
একজন স্বজনের অসহায়ত্ব বদলে দিয়েছে ভাবনার গতিপথ। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয়েছে নতুন এক উদ্ভাবনের যাত্রা। ডায়াবেটিস ও পায়ের পক্ষাঘাতের কারণে চলাচল করতে পারতেন না চাচা। সামান্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতেও নির্ভর করতে হতো পরিবারের সদস্যদের ওপর। কাছ থেকে চাচার এই অসহায়ত্ব ও পরিবারের ভোগান্তি দেখেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের ১৪তম আবর্তনের শিক্ষার্থী শাকিরুল ভূঁইয়া। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে ভাবিয়েছে ভিন্নভাবে।
এরই ধারাবাহিকতায় হাতের শক্তি ব্যবহার করতে অক্ষম ব্যক্তিদের চলাচল সহজ করতে নাক ও মুখের ইশারায় নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্মার্ট হুইলচেয়ার তৈরির উদ্যোগ নেন তিনি।
উদ্ভাবনের পেছনের গল্প বলতে গিয়ে শাকিরুল বলেন, “আমার চাচা অসুস্থ ছিলেন। ডায়াবেটিসের পাশাপাশি তার পা প্যারালাইজড ছিল। তিনি চলাচল করতে পারতেন না। সামান্য চলাচলের জন্যও পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্ভর করতে হতো। এতে পরিবারের সদস্যদের যেমন ভোগান্তি হতো, তেমনি তিনিও অনেক কষ্ট পেতেন। বিষয়টি কাছ থেকে দেখে আমার মনে হয়েছে, স্যারের ধারণা নিয়ে কাজ করতে পারলে এ ধরনের মানুষের জন্য ভালো কিছু করা সম্ভব।”
শাকিরুল জানান, বিশেষ করে যারা পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং হাত দিয়ে হুইলচেয়ার চালাতে অক্ষম, তাদের কথা বিবেচনা করেই তৈরি করা হয়েছে এই স্মার্ট হুইলচেয়ার। এতে হাতের পরিবর্তে মুখ ও নাকের নড়াচড়ার মাধ্যমে হুইলচেয়ারটি চালানো যাবে। ফলে শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের চলাচলে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে।
মুখ খুললেই সক্রিয়, নাকের ইশারায় চলাচল
হুইলচেয়ার চালাতে হাতের শক্তি কিংবা অন্যের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু পক্ষাঘাতগ্রস্ত অনেক মানুষের পক্ষে হাত দিয়ে হুইলচেয়ার পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। তাদের কথা মাথায় রেখেই স্মার্ট হুইলচেয়ারটির নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি করেছেন শাকিরুল।
হুইলচেয়ারটি পরিচালনার জন্য পাইথন প্রোগ্রামিং ভাষায় সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে। এটি ল্যাপটপের ওয়েবক্যামের সাহায্যে ব্যবহারকারীর মুখ শনাক্ত করে। মুখ হাঁ করলেই সক্রিয় হয় সিস্টেমটি। এরপর স্ক্রিনে নাকের চারপাশে একটি আয়তাকার বক্স তৈরি হয়। নাক ওপরে নিলে হুইলচেয়ার সামনে, নিচে নিলে পেছনে এবং ডানে-বাঁয়ে সরালে সংশ্লিষ্ট দিকে চলে। আর নাক বক্সের ভেতরে রাখলে হুইলচেয়ারটি থেমে যায়।
প্রযুক্তিটির কার্যপদ্ধতি ব্যাখ্যা করে শাকিরুল বলেন, “আমরা এমনভাবে প্রোগ্রামটি তৈরি করেছি, যাতে ব্যবহারকারী হাতের কোনো শক্তি ছাড়াই শুধু নাকের ইশারায় হুইলচেয়ার চালাতে পারেন। মুখ হাঁ করলে সিস্টেমটি অ্যাকটিভ হয়। এরপর নাকের অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে হুইলচেয়ারটি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।”
চলাচলের পাশাপাশি স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ
স্মার্ট হুইলচেয়ারটির কার্যকারিতা শুধু চলাচলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে যুক্ত করা হয়েছে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর হার্ট রেট, পালস রেট ও শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করা যায়।
দুর্ঘটনা এড়াতে ছয় সেন্সরের নিরাপত্তাব্যবস্থা
শুধু চলাচল নয়, ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে উদ্ভাবনটিতে। হুইলচেয়ার নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি আয়তাকার বক্সের বাইরে রাখা হয়েছে অতিরিক্ত নিরাপত্তাসীমা বা ‘সেফটি বাউন্ডারি’। ব্যবহারকারী হঠাৎ মাথা ঘোরালে কিংবা কারও সঙ্গে কথা বলার সময় নাকের অবস্থান ওই সীমানার বাইরে চলে গেলে হুইলচেয়ারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে থেমে যাবে।
পাশাপাশি হুইলচেয়ারের চারদিকে সংযুক্ত করা হয়েছে ছয়টি আলট্রাসনিক সেন্সর। চলার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা শনাক্ত করে সেটি ২০ সেন্টিমিটারের মধ্যে চলে এলে হুইলচেয়ারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে থামিয়ে দেবে সেন্সরগুলো।
শাকিরুল বলেন, “অনেক সময় ব্যবহারকারী হঠাৎ মাথা ঘোরাতে পারেন কিংবা কারও সঙ্গে কথা বলতে পারেন। তখন নাকের পয়েন্ট সেফটি বাউন্ডারির বাইরে চলে গেলে চেয়ারটি অটোমেটিক থেমে যাবে। একই সঙ্গে চারপাশের ছয়টি সেন্সর কোনো প্রতিবন্ধকতা ২০ সেন্টিমিটারের মধ্যে পেলেও হুইলচেয়ারটি থামিয়ে দেবে।”
ল্যাপটপ ছাড়াই পরিচালনার পরিকল্পনা
পরবর্তী ধাপে হুইলচেয়ারটি পরিচালনায় ল্যাপটপের প্রয়োজনীয়তা দূর করার পরিকল্পনা রয়েছে উদ্ভাবকদের। ল্যাপটপের পরিবর্তে রাস্পবেরি পাই ব্যবহার করে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি করতে চান তারা। এতে ক্যামেরার পাশাপাশি একটি ডিসপ্লে থাকবে, যেখানে ব্যবহারকারী হুইলচেয়ারের গতিবিধি ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য দেখতে পারবেন।
শাকিরুল ভূঁইয়া বলেন, “অনেকের কাছে ল্যাপটপ নাও থাকতে পারে। তাই আমাদের পরবর্তী পরিকল্পনা হচ্ছে ল্যাপটপের পরিবর্তে রাস্পবেরি পাই ব্যবহার করা। এতে ক্যামেরা ও ডিসপ্লে থাকবে। ব্যবহারকারী সেখান থেকেই নিজের মুভমেন্ট ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য দেখতে পারবেন।”
গবেষণায় অর্থসংকট, ল্যাব সুবিধার অভাব
উদ্ভাবনটির উন্নয়নকাজ এগিয়ে নিতে গিয়ে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে এই গবেষককে। এর মধ্যে রয়েছে বাজেটের ঘাটতি, অর্থ ছাড়ে দীর্ঘসূত্রতা এবং পর্যাপ্ত গবেষণাগার ও যন্ত্রপাতির অভাব।
এ বিষয়ে শাকিরুল ভূঁইয়া বলেন, “গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা ছিল বাজেটের ঘাটতি ও অর্থ ছাড়ে দীর্ঘসূত্রতা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বরাদ্দ মিললেও টেন্ডার প্রক্রিয়ার জটিলতায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পেতে অনেক সময় লেগে যায়। ফলে গবেষণার অগ্রগতি ব্যাহত হয়। সম্প্রতি সুপারভাইজার ও এনএসসি ফেলোশিপপ্রাপ্ত এক সিনিয়র গবেষকের অর্থায়নে কিছু সরঞ্জাম কেনা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত ল্যাব স্পেস ও যন্ত্রপাতির অভাবে সুপারভাইজারের ব্যক্তিগত কক্ষেই গবেষণা চালাতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ পৃথক ল্যাব এবং দ্রুত অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করা গেলে গবেষণার গতি বাড়বে। সেই সঙ্গে নতুনরাও গবেষণায় উৎসাহিত হবে।”
খেলনা গাড়ি থেকে বাস্তব হুইলচেয়ার
গবেষণা প্রকল্পটির সুপারভাইজার এবং প্রকৌশল অনুষদের ডিন ও বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হাছান বলেন, “কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ‘ইন্টারেক্টিভ সিস্টেমস অ্যান্ড কম্পিউটার ভিশন’ ল্যাব থেকে ২০২৩ সালে আমাদের এই গবেষণার যাত্রা শুরু হয়। বিভাগের এক প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রথমে খেলনা গাড়িতে প্রযুক্তিটির প্রোটোটাইপ তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে বর্তমান শিক্ষার্থী শাকিরুল এটি বাস্তব হুইলচেয়ারে সফলভাবে প্রয়োগ করেন।”