ঢাকা বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তালেবানের শীর্ষ পর্যায়ে ভাঙন

ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তালেবানের শীর্ষ পর্যায়ে ভাঙন

তালেবান নেতার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় কী, সেটি প্রকাশ পায় বিবিসির হাতে আসা এক অডিও বার্তায়। সেটি বাইরের কোনো হুমকি বা বিপদ নয়, বরং আফগানিস্তানের ভেতর থেকেই সে সংকট তৈরি হয়েছে। আগেকার সরকারের পতন এবং যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহারের পর ২০২১ সালে তালেবানদের দখলে যায় আফগানিস্তান। তালেবান শীর্ষ নেতা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, দেশ পরিচালনার জন্য তালেবান যে ইসলামি আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেছে, সেখানে সরকারের ভেতরের লোকজন একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। ফাঁস হওয়া ওই অডিওতে শোনা যায়, সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা এক বক্তৃতায় বলছেন, অভ্যন্তরীণ এ মতবিরোধ একসময় তাদের সবাইকে ডুবিয়ে দিতে পারে। ‘এ বিভাজনের ফলেই আমিরাত ভেঙে পড়বে এবং শেষ হয়ে যাবে’ সতর্ক করেন তিনি।

গুজব যেভাবে অনুসন্ধানে : ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণাঞ্চলের কান্দাহার শহরের একটি মাদ্রাসায় তালেবান সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া এ বক্তৃতা কয়েক মাস ধরে ছড়িয়ে পড়া গুজবকে আরও উস্কে দেয়, তালেবানের একেবারে শীর্ষ পর্যায়ে মতবিরোধ রয়েছে। এ বিভক্তির কথা তালেবান নেতৃত্ব সব সময়ই অস্বীকার করেছে, সেটা বিবিসি সরাসরি প্রশ্ন করার সময়েও। তবে এ গুজবই বিবিসির আফগান সার্ভিসকে অত্যন্ত গোপনীয় এ গোষ্ঠী নিয়ে এক বছরব্যাপী অনুসন্ধান শুরু করতে উদ্বুদ্ধ করে। এ অনুসন্ধানে বিবিসি ১০০টির বেশি সাক্ষাৎকার নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন তালেবানের বর্তমান ও সাবেক সদস্য, স্থানীয় সূত্র, বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কূটনীতিক। বিবিসি প্রথমবারের মতো তালেবানের একেবারে শীর্ষ পর্যায়ে দুটি ভিন্ন স্বতন্ত্র গোষ্ঠীর এক ধরনের মানচিত্র তৈরি করতে পেরেছে, যারা আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস করে। একটি অংশ পুরোপুরি আখুন্দজাদার অনুগত, যিনি কান্দাহারের ঘাঁটি থেকে আফগানিস্তানকে এক কঠোর ইসলামি আমিরাতের দিকে এগিয়ে নিচ্ছেন। এটি আধুনিক বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এবং যেখানে তার প্রতি অনুগত ধর্মীয় ব্যক্তিরা সমাজের প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণ করেন। অন্য অংশটি মূলত রাজধানী কাবুলে অবস্থানরত শক্তিশালী তালেবান সদস্যদের নিয়ে গঠিত। তারা এমন একটি আফগানিস্তানের পক্ষে কথা বলেন, যা ইসলামকে কঠোরভাবে অনুসরণ করবে ঠিকই, তবে একই সঙ্গে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে, দেশের অর্থনীতি গড়ে তুলবে, এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরেও মেয়ে বা নারীদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথা ভাববে। একজন অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি এটিকে কান্দাহারের ঘর বনাম কাবুল বলে বর্ণনা করছিলেন।

আখুন্দজাদাকে সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ : সব সময়ই প্রশ্ন ছিল, তালেবান মন্ত্রিসভার সদস্য, শক্তিশালী যোদ্ধা এবং প্রভাবশালী ধর্মীয় আলেমদের নিয়ে গঠিত কাবুল গোষ্ঠী, যাদের পেছনে হাজার হাজার তালেবান সমর্থক রয়েছে- তারা কি কখনও ক্রমশ আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা আখুন্দজাদাকে সত্যিকারের কোনো চ্যালেঞ্জ জানাবে? যেমনটা তার বক্তৃতায় ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। কারণ, তালেবানের মতে, আখুন্দজাদা হলেন তাদের গোষ্ঠীর চূড়ান্ত শাসক, যিনি শুধু আল্লাহর কাছেই দায়বদ্ধ এবং তাকে চ্যালেঞ্জ করা যায় না। এরপর এমন একটি সিদ্ধান্ত আসে, যা দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের মধ্যে চলা সূক্ষ্ম টানাপোড়েনকে সরাসরি মতাদর্শের সংঘাতে পরিণত করে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আখুন্দজাদা ইন্টারনেট ও টেলিফোন পরিষেবা বন্ধের নির্দেশ দেন, যার ফলে আফগানিস্তান কার্যত বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তিনদিন পর ইন্টারনেট আবার চালু হয়। কেন, তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। কিন্তু পর্দার আড়ালে যা ঘটেছিল, তা ছিল ভূমিকম্পের মতো, এমনটাই বলছেন ভেতরের লোকজন। কাবুল গোষ্ঠী আখুন্দজাদার আদেশ অমান্য করে ইন্টারনেট আবার চালু করে দেয়। আফগানিস্তান বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা এক বিশেষজ্ঞ ব্যাখ্যা করেন, তালেবান অন্য যেকোনো আফগান রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর তুলনায় ব্যতিক্রম। কারণ, তাদের মধ্যে বড় কোনো বিভাজন ছিল না, এমনকি খুব বেশি মতবিরোধও দেখা যায়নি। তিনি আরও বলেন, এ আন্দোলনের ডিএনএ-তেই ঊর্ধ্বতনদের প্রতি আনুগত্যের নীতি রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত আমিরের অর্থাৎ আখুন্দজাদার প্রতি। তাই তার স্পষ্ট আদেশের বিরুদ্ধে গিয়ে ইন্টারনেট আবার চালু করা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একজন তালেবান অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভাষায়, এটি বিদ্রোহের চেয়ে কম কিছু ছিল না।

একক ক্ষমতার কেন্দ্রে যেভাবে : হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বের শুরুটা এমন ছিল না; বরং সূত্রগুলো বলছে, ২০১৬ সালে তাকে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে একটি কারণ ছিল তার ঐক্যমত্য তৈরি করতে পারার সক্ষমতা। নিজের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা না থাকায়, তিনি ডেপুটি বা সহকারী হিসেবে সিরাজউদ্দিন হাক্কানিকে বেছে নেন, যিনি একজন ভয়ংকর যোদ্ধা কমান্ডার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি খোঁজ করা ব্যক্তিদের একজন ছিলেন, যার মাথার জন্য ১ কোটি ডলার (প্রায় ৭.৪ মিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। দ্বিতীয় সহকারী হিসেবে বেছে নেওয়া হয় তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের ছেলে ইয়াকুব মুজাহিদকে। বয়সে তরুণ হলেও তালেবান বংশের রক্ত আর আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ করার সম্ভাবনা তার মধ্যে ছিল। তালেবান যোদ্ধা ও যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনীর মধ্যকার ২০ বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দোহায় যে আলোচনা চলছিল, তার পুরো সময়জুড়ে তালেবানের এ ব্যবস্থাই অব্যাহত ছিল। ২০২০ সালে হওয়া সেই চুক্তির ফলেই তালেবান হঠাৎ এবং নাটকীয়ভাবে আবার পুরো দেশ পুনরুদ্ধার করে এবং ২০২১ সালের আগস্টে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খলভাবে প্রত্যাহার করতে হয়। বহির্বিশ্বের কাছে তখন তালেবান ছিল একদম ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু বিবিসিকে ভেতরকার সূত্রগুলো জানায়, ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পরপরই দুই ডেপুটিকে নীরবে মন্ত্রী পদমর্যাদায় নামিয়ে দেওয়া হয়, আর আখুন্দজাদা নিজেই হয়ে ওঠেন একক ক্ষমতার কেন্দ্র।

উত্তেজনার প্রধান উৎস : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া তালেবানের শক্তিশালী ও প্রভাবশালী সহ-প্রতিষ্ঠাতা আবদুল গনি বারাদারও শেষ পর্যন্ত উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদেই সীমাবদ্ধ থাকেন। যদিও অনেকেই আশা করেছিলেন তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন। এর বদলে আখুন্দজাদা রাজধানী কাবুল এড়িয়ে তালেবানের শক্ত ঘাঁটি কান্দাহারেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং নিজের চারপাশে বিশ্বাসযোগ্য মতাদর্শিক নেতা ও কট্টরপন্থীদের একজোট করতে শুরু করেন। অন্য অনুগতদের দেওয়া হয় দেশের নিরাপত্তা বাহিনী, ধর্মীয় নীতি এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের নিয়ন্ত্রণ। আখুন্দজাদা তার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মিল রেখে মন্ত্রিসভা তার অনুগতদের দিয়ে পূর্ণ করেছেন। তবে যাদের কাবুল গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন। এখানে দুই গোষ্ঠীর সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্যদের দেখানো হয়েছে। কাবুলে থাকা তালেবান মন্ত্রীদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই কান্দাহার থেকে বিভিন্ন ফরমান জারি হতে থাকে। ক্ষমতা গ্রহণের আগে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর প্রতিও খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, যেমন মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়া। নারীদের শিক্ষা নিষিদ্ধ করা এবং নারীদের কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা, এ দুটিই এখন দুই গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনার প্রধান উৎস, এমনটি একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। সেই চিঠি ডিসেম্বরে জাতিসংঘের একটি পর্যবেক্ষক সংস্থা নিরাপত্তা পরিষদে পাঠিয়েছিল।

ক্ষমতা সংহত করার প্রক্রিয়া : সূত্র জানায়, ১৯৯০-এর দশকে তালেবানের শরিয়া আদালতের বিচারক হিসেবে কাজ শুরু করা আখুন্দজাদা তার ধর্মীয় বিশ্বাসে ক্রমেই আরও বেশি কঠোর হয়ে উঠছিলেন। ২০১৭ সালে তার ছেলের মৃত্যুর পর দুজন তালেবান কর্মকর্তা জানান, আখুন্দজাদার আদর্শ এমন ছিল, তিনি শুধু সে ব্যাপারে জানতেনই না, বরং নিজ সন্তানের আত্মঘাতী হামলাকারী হওয়ার সিদ্ধান্তে অনুমোদনও দিয়েছিলেন। এ ছাড়া বিবিসিকে বলা হয়েছে, আখুন্দজাদা বিশ্বাস করেন, তার ভুল কোনো সিদ্ধান্তের প্রভাব তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন এরপরও থেকে যাবে। আখুন্দজাদার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়া দুই ব্যক্তি বিবিসিকে বর্ণনা করেন, তারা এমন এক মানুষের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যিনি খুব কম কথা বলেন। তিনি মূলত ইশারার মাধ্যমে যোগাযোগ করেন, আর কক্ষে থাকা বয়স্ক আলেমদের একটি দল সেই ইশারার ব্যাখ্যা করে দেন। অন্য প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জনসমক্ষে তিনি নিজের মুখ আড়াল করে রাখেন। পাগড়ির ওপর ঝোলানো কাপড় দিয়ে চোখ ঢেকে রাখেন এবং শ্রোতাদের উদ্দেশে কথা বলার সময় প্রায়ই কাত হয়ে দাঁড়ান। আখুন্দজাদার ছবি তোলা বা ভিডিও করা নিষিদ্ধ। তার মাত্র দুটি ছবিই আছে বলে জানা যায়। তার সাক্ষাৎ পাওয়াও এখন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আরেকজন তালেবান সদস্য বিবিসিকে জানান, আখুন্দজাদা আগে নিয়মিত পরামর্শ সভা করতেন, কিন্তু এখন বেশিরভাগ তালেবান মন্ত্রীকে দিন বা সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়। আরেকটি সূত্র বিবিসিকে জানায়, কাবুলে থাকা মন্ত্রীদের বলা হয়েছে, শুধু সরকারি আমন্ত্রণ পেলে তবেই কান্দাহারে যেতে হবে। একই সময়ে, আখুন্দজাদা গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো কান্দাহারে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। এরমধ্যে অস্ত্র বিতরণও রয়েছে, যা আগে তার সাবেক ডেপুটি হাক্কানি ও ইয়াকুবের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ডিসেম্বরে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দল তাদের এক চিঠিতে উল্লেখ করে, আখুন্দজাদার ক্ষমতা সংহত করার প্রক্রিয়ায় কান্দাহারের নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিরাপত্তা বাহিনীর ধারাবাহিক শক্তিশালীকরণও অন্তর্ভুক্ত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আখুন্দজাদা কাবুলের মন্ত্রীদের পাশ কাটিয়ে স্থানীয় পুলিশ ইউনিট পর্যন্ত সরাসরি আদেশ জারি করেন। একজন বিশ্লেষকের মতে, এর ফল হলো প্রকৃত কর্তৃত্ব কান্দাহারে স্থানান্তরিত হয়েছে। তবে তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বিবিসির কাছে এ দাবি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, সব মন্ত্রীদের ক্ষমতা তাদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের কাঠামোর মধ্যে রয়েছে, তারা দৈনন্দিন কাজ করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন, সব ক্ষমতাই তাদের কাছে অর্পিত। তারা নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন। তবে তিনি এটাও যোগ করেন, শরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি (আখুন্দজাদা) নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী এবং আল্লাহ নিষিদ্ধ বিভাজন এড়াতে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

