ঢাকা শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শহীদ তিতাসের মরদেহ গ্রামের পথে, পাহাড়ে অভিযান অব্যাহত

শহীদ তিতাসের মরদেহ গ্রামের পথে, পাহাড়ে অভিযান অব্যাহত

কক্সবাজারের টেকনাফের গহিন পাহাড়ে মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহত সেনাসদস্য মো. তিতাস শেখের মরদেহ হেলিকপ্টারযোগে তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়ায় নেওয়া হচ্ছে।

শুক্রবার আসরের নামাজের পর রামু সেনানিবাসে জানাজা শেষে হেলিকপ্টারটি গ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এর আগে, শুক্রবার সকালে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে নিহত সেনাসদস্যের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে মরদেহ নেওয়া হয় রামু সেনানিবাসে।

বৃহস্পতিবার টেকনাফের গহিন পাহাড়ে মানবপাচারকারীদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর গোলাগুলিতে সেনাসদস্য মো. তিতাস শেখ নিহত হন। তিনি ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের আফজাল হোসেনের ছেলে।

এদিকে, শুক্রবার দুপুরে টেকনাফের পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির পর জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে টেকনাফ মডেল থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই ঘটনায় অস্ত্রসহ আটক ছয় মানবপাচারকারীকেও পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ে মানবপাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আদালতের মাধ্যমে তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ ছাড়া পাহাড়ে অভিযানের সময় গুলিতে সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।

তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার ৫৭ জন জিম্মিকে উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল। পরে তথ্য যাচাই-বাছাই করে জানা যায়, তাদের মধ্যে একজন দালাল ছিলেন।

আট দিন ঝুপড়িতে বন্দি ছিলেন আসাদুজ্জামান

থানা হেফাজতে থাকা ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান জানান, আট দিন ধরে মানবপাচারকারীরা তাকে পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে বন্দি করে রেখেছিল। দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। পাহাড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল ছিল।

আসাদুজ্জামান বলেন, কক্সবাজারের একটি ব্রিজে চাকরির সুবাদে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা ইমামুলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে ক্যাম্পে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আট দিন আগে তাকে ডেকে নেওয়া হয়। কেড়ে নেওয়া হয় মোবাইল ফোনসহ সঙ্গে থাকা সবকিছু। পরে রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তাকে পাহাড়ে নিয়ে মানবপাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, পাহাড়ে গিয়ে দেখতে পান, তার মতো আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে। তখনই বুঝতে পারেন, তিনি মানবপাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়েছেন।

আসাদুজ্জামানের ভাষ্য, দুই দিন আগে শতাধিক নৌকাসহ একটি ট্রলার সাগরপথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাকে আরও পাঁচজনের সঙ্গে সেখানে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জায়গা না থাকায় সেদিন ট্রলারে তোলা হয়নি। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার তাদের পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এর আগেই সেনাবাহিনী এসে তাদের উদ্ধার করে।

এক লাখ টাকায় বিক্রির অভিযোগ

পাহাড় থেকে উদ্ধার হওয়া উখিয়ার সেবতখালীর বাসিন্দা মো. সাইফুল ও মিজানুর রহমান সাগর জানান, কাজ দেওয়ার কথা বলে নূরালী নামে এক দালাল তাদের মানবপাচারকারীদের হাতে তুলে দেন। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকেই জানতে পারেন, তাদের দুজনকে এক লাখ টাকায় কিনে নেওয়া হয়েছে।

তারা বলেন, পাঁচ দিন ধরে সেখানে প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষ এনে জড়ো করতে দেখেছেন। কেউ কথা বলতে চাইলে তাকে ব্যাপক মারধর করা হতো। তারাও পালানোর চেষ্টা করায় মারধরের শিকার হয়েছেন। পরে তাদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।

তারা আরও বলেন, দিনে মাত্র দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবার হিসেবে দেওয়া হতো কাঁচা কদু ও ডাল। ক্ষুধায় তাদের প্রাণ যায় যায় অবস্থা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার তাদের ট্রলারে তুলে সাগরপথে পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এর আগেই যৌথ বাহিনী তাদের উদ্ধার করে।

পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি স্থানীয়দের

হ্নীলার স্থানীয় বাসিন্দা নুর আলম বলেন, পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান প্রয়োজন। তা না হলে মানবপাচারকারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব হবে না। প্রতিদিনই পাহাড়ে গুলির শব্দ শোনা যায়। সশস্ত্র পাচারকারীদের কারণে পুরো এলাকা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যংয়ের পাহাড়ে সশস্ত্র অপরাধীদের আস্তানা গড়ে উঠেছে। এসব আস্তানা নির্মূলে একযোগে সাঁড়াশি অভিযানের বিকল্প নেই।

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, পাহাড়কেন্দ্রিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে মানবপাচারকারীদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। এমন পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার পাচারকারীদের আস্তানায় গোলাগুলিতে একজন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এর চেয়ে ভয়াবহ ঘটনা আর কী হতে পারে। এখানে সাধারণ মানুষ অপরাধীদের কাছে অনেকটা অসহায়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান অত্যন্ত জরুরি।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র মানবপাচারকারীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। অপরাধ করে কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই। মানববন্ধনের বিষয়েও তারা খোঁজখবর রাখছেন।

তিনি আরও বলেন, সশস্ত্র মানবপাচারকারীদের গুলিতে দায়িত্ব পালনরত একজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় তারা গভীরভাবে মর্মাহত ও শোকাহত। এ ধরনের অপরাধ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।

এদিকে, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত টেকনাফের পাহাড়ে অপরাধীদের আস্তানা ঘিরে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান অব্যাহত ছিল। ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, অভিযান চলছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে বিজিবি ও পুলিশের সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। যৌথভাবে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে।

অভিযান অব্যাহত,শহীদ তিতাসের মরদেহ
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত