
আসন্ন ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। ইসির তথ্য অনুযায়ী, এবার মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচন একটি অপরিহার্য বিষয়। রাষ্ট্রের নাগরিকরা ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে বাছাইয়ের সুযোগ পায়। প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দল ও প্রার্থীদের জন্য ভোট হচ্ছে ক্ষমতায় যাওয়ার মোক্ষম হাতিয়ার। আবার অনেক ভোটারের কাছে ভোটের গুরুত্ব খুবই সামান্য। সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, অধিকাংশ ভোটার দলভিত্তিক ভোট দিয়ে থাকেন, অনেকেই আবার এলাকার উন্নয়নমূলক কাজকর্ম যার দ্বারা বেশি হবে বলে মনে করেন, তাকে ভোট দিয়ে থাকেন। ইসলামের দৃষ্টিতে ভোটের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামে কাউকে ভোট দেওয়ার অর্থ খুবই ব্যাপক এবং সুদূরপ্রসারী। তাই ভোট দেওয়ার আগে ইসলামের দৃষ্টিতে এর গুরুত্ব জানা দরকার।
নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন পদ্ধতি : নেতা নির্বাচনে অত্যন্ত দায়িত্বশীল হওয়ার তাগিদ দেয় ইসলাম। কারণ, ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট একটি পবিত্র আমানত। এ আমানত ওই ব্যক্তির কাছেই গচ্ছিত রাখতে হবে, যিনি শিক্ষিত, সৎ, যোগ্য, ন্যায়পরায়ণ, নিরপেক্ষ এবং রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবতার কল্যাণে কাজ করেছেন, করছেন ও করবেন। এ ছাড়া যিনি তার অন্তরে জবাবদিহির ভয় পোষণ করেন, তাকে ভোট দিলে সমাজের কল্যাণকর কাজ হবে এবং অসৎ, অযোগ্য, পক্ষপাতদুষ্ট, অশিক্ষিত, সমাজবিরোধী ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলে তার দ্বারা সমাজের ধ্বংসাত্মক ছাড়া আর কোনো কাজ করা সম্ভব হয় না। ইসলামের দৃষ্টিতে ভোটের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)-এর কাফন-দাফনের চেয়ে রাষ্ট্রের নেতা নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়ে আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে খলিফা নির্বাচিত করেছিলেন। দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাস, ঘুষখোর, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনকারী, মিথ্যাবাদী, ধর্মের প্রতি উদাসীন, খোদাদ্রোহী ব্যক্তিদের প্রার্থী হওয়া বা ক্ষমতায় বসার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। নির্বাচনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য ইসলাম সর্বদা ব্যক্তির সততা, যোগ্যতা, আল্লাহভীতি, ঈমান-আমল, জ্ঞান ও চারিত্রিক গুণাবলিকে প্রাধান্য দিয়েছে। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হওয়া যেমন জরুরি, প্রার্থী বা নির্বাচিত ব্যক্তিও তেমন সৎ-যোগ্য, জ্ঞানী-গুণী, চরিত্রবান, আল্লাহভীরু, আমানতদার, ন্যায়পরায়ণ, দেশপ্রেমিক, মানবদরদি ও দায়িত্বানুভূতিসম্পন্ন হওয়া তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
ইসলাম সামাজিক ও মানবিক ধর্ম : ইসলামের দৃষ্টিতে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটাই একটি ইবাদত। এর মাধ্যমে দেশ, ধর্ম ও মানবতার সেবা করার বিরাট সুযোগ লাভ করা যায়। যারা প্রার্থী হবেন, তারা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রত্যাশায় মানবতার সেবার নিয়তে প্রার্থী হন এবং আমানতদারির সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে আল্লাহকে ভয় করে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তারা শুধু দুনিয়ায় সম্মানিত হবেন না, বরং আল্লাহর কাছেও বড় মর্যাদার অধিকারী হবেন। ইসলাম সমাজকর্মীদের বড় মর্যাদা দিয়েছে। তাদের কর্মকে গুরুত্বের সঙ্গে গণ্য করেছে। নিয়ম ও স্তর অনুযায়ী তাদের বিপুল পরিমাণ সওয়াব দেওয়া হবে বলে হাদিসে এসেছে। সুতরাং প্রার্থী যদি নির্বাচিত হয়ে দেশ, ধর্ম ও মানুষের জন্য কল্যাণকর এবং সওয়াবের কাজ করেন, তখনই শুধু তিনি সে সম্মান ও মর্যাদা পাবেন। যারা ভোট দিয়ে তাকে নির্বাচিত করবেন, তারাও অনুরূপ সওয়াব ও মর্যাদার অধিকারী হবেন। কারণ, ভোটারদের কারণেই তিনি এমন পুণ্যময় কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। নির্বাচিত ব্যক্তি যদি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়ে মানবতাবিরোধী এবং ইসলামবিরোধী ও নির্যাতনমূলক কাজ করেন, তাহলে তাকে শুধু নয়, যারা তাকে নির্বাচিত করবেন এবং ভোট দেবেন, সবাইকে এসব অপকর্মের দুর্ভোগ পোহাতে হবে। যেহেতু তাদের ভোট পেয়ে নির্বাচিত হওয়ার ফলেই এতসব অপকর্ম করার সুযোগ ওই মন্দ লোকটি পেয়েছে। কেউ যদি ক্ষমতা পেয়ে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে, দুর্নীতি করে, পক্ষপাতিত্ব করে, জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করে, ইসলামবিরোধী কাজ করে, সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানকে পাপের বাজারে পরিণত করে, সে ব্যক্তি বা তার দলই শুধু আল্লাহর গজবে নিপতিত হবে না; বরং তারা সমাজ, রাষ্ট্র ও পৃথিবীকে অশান্ত করে তুলবে।
ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট তিনটি বিষয়ের সমষ্টি : ১. সাক্ষ্য দেওয়া : প্রতিনিধি বা নেতা নির্বাচনে অনেক প্রার্থীই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে থাকেন। তাদের মধ্য থেকে আমরা মাত্র একজনকে ভোট প্রদানের ক্ষমতা রাখি। যাকে ভোট প্রদান করলাম, তাকে সাক্ষ্য প্রদান করলাম, তিনি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক দায়িত্ব পালনে আস্থাশীল একজন সৎ, যোগ্যপ্রার্থী। যদি আমরা কোনো প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে অযোগ্য, অসৎ বা মন্দ লোককে
ভোট প্রদান করি, তবে তার অর্থ দাঁড়ায়- আমি মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করলাম; যা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি বড় অপরাধ ও গোনাহের কাজ। এ ব্যাপারে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা, তোমরা আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য প্রদানে ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।
যদি তা তোমাদের নিজেদের কিংবা পিতামাতা অথবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়। যদি সে বিত্তশালী হয় কিংবা দরিদ্র হয়। তবে আল্লাহ উভয়ের ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা (প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে) এড়িয়ে যাও, তবে জেনে রেখ! তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত।’ (সুরা নিসা : ১৩৫)। এ ছাড়া পবিত্র কোরআনে আরও অনেক আয়াতে সত্য সাক্ষী প্রদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব, যেকোনো নির্বাচনে প্রতিনিধি বা নেতা নির্বাচিত করতে অসৎ, অযোগ্য প্রার্থীকে ভোট প্রদান করলে তার জন্য মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
২. সুপারিশ করা : কোনো ব্যক্তি কোনো প্রার্থীকে ভোট প্রদানের অর্থ হলো, সে ব্যক্তি ওই প্রার্থীকে একজন সৎ, যোগ্য প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত করার সুপারিশ করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি সৎকাজের জন্য কোনো সুপারিশ করবে, তা থেকে (সৎ কাজের) একটি অংশ পাবে। আর যে ব্যক্তি মন্দ কাজের সুপারিশ করবে, সে তার (মন্দ কাজের) একটি অংশ পাবে। আর আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ের সংরক্ষণকারী।’ (সুরা নিসা : ৮৫)।
৩. প্রতিনিধির ক্ষমতা প্রদান করা : ক্ষমতা প্রদান হলো ভোট প্রদানে ইসলামের তৃতীয় মূলনীতি। জেনে-শুনে-বুঝে কোনো অসৎ ও অযোগ্য ব্যক্তিকে ভোট প্রদান করার পুরো দায়ভার যিনি ভোট প্রদান করবেন, তাকেই বহন করতে হবে। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আমি আসমানসমূহ, জমিন ও পর্বতমালার প্রতি এ (মানুষের জীবন পরিচালনায় ইসলামের বিধিবিধান পালনের) আমানত পেশ করেছিলাম। কিন্তু তারা তা বহন করতে অস্বীকৃতি জানায়।
তারা তাতে আশঙ্কিত হলো, কিন্তু মানুষ সে দায়িত্বভার গ্রহণ করল। সে বড়ই অন্যায়কারী, বড়ই অজ্ঞ।’ (সুরা আহজাব :৭২)। অতএব, প্রতিটি নির্বাচনে সৎ ও যোগ্যপ্রার্থীকে ভোট প্রদান আমাদের ঈমানি দায়িত্ব। কোনো প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে বা অর্থের বিনিময়ে অযোগ্য ও অসৎ লোককে ভোট প্রদান একটি গোনাহের কাজ। অতএব, ভোটাধিকার প্রদানের ব্যাপারে সম্পূর্ণভাবে সচেতন থাকা অত্যাবশ্যক।
ভোট অবশ্যই দিতে হবে : বর্তমান সমাজে অধিকাংশ আসনের লোকদের ভোট দেওয়াই সম্ভব হবে না। কারণ, এমন লোক তো পাওয়া যাবে না, যার স্বপক্ষে সাক্ষ্যপ্রদান করা যায় এবং এ কারণে অনেকে ভোট দেওয়া থেকে বিরতও থাকেন, এমনকি বহু লোক ভোটার হতেও আগ্রহী হন না।
সাধারণ বিবেচনায় এ চিন্তা যুক্তিযুক্ত মনে হলেও এ ক্ষেত্রে কিন্তু মুদ্রার ভিন্ন পিঠও রয়েছে। তা হচ্ছে, মন্দের ভালো বা তুলনামূলক কম ক্ষতিকে বেছে নেওয়া এবং অধিক ক্ষতি থেকে বাঁচার চেষ্টা করা। বর্তমানে ভোটকে এ দৃষ্টিকোণ থেকেই বিবেচনায় আনতে হবে এবং ভোটের মাধ্যমে অধিক ক্ষতি থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। কোনো আসনে একজন লোককেও যদি সাক্ষ্য ও ভোট দেওয়ার উপযুক্ত মনে না হয়, তবে তাদের মধ্যে যে জন নীতি-নৈতিকতা, চিন্তা-চেতনা ও কাজে-কর্মে অন্য প্রার্থীর তুলনায় কম খারাপ, তাকেই ভোট দিতে হবে। কারও ব্যাপারে যদি ইসলাম, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থবিরোধী হওয়ার সুস্পষ্ট আলামত থাকে, তবে ভোটারাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ওই অসৎ ব্যক্তির বিজয় ঠেকানোর চেষ্টা করতে হবে।
মোটকথা, গণতন্ত্র ও বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতির যতই ত্রুটি থাকুক, এর কারণে ভোট দানে বিরত থাকা সমীচীন হবে না; বরং ভালো-মন্দের ভালো অথবা অন্তত কম মন্দের পক্ষে ভেবে-চিন্তে ভোটারাধিকার প্রয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শরিয়তের দৃষ্টিতে কাউকে ভোটদানের অর্থ হবে, এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, লোকটি তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় কিছুটা হলেও ভালো।