
মেয়াদ শেষ হলেও নতুন নির্বাচন না করে পারিবারিক মিলনমেলার আয়োজন করায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত বর্তমান কমিটির এ উদ্যোগকে ঘিরে ক্যাম্পাসজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা ও বিতর্ক। ফ্যাসিস্ট আমলে নির্বাচিত বর্তমান শিক্ষক সমিতি নতুন নির্বাচন না করেই এ কর্মসূচি হাতে নেওয়ায় একাংশ শিক্ষক এর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন।
আগামী ১১ এপ্রিল ফয়েজ লেক পার্ক-এ ‘পারিবারিক মিলনমেলা-২০২৬’-এর আয়োজন করেছে চবি শিক্ষক সমিতি।
দিনব্যাপী এ আয়োজনে নানা কর্মসূচিও রাখা হয়েছে। মিলনমেলা আয়োজন উপ-কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এবিএম আবু নোমান এবং সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক মনজুরুল আলম।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল শিক্ষক সমিতির কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান সভাপতি এবং আইন বিভাগের অধ্যাপক এবিএম আবু নোমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তবে শুরু থেকেই নির্বাচনটি নিয়ে সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করে। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিএনপি-জামায়াতপন্থী সাদা দলের কোনো প্রার্থী অংশ নেননি। ফলে একতরফাভাবে আওয়ামী লীগপন্থী হলুদ দলের প্রার্থীরাই নির্বাচনে অংশ নেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনভাবে সব পদে জয়ী হন। এতে নির্বাচনটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ওঠে।
এদিকে, ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল কার্যনির্বাহী পরিষদের মেয়াদ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত নতুন কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এতে করে বর্তমান শিক্ষক সমিতি কার্যত প্রতিনিধিত্বহীন হয়ে পড়েছে—এমন মত প্রকাশ করছেন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের একটি অংশ। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির ব্যানারে ‘শিক্ষকদের মিলনমেলা’ আয়োজন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষকরা। তাদের অভিযোগ, নির্বাচন আয়োজনের পরিবর্তে সময়ক্ষেপণ ও অবস্থান ধরে রাখতেই বর্তমান কমিটি এ ধরনের কর্মসূচিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে চবির সাদা দলের আহ্বায়ক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. শাহাদাত হোছাইন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ এ শিক্ষক সমিতি ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী রাজনীতির বৈধতা আদায়ের লক্ষ্য প্রাথমিক কিছু কার্যক্রমের মাধ্যমে সামনে আসতে চেষ্টা করছে। যার কোনো এখতিয়ার তাদের নেই। এ পুরো কমিটি ছিল আওয়ামী লীগের দোসরদের নিয়ে গড়া। ফ্যাসিস্টদের সহযোগী শিক্ষক ছাড়া অন্য কোনো শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব তাদের আগেও ছিল না, এখনো নেই।’
তার মতে, আওয়ামী রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় এখন বিভিন্ন ব্যানার ব্যবহার করে সমমনা শিক্ষকদের একত্রিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে তারা। গণতান্ত্রিকভাবে ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়ে নতুন করে এই প্ল্যাটফর্ম পুনর্গঠন না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে চবি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “শহিদ মিনারে ফুল দেওয়া ছাড়া শিক্ষক সমিতির আর কোনো কাজ নেই। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে তখনকার প্রশাসনও এ সমিতিকে নিয়ে এক ধরনের শঙ্কার মধ্যে ছিল। শিক্ষক সমিতিটি নানা কারণে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তারা শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এছাড়া বর্তমান কমিটির এক বছরের মেয়াদ শেষ হলেও নির্বাচন দিতে গড়িমসি করছে। ফলে বর্তমানে এই সমিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্বকারী কোনো সংগঠন হিসেবে বিবেচিত নয়।”
চবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এবিএম আবু নোমান গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা কোনোভাবেই নির্ধারিত সময়ের বাইরে দায়িত্বে থাকতে আগ্রহী নই। আমরা দায়িত্বে একদিনও বেশি থাকতে চাই না। তবে ৫ আগস্টের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে যে অস্বাভাবিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, সে কারণেই শিক্ষক সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে আমরা একাধিকবার বৈঠক করেছি এবং প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেছি। বর্তমানে যেহেতু আমরা দায়িত্বে আছি, তাই এই পারিবারিক মিলনমেলাকে অযৌক্তিক বলে মনে করার কোনো কারণ দেখছি না।”
অন্যদিকে, চবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, ‘ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসনের যেকোনো চেষ্টা শক্ত হাতে প্রতিহত করা হবে।’
একই সুরে ছাত্রশিবিরের শাখা সেক্রেটারি মোহাম্মদ পারভেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেন, ‘মিলনমেলার আড়ালে যদি ফ্যাসিবাদ সংগঠিত করার কোনো পাঁয়তারা করা হয়, তবে জুলাই বিপ্লবে তাদের বিতর্কিত ভূমিকা সবার সামনে তুলে ধরা হবে।’