ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

'সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা' দেশের তালিকা থেকে সিরিয়াকে বাদ দিল যুক্তরাষ্ট্র

'সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা' দেশের তালিকা থেকে সিরিয়াকে বাদ দিল যুক্তরাষ্ট্র

দীর্ঘ সাড়ে চার দশক পর সিরিয়াকে 'সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা' রাষ্ট্রের তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্তকে 'ঐতিহাসিক' হিসেবে আখ্যা দিয়ে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা বলেছেন, "১৪ বছরের গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত সিরিয়ার পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে এই পদক্ষেপ বড় ভূমিকা রাখবে।"

আল জাজিরা জানিয়েছে, ৮ জুলাই সিরিয়াকে কালো তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিয়ম অনুযায়ী ৪৫ দিনের আবশ্যিক পর্যালোচনা শেষে সোমবার থেকে সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয়েছে।

এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ থেকে সিরিয়াকে পুরোপুরি দূরে রাখার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট শারার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার ও ইতিবাচক পদক্ষেপের স্বীকৃতি হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ওয়াশিংটনের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন শারা।

ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, "সিরিয়া তার বেদনাদায়ক অতীত পেছনে ফেলে উন্নয়ন, পুনর্গঠন ও দেশ গড়ার যুগে প্রবেশ করছে।"

তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদের সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ এনে ১৯৭৯ সালে সিরিয়াকে কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল ওয়াশিংটন।

হাফেজের ছেলে বাশার আল-আসাদের দীর্ঘ শাসনকালেও তালিকাটি বহাল ছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শারার নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহীদের ঝটিকা অভিযানে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হন।

সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা রাষ্ট্রের তালিকায় থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সাহায্য, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রি, সামরিক-বেসামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য নির্দিষ্ট কিছু সামগ্রী এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে সিরিয়ার ওপর কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ছিল।

ওয়াশিংটন তার ব্যাপকভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচি তুলে নেওয়ার পরও এই তালিকার কারণে বিদেশি ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীরা সিরিয়ায় বিনিয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করতেন।

ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক কিম্বারলি হ্যালকেট জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সিরিয়ার প্রায় পাঁচ দশকের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটল।

তিনি বলেন, "কালো তালিকায় এখন কেবল কিউবা, ইরান ও উত্তর কোরিয়া অবশিষ্ট রইল। এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বৈধতা পাওয়ার যে চেষ্টা শারার সরকার করছিল, তার দুয়ার খুলে দেবে। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা বিনিয়োগের পথ সুগম করবে।"

কিম্বারলির মতে, এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বড় কৌশলগত লক্ষ্য হলো সিরিয়াকে ইরান ও রাশিয়ার প্রভাব বলয় থেকে বের করে আনা এবং দেশটির দীর্ঘদিনের একঘরে অবস্থার অবসান ঘটানো।

এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শারার নেতৃত্বাধীন সাবেক সশস্ত্র গোষ্ঠী 'আল-নুসরা ফ্রন্ট' (পরবর্তীতে 'হায়াত তাহরির আল-শাম' নামে পরিচিত) এর ওপর থেকেও বৈশ্বিক সন্ত্রাসী সংগঠনের তকমা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এইচটিএস একসময় আল-কায়েদার সিরীয় শাখা হিসেবে কাজ করত।

পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে শারা সম্প্রতি ট্রাম্প এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আল-নুসরা ফ্রন্টকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি পশ্চিমা বিশ্বে শারার প্রতি আস্থার প্রতিফলন বলেও মনে করা হচ্ছে।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক বিবৃতিতে জানান, এই পদক্ষেপ সিরিয়ায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বাড়তি বিনিয়োগে সহায়তা করবে। এটি সিরিয়াকে নিষেধাজ্ঞার কবল থেকে মুক্তি দিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সম্পর্কের নতুন অধ্যায়--- সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, "ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল, যা সিরিয়া ও গোটা অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে।"

দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর সাফওয়াত রাসালান এক্সে লিখেছেন, "এটি এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, যা বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সিরিয়াকে তার স্বাভাবিক স্থানে ফিরিয়ে আনবে।"

তিনি জানান, নতুন ও নির্ভরযোগ্য আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে।

সিরিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থা সানার খবরে বলা হয়েছে, অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ বারনিহ এই পদক্ষেপকে "কূটনীতির বড় ও ঐতিহাসিক সাফল্য" হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে সিরিয়ার সংযুক্ত হওয়া এবং বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি আকর্ষণের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত দরজা এখন উন্মুক্ত হলো।

সিরিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন বিশেষ দূত টম বারাকও সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, "বিচ্ছিন্নতা থেকে অংশীদারিত্বে এবং সন্ত্রাসবাদের উৎস থেকে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ের এক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অংশীদার হয়ে ওঠার এই অভাবনীয় যাত্রায় এটি সিরিয়ার জন্য এক নির্ণায়ক পদক্ষেপ।"

যুক্তরাষ্ট্র,সিরিয়া,বাদ,সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা,তালিকা
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত