ঢাকা বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৮ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

প্রতীক্ষার অবসান, কাল ভোট উৎসব

প্রতীক্ষার অবসান, কাল ভোট উৎসব

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে কাল বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। উৎসবমুখর আবহের পাশাপাশি ভোটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে টানটান উত্তেজনা। নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন কোটি কোটি ভোটার। এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন সংসদীয় আসনে প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ও নিরাপদ পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি এরইমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ব্যালট পেপার ও নির্বাচন সামগ্রী সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া, ভোটকেন্দ্র প্রস্তুতকরণ, প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টনসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক মোতায়েন রাখা হয়েছে। পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে রয়েছে। যেকোনো অনিয়ম বা সহিংসতা কঠোরভাবে দমন করবেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রস্তুতি সম্পন্ন : আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। ওইদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে একযোগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সম্প্রতি শেরপুর-৩ আসনের একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণের জন্য কমিশনের সব প্রস্তুতি এরইমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা ছাড়া আর কোনো প্রস্তুতি বাকি নেই। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।’ ভোটার উপস্থিতি প্রসঙ্গে মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে ভোটের হার ৫৫ শতাংশের কম বা বেশি হতে পারে বলে আমার ধারণা।’

আজ সকাল থেকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছাবে ব্যালট পেপার- ইসি সানাউল্লাহ : নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, এরইমধ্যে জেলা থেকে ব্যালট পেপার উপজেলায় পৌঁছে গেছে। আজ বুধবার সকাল থেকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছে যাবে ব্যালট পেপার। গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

ইসি সানাউল্লাহ বলেন, ২৯৯ আসনে ভোট হচ্ছে। ভোটগ্রহণ সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। নির্বাচনে ২ হাজার ২৮ প্রার্থী অংশ নেবেন, যার মধ্যে ৮১ জন নারী। মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার। নারী-পুরুষ প্রায় সমান। তিনি আরও বলেন, দেশীয় পর্যবেক্ষক ৪৫ হাজার ৩১৩ জন, বিদেশি ৩৫০। বিদেশি সাংবাদিক নিবন্ধন করেছেন ১৫৬ জন। নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য।

ভোটের ফল প্রকাশে দীর্ঘ সময় লাগবে না - ইসি সচিব : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ২৯৯টি আসনে সব ব্যালট পেপার চলে গেছে। ভোটের ফল প্রকাশে দীর্ঘ সময় লাগবে না বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ। মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য মিডিয়া সেন্টার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। আখতার আহমেদ বলেন, ‘রক্তস্নাত জুলাই আন্দোলনের অন্যতম অঙ্গীকার সুষ্ঠু নির্বাচন। স্বীকার করছি ভোটার তালিকা শতভাগ শুদ্ধভাবে যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হয় নাই। তরুণ ভোটারদের অন্তর্ভুক্তিতে আইন সংশোধন করা হয়েছে। ৩১ অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত ১৮ বছর হয়েছে তাদেরই ভোটার করা হয়েছে।’ ইসি সচিব বলেন, ২৯৯ আসনে সব ব্যালট পেপার চলে গেছে। ভোট গ্রহণের সব প্রস্তুতি শেষ। উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাররা ভোট দিতে কেন্দ্রে যাবেন।

কত ভোট পড়ল, ২ ঘণ্টা পরপর জানাবে ইসি : ভোটগ্রহণ চলাকালে নির্বাচনি পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দুই ঘণ্টা পরপর ভোট প্রদানের হার সংগ্রহ করা হবে। এ তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ইসি সচিবালয়ে পাঠানো হবে বলে জানানো হয়। গত সোমবার ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে বিষয়টি জানা যায়। সেখানে বলা হয়, ভোটগ্রহণের দিন সকাল সাড়ে সাতটা থেকে শুরু হবে এই প্রক্রিয়া। এটি জারি থাকবে বেসরকারি ফলাফল পাওয়া পর্যন্ত। ভোট শেষ হওয়ার পর প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত ভোট গণনার বিবরণী অনুযায়ী প্রাথমিক বেসরকারি ফলাফল সংগ্রহ ও পরিবেশন কেন্দ্র থেকে প্রকাশ করা হবে।

ফলাফল ব্যবস্থাপনা : সেই পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের বেসরকারি ফলাফল ব্যবস্থাপনার জন্য ইসি সচিবালয়ের ইন্টারনাল সাইটে থাকা ইএমএস সফটওয়্যারের নির্ধারিত মডিউল ব্যবহার করতে হবে। ফলাফল এন্ট্রি ও পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের অধীন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর নিয়োগের পাশাপাশি ল্যাপটপ, স্ক্যানার, প্রিন্টার ও ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা তার জন্য নির্ধারিত কেন্দ্রের ফলাফল এন্ট্রি করতে দুজন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর নিয়োগ করবেন, যাদের কাজের জন্য ল্যাপটপ, স্ক্যানার, প্রিন্টার ও নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রিটার্নিং কমকর্তাদের কার্যালয়েও প্রয়োজনীয়সংখ্যক ডেটা এন্ট্রি অপারেটর নিয়োগ করে ল্যাপটপ, স্ক্যানার ও প্রিন্টারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ডেটা এন্ট্রি অপারেটর ভোটকেন্দ্রের ফলাফল এন্ট্রি করার সময় একই ভোটকেন্দ্রের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল একই সঙ্গে এন্ট্রি নিশ্চিত করবেন।

অনুমোদন ছাড়া ড্রোন উড়ালে আইনানুগ ব্যবস্থা : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে টানা ছয় দিন সারা দেশে বেবিচকের অনুমতি ছাড়া সব ধরনের ড্রোন উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা কাওছার মাহমুদ জানান, নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহৃত ড্রোন উড়ানোর অনুমতি থাকবে। অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ সময়ে ড্রোন পরিচালনা করতে পারবে না। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। নির্বাচনকে ঘিরে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন পুরুষ এবং ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন নারী ভোটার রয়েছেন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২২০ জন।

ইসি জানায়, নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে এবং মোট প্রার্থী সংখ্যা ২ হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৫ জন। সবচেয়ে বেশি ২৯১ জন প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। এছাড়া, ঢাকা-১২ আসনে সর্বোচ্চ ১৫ জন এবং পিরোজপুর-১ আসনে সর্বনিম্ন ২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

সারাদেশে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি কক্ষে ভোটগ্রহণ করা হবে। নির্বাচন পরিচালনায় প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তায় প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। এছাড়া, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ৮১টি দেশি সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষকের মধ্যে ৭ হাজার ৯৯৭ জন কেন্দ্রীয়ভাবে এবং ৪৭ হাজার ৪৫৭ জন স্থানীয়ভাবে সংসদীয় আসনভিত্তিক পর্যবেক্ষণ করবেন এবং প্রায় ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক উপস্থিত থাকবেন বলে জানায় নির্বাচন কমিশন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৭৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সব ধরনের জনসভা, মিছিল বা শোভাযাত্রার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

প্রতীক্ষা,উৎসব,অবসান
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত