন। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এলাকায় নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে চান তিনি, যাতে বেকার যুবকেরা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পান।

চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জহুরা সুলতানা বলেন, ভার্মি কম্পোস্ট মাটির উর্বরতা বাড়াতে এবং মাটির গুণাগুণ উন্নত করতে সহায়তা করে। সুষম সার ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে এ ধরনের জৈব সার ব্যবহার করা যেতে পারে। নাঈম হুদার মতো উদ্যোক্তাদের সাফল্য দেখে এলাকার বেকার যুবকদের মধ্যেও কেঁচো সার উৎপাদনে আগ্রহ বাড়ছে।

ঘুরে দাঁড়ালেন নাঈম,কেঁচো সার উৎপাদন,দিনাজপুর
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত