
ধান ঘরে তোলার অপেক্ষায় ছিলেন কৃষকেরা। কোনো জমির ধান তখনো কাঁচা, কোনোটি আধাপাকা, আবার কোনো জমির ধান ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই কাটার উপযোগী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাবে টানা তিন দিনের ঝড়-বৃষ্টিতে সেই স্বপ্নে যেন পানি ঢেলে দিয়েছে। পাবনার ঈশ্বরদীর মাঠে মাঠে নুয়ে পড়েছে রোপা আমন ধান। কোথাও ধানগাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, কোথাও শীষসহ ধান পানিতে ভাসছে। এতে ব্যাপক ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। লোকসানের শঙ্কায় দিশেহারা তারা।
রোববার ও সোমবার উপজেলার মুলাডুলি, দাশুড়িয়া ও সাঁড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
জমিতে পানি জমে থাকায় পড়ে যাওয়া ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। অনেকের আশঙ্কা, ধান কাটার সময় যত ঘনিয়ে আসবে, ক্ষতির পরিমাণও তত বাড়বে।
ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাবে গত ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ঈশ্বরদীতে মোট ১১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে বুধবার ৫৬, বৃহস্পতিবার ২৬ ও শুক্রবার ৩২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ হেলালুর রহমান এ তথ্য জানান। বর্তমানে আকাশ মেঘলা থাকায় এবং গরম অনুভূত হওয়ায় আবারও বৃষ্টির আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
মুলাডুলি ইউনিয়নের পতিরাজপুর গ্রামের কৃষক মুরাদ আলী মালিথা এবার প্রায় ২০ বিঘা জমিতে ব্রি-৭৫ ও ধানী গোল্ড জাতের উচ্চ ফলনশীল আমন ধানের আবাদ করেছিলেন। ঝড়-বৃষ্টির আগে প্রতি বিঘায় ২০ থেকে ২৫ মণ ধান পাওয়ার আশা করেছিলেন তিনি। কিন্তু টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে তার প্রায় ১৫ বিঘা জমির ধান মাটিতে পড়ে গেছে। অনেক ধানের শীষ এখন পানির ওপর ভাসছে।
মুরাদ আলী বলেন, কয়েক বিঘা জমির ধান আর ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে কাটার উপযোগী হতো। এখন ধানগাছ শীষসহ পানিতে পড়ে আছে। পানি শুকানোর পরও ধান কাটতে দেরি হলে বিঘাপ্রতি মাত্র চার-পাঁচ মণ ধান পাওয়া যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। আধাপাকা ধানের ফলনও ২০ থেকে ৩০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আর যেসব জমিতে মাত্র শীষ বের হয়েছে, সেসব ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
তিনি আরও বলেন, পড়ে যাওয়া ধান কাটতে শ্রমিকের খরচ অনেক বেশি হবে। অনেক ক্ষেত্রে ধান কেটে ঘরে তুললেও শ্রমিকের মজুরি উঠবে না। কৃষকের স্বপ্ন লুকিয়ে থাকে তার ফসলের মধ্যে। সেই স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেলে তা কাটিয়ে ওঠা খুবই কষ্টসাধ্য।
মুরাদ আলী জানান, তিনি প্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ না নিলেও বীজ, সার, কীটনাশক ও সেচের খরচ বাকিতে জোগাড় করে চাষাবাদ করেছেন। এসব উপকরণ বাকিতে নেওয়ায় দামও তুলনামূলক বেশি দিতে হয়। ধান কেটে বিক্রি করে সেই বকেয়া পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু ধান নষ্ট হওয়ায় এখন ঋণ শোধ করা নিয়েই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
একই এলাকার আমন চাষি কালু সরদার, মিজান মালিথা, মুজাহিদ মণ্ডল, শফি মণ্ডল, কোরবান মালিথা ও রবিউল জানান, ঝড়-বৃষ্টিতে তাদের এলাকার শত শত বিঘা জমির আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের ভাষ্য, স্বাভাবিক অবস্থায় যে জমিতে বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ২০ মণ ধান পাওয়ার আশা ছিল, সেখানে এখন পাঁচ-সাত মণও পাওয়া কঠিন হতে পারে। যেসব ধানের শীষ মাত্র বের হয়েছে, সেগুলো মাটিতে পড়ে থাকায় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
ধান বিক্রি করে সার ও কীটনাশকের দোকানের বকেয়া পরিশোধ করার কথা থাকলেও এখন কীভাবে সেই টাকা শোধ করবেন, তা নিয়ে দিশেহারা তারা। এ অবস্থায় সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন কৃষকেরা।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলায় ৩ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৬৬১ মেট্রিক টন। তবে ঝড়-বৃষ্টিতে কত হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মমিন বলেন, এবার রোপা আমনের ফলন বেশ ভালো হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। বিশেষ করে ব্রি-১০৩ জাতের ধান বিঘাপ্রতি ২০ থেকে ২২ মণ উৎপাদন হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু মধ্য কার্তিকে অসময়ের ঝড়-বৃষ্টির কারণে ধান বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উপজেলায় কত হেক্টর জমির ধান মাটিতে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিরূপণের কাজ চলছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের পর বিস্তারিত জানা যাবে।