
আমি শুনেছি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণা প্রকাশিত হয়। কিন্তু নিজে গবেষণা করতে গিয়ে তাদের কোনো গবেষণাপত্রই খুঁজে পাইনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন জার্নালের তো কোনো অস্তিত্বই নেই। আর প্রিন্টেড জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রগুলোর তথ্যও সহজে হালনাগাদযোগ্য নয়।
ফলে নতুন গবেষকরা নিজেদের ডিসিপ্লিনে আগে কী ধরনের গবেষণা হয়েছে, তা জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন এবং গবেষণায় তথ্যগত শূন্যতা থেকেই যায়—নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা জার্নাল সম্পর্কে আক্ষেপ প্রকাশ করে এমন মন্তব্য করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান তানহা।
গবেষণা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উৎকর্ষ ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু ডিজিটাল যুগে গবেষণার সংরক্ষণ ও প্রকাশে যখন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ই-জার্নাল ও ডিজিটাল আর্কাইভনির্ভর ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদগুলো এখনো আটকে আছে প্রচলিত প্রিন্টেড জার্নালকেন্দ্রিক ব্যবস্থায়। ফলে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের গবেষণাপত্র বিভাগীয় লাইব্রেরির তাকে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।
অনলাইনে গবেষণাপত্র অনুসন্ধানের সুযোগ না থাকায় নতুন গবেষকরা পূর্ববর্তী গবেষণার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে নতুন গবেষকরা পূর্ববর্তী গবেষণা পর্যালোচনা, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং গবেষণার ধারাবাহিকতা রক্ষায় পড়ছেন নানা সংকটে।
যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের গবেষণা প্রকাশ ও সংরক্ষণে ই-জার্নাল রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি আধুনিক ই-জার্নাল ব্যবস্থা চালুর দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় গবেষণা কার্যক্রমের ডিজিটাল সংরক্ষণ ও সহজলভ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, গবেষকরা ই-জার্নালের অভাবে বৃহত্তর স্বার্থে স্থানীয় ও প্রাসঙ্গিক গবেষণাগুলো যথাযথভাবে প্রকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে গবেষণাকর্মের সংরক্ষণ, মূল্যায়ন ও প্রচারের ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। ফলে গবেষণাগুলো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, বহিরাগত জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে গেলে দীর্ঘ সময়, অতিরিক্ত ব্যয় এবং জটিল সম্পাদনা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে গবেষণার গতি মন্থর হওয়ার পাশাপাশি অনেক মূল্যবান গবেষণাপত্র অপ্রকাশিত থেকে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের প্রিন্টেড জার্নালে এখন পর্যন্ত মোট ৩১টি ভলিউম প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ থেকে ১০টি, কলা ও মানবিক অনুষদ থেকে ১০টি, বিজ্ঞান অনুষদ থেকে ৬টি এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ থেকে ৫টি ভলিউম প্রকাশিত হয়েছে। তবে আইন অনুষদের জার্নালে এখন পর্যন্ত কোনো ভলিউম প্রকাশিত হয়নি। অন্যদিকে, প্রকৌশল অনুষদের নিজস্ব কোনো জার্নাল না থাকায় সেখান থেকেও কোনো ভলিউম প্রকাশের সুযোগ হয়নি।
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান তানহা বলেন, ‘ই-জার্নালে সিনিয়রদের কাজগুলো সংরক্ষিত না থাকার কারণে প্রয়োজনীয় থিসিস পেপার পড়ে আইডিয়া নিতে পারিনি। ই-জার্নালে পূর্ববর্তী কাজগুলো সংরক্ষিত না থাকায় নতুন যারা গবেষণা করে, তাদের নিজ ডিসিপ্লিনের পর্যাপ্ত কাজ দেখার সুযোগ না পাওয়ায় অনেক ইনফরমেশন গ্যাপ থাকে। ই-জার্নালে পূর্ববর্তী কাজগুলো সংরক্ষণ করা গেলে নতুন যারা গবেষণা করবে, তারা নিজ ডিসিপ্লিনের অনেক কাজ দেখার সুযোগ পায়। এতে অনেক কিছু জানা যায়, যা তার গবেষণাকে সমৃদ্ধ করে।’
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শরিফ আহমেদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জার্নালের অভাব গবেষণার প্রকাশ ও প্রসারের ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত সংকট তৈরি করেছে। ফলে গবেষকদের কাজ প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। বহিরাগত জার্নালে প্রকাশের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ, আর্থিক ব্যয় এবং জটিল সম্পাদনা প্রক্রিয়া গবেষণার গতিকে মন্থর করে দেয়। এতে অনেক সময় মূল্যবান গবেষণাও অপ্রকাশিত থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।’
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব আল আমিন বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ই-জার্নালের অভাবে স্থানীয় ও প্রাসঙ্গিক গবেষণাগুলো যথাযথভাবে প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে না, যেখানে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের নিজস্ব জার্নালের মাধ্যমে এসব গবেষণা তুলে ধরছে। গবেষণা বিষয়ক একাডেমিক যোগাযোগ ও নেটওয়ার্কিং কমে যাওয়ায় জ্ঞান বিনিময় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার উন্নয়নে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, কারণ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সহজেই প্রকাশনার অভিজ্ঞতা অর্জন করছে।’
এ বিষয়ে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে প্রিন্টেড জার্নালের তুলনায় অনলাইন জার্নাল বেশি গ্রহণযোগ্য। এ কারণে আমরা একটি ডিজিটাল অবজেক্ট আইডেন্টিফায়ার (ডিওআই) নম্বর নেওয়ার চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ডিনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। প্রশাসনের মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করে ডিওআই নম্বর গ্রহণসহ অনলাইন জার্নালসংক্রান্ত কার্যক্রম কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে কাজ করা হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হওয়া গবেষণাপত্রগুলোর ডিওআই নাম্বার নেই। যার কারণে অনলাইনে এই গবেষণাপত্রগুলো পাওয়া যায় না। ডিওআই নম্বরের জন্য আমরা গবেষণা দপ্তরের পরিচালক এবং ডিনদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছি। আশা করি, অতি শীঘ্রই আমরা ডিওআই নাম্বার পাবার চেষ্টা করছি, যার ফলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালে প্রকাশিত হওয়া গবেষণাপত্রগুলো সবাই অনলাইনে পড়তে পারবে।’