যারা পৃথিবী দেখেছে : কাবুল গোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছিল এবং জোট আরও শক্ত হচ্ছিল। কাবুল গোষ্ঠী এমন একটি আফগানিস্তান দেখতে চায়, যা মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর মডেলের দিকে এগিয়ে যাবে। তারা যেসব বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন, তার মধ্যে রয়েছে কান্দাহারে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা, নৈতিকতা সংক্রান্ত আইনগুলোর ধরন ও প্রয়োগ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে তালেবানের সম্পর্ক এবং নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান। তবে আফগান নারীদের জন্য আরও বেশি অধিকার চাওয়ার কথা বললেও কাবুল গোষ্ঠীকে মধ্যপন্থী বলা হয় না; বরং অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো তাদের দেখেন বাস্তববাদী হিসেবে। এ গোষ্ঠীর অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্বে রয়েছেন তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বারাদার, যিনি এখনও ব্যাপক আনুগত্য ধরে রেখেছেন। ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বিতর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ‘আবদুল’কে ‘তালেবানের প্রধান’ বলে উল্লেখ করেছিলেন, অনেকেই মনে করেন তিনি সেই ব্যক্তি। বাস্তবে তিনিই ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানের প্রধান আলোচক। কাবুল গোষ্ঠীর অবস্থানের এ পরিবর্তন লোকের নজর এড়ায়নি। একজন বিশ্লেষক বলেন, আমরা মনে করি, তারা (কাবুলভিত্তিক তালেবান নেতারা) একসময় টেলিভিশন ভাঙচুর করত, আর এখন নিজেরাই টিভিতে হাজির হচ্ছে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তিও বোঝে। সাবেক ডেপুটি ইয়াকুবের বাবা তালেবানের প্রথম দিকের শাসনামলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যখন গান ও টেলিভিশন নিষিদ্ধ ছিল। এখন সেই ইয়াকুব তরুণ তালেবান সদস্য ও কিছু সাধারণ আফগানের মধ্যে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। টিকটকের প্রশংসামূলক ভিডিও এবং তার মুখ আঁকা পণ্যসামগ্রীতেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে এদিক দিয়ে তার সহকর্মী সাবেক ডেপুটি সিরাজউদ্দিন হাক্কানিকে সবচেয়ে সফল বলা যায়। নিজেদের নতুনভাবে তুলে ধরতে তার মতো আর কেউ এতটা কার্যকর ছিল না। মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধে তার নেটওয়ার্ক যে মারাত্মক ও জটিল হামলাগুলো চালিয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ২০১৭ সালে কাবুলে জার্মান দূতাবাসের কাছে ট্রাক বোমা হামলা। এতে ৯০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হন, সেগুলো তাকে সমর্থকদের চোখে প্রায় কিংবদন্তির মর্যাদায় পৌঁছে দেয়। সে সময় তার মাত্র একটি পরিচিত ছবি ছিল, যেটি তুলেছিলেন একজন বিবিসি আফগানের সাংবাদিক। এরপর যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহারের ছয় মাস পর, হাক্কানি কাবুলে পুলিশ সদস্যদের এক সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশ্বের মিডিয়ার সামনে প্রকাশ্যে হাজির হন মুখ খোলা অবস্থায়। এটাই ছিল তার নতুন ভাবমূর্তির প্রথম ধাপ। যিনি আর যোদ্ধা নন, বরং একজন রাষ্ট্রনায়ক। যার সঙ্গে ২০২৪ সালে নিউইয়র্ক টাইমস বসে সাক্ষাৎকার নেয় এবং প্রশ্ন তোলে- তিনি কি আফগানিস্তানের পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় আশা? এর মাত্র কয়েক মাস পরই, এফবিআই নীরবে তার মাথার ওপর থাকা ১ কোটি ডলারের পুরস্কার প্রত্যাহার করে নেয়। তবু বিশ্লেষক ও ভেতরের সূত্রগুলো বারবার বিবিসিকে বলেছেন, সর্বোচ্চ নেতা আখুন্দজাদার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া অসম্ভব। তার ফরমানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে দৃশ্যমান বিরোধিতাগুলোও ছিল ছোট ও সীমিত। একজন বিশ্লেষকের মতে, কাবুল গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আফগান জনগণের কাছে একটি বার্তা পাঠাতে চাইছে। যার অর্থ- আমরা আপনাদের অভিযোগ ও উদ্বেগ সম্পর্কে অবগত, কিন্তু আমরা কীই বা করতে পারি? অন্তত ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ আসার আগপর্যন্ত প রিস্থিতি ঠিক এমনই ছিল।

সংকটের মোড় : তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা ইন্টারনেটের ব্যাপারে গভীর অবিশ্বাস বা নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। তার বিশ্বাস, ইন্টারনেটের বিষয়বস্তু ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থী। তার এ বিশ্বাস এতটাই দৃঢ় যে, প্রতিদিন সকালে একজন সহকারী তাকে সর্বশেষ খবর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট পড়ে শোনান, বিবিসিকে এমনটা জানিয়েছিলেন তার একজন মুখপাত্র। কাবুল গ্রুপের বিশ্বাস, ইন্টারনেট ছাড়া কোনো আধুনিক দেশ টিকে থাকতে পারে না। সর্বোচ্চ নেতার ইন্টারনেট বন্ধের আদেশ প্রথমে আখুন্দজাদার মিত্রদের নিয়ন্ত্রিত প্রদেশগুলোতে কার্যকর হয়, এরপর তা পুরো দেশে বিস্তৃত করা হয়। কাবুল গ্রুপের ঘনিষ্ঠ সূত্র এবং তালেবান সরকারের ভেতরের সূত্রগুলো বিবিসিকে জানিয়েছে, এরপর যা ঘটেছিল তা ছিল তালেবানের ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন এক ঘটনা। সংক্ষেপে বলা যায়, কাবুল গ্রুপের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মন্ত্রীরা একত্রিত হয়ে কাবুলভিত্তিক প্রধানমন্ত্রী মোল্লা হাসান আখুন্দকে ইন্টারনেট পুনরায় চালুর নির্দেশ দিতে রাজি করান।

ক্ষমতার দ্বন্দ্ব,তালেবান,ভাঙন
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত