ঢাকা সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বাংলাদেশে মাদক ব্যবহারকারী ৮২ লাখ, জাতীয় গবেষণায় প্রকাশিত

বাংলাদেশে মাদক ব্যবহারকারী ৮২ লাখ, জাতীয় গবেষণায় প্রকাশিত

বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরণ ও সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। রোববার (২৫ জানুয়ারি) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হল, রুম ৫০৪-এ অনুষ্ঠিত গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) মাননীয় ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম।

বিশেষ অতিথি ছিলেন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জনাব মো. হাসান মারুফ। প্রধান গবেষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউ’র সম্মানিত ডীন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী।

ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, মাদক প্রতিরোধে পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট ও গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি সবাইকে সচেতন হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে মাদক ঝুঁকির মোকাবিলা করার আহ্বান জানান।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, দেশের মানুষ মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে মাদকবিরোধী লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, পরিবার থেকেই মাদক প্রতিরোধ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া ঢাকা ছাড়াও আরও সাতটি বিভাগে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র চালুর প্রকল্প সরকারের পক্ষ থেকে অনুমোদিত হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮১,৯৪,৬৫১ জন মানুষ কোনো না কোনো ধরণের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। সিগারেট সেবনকে মাদক ব্যবহার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। দেশের আটটি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায় Network Scale-Up Method (NSUM) ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

বিভাগের ভিত্তিতে মাদক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহ (৬.০২%), রংপুর (৬.০০%) ও চট্টগ্রাম (৫.৫০%) বিভাগে এবং তুলনামূলকভাবে কম রাজশাহী (২.৭২%) ও খুলনা (৪.০৮%) বিভাগে।

সংখ্যার বিচারে সর্বাধিক ব্যবহারকারী বসবাস করছেন ঢাকা বিভাগে (প্রায় ২২.৯ লাখ), এরপর চট্টগ্রাম (১৮.৮ লাখ) ও রংপুর (প্রায় ১০.৮ লাখ)।

মাদক প্রকারভেদ অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা, যা ব্যবহার করেন প্রায় ৬১ লাখ মানুষ। এরপর রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন (প্রায় ২৩ লাখ), অ্যালকোহল (২০ লাখ), কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইন। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার। একজন মাদকসেবক প্রতি মাসে আনুমানিক ছয় হাজার টাকা খরচ করেন।

মাদক ব্যবহার শুরু বয়সের ওপর ভিত্তি করে দেখা গেছে, প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮-১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশ ব্যবহারকারী ১৮-২৫ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেছেন। মাদক ব্যবহারের ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ ও অনানুষ্ঠানিক পেশা। আশঙ্কাজনকভাবে, প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন যে মাদক সহজলভ্য।

গবেষণায় আরও জানা গেছে, মাত্র ১৩ শতাংশ ব্যবহারকারী কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন। অধিকাংশ ব্যবহারকারী মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছেন, তবে পর্যাপ্ত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও সামাজিক-আর্থিক সহায়তার অভাবে সফলতা কম। ব্যবহারকারীরা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা (৬৯%), কাউন্সেলিং (৬২%) এবং কর্মসংস্থান সহায়তাকে (৪১.২%) জরুরি বলে উল্লেখ করেছেন।

এছাড়া ৬৮ শতাংশ ব্যবহারকারী সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষেত্রে অপবাদ ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাদক সমস্যা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি জটিল জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। শুধুমাত্র শাস্তিমূলক পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণকে অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত জনস্বাস্থ্যভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করাই এখন সময়ের দাবি।

এই তথ্যভিত্তিক গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে জাতীয় নীতি প্রণয়ন, কর্মসূচি পরিকল্পনা এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ গোলাম আজম, কো-ইনভেস্টিগেটর অধ্যাপক ড. মো. তাজুল ইসলাম, কো-ইনভেস্টিগেটর ফোরকান হোসেন, বিএমইউর পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইরতেকা রহমান ও অতিরিক্ত পরিচালক (সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল) ডা. মো. শাহিদুল হাসান বাবুল।

জাতীয় গবেষণায় প্রকাশিত,ব্যবহারকারী ৮২ লাখ,বাংলাদেশে মাদক ব্যবহারকারী
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত