ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র নিয়ে আবুল মনসুর আহমদের প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক

রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র নিয়ে আবুল মনসুর আহমদের প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক

পাকিস্তান রাষ্ট্রের সূচনালগ্ন থেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ। তার চিন্তায় কোনো স্থির মতাদর্শের চেয়ে জনগণের প্রয়োজন, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও উপযোগিতা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

রাষ্ট্র, ধর্ম ও গণতন্ত্র নিয়ে তিনি যে প্রশ্নগুলো উত্থাপন করেছিলেন, তার অনেকগুলোই আজও প্রাসঙ্গিক।

আবুল মনসুর আহমদের স্মরণে আয়োজিত ‘ধর্মশাসিত রাষ্ট্র, না রাষ্ট্রশাসিত ধর্ম?’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে আলোচনা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পরিষদ। গতকাল শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের হুইটম্যান কলেজের শিক্ষক ও গবেষক তৈমুর রেজা ‘আবুল মনসুর আহমদ: ডেমোক্রেসি অ্যান্ড দ্য নোভেল্টি অব দ্য পাকিস্তানি কনস্টিটিউশনাল এক্সপেরিমেন্ট’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

প্রবন্ধে ১৯৫৬ সালের গণপরিষদে আবুল মনসুর আহমদ ফেডারেল কাঠামো নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তা তুলে ধরেন তৈমুর রেজা। তিনি বলেন, ওই প্রশ্নের কেন্দ্রে ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যাগত বাস্তবতা এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার রাজনৈতিক সংকট।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃত্বের আশঙ্কা ছিল—শক্তিশালী কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হলে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে সেই কেন্দ্রের ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে চলে যাবে। আবুল মনসুর আহমদের অবস্থানের ভিত্তি ছিল জনগণের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা এবং এমন একটি ফেডারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কেন্দ্রের ক্ষমতা সীমিত থাকবে।

তৈমুর রেজা বলেন, আবুল মনসুর আহমদের ফেডারেল চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল ‘দুই অর্থনীতি’ ধারণা। ভৌগোলিকভাবে ভারতের প্রায় এক হাজার মাইল ভূখণ্ড দিয়ে বিচ্ছিন্ন পাকিস্তানের দুই অংশকে তিনি অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকেও পৃথক হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কাঠামো ও স্বার্থকে একটি একক অর্থনৈতিক কাঠামো দিয়ে বিচার করলে পূর্ব পাকিস্তানের বঞ্চনা অব্যাহত থাকবে।

আবুল মনসুর আহমদকে উদ্ধৃত করে তৈমুর রেজা বলেন, কেন্দ্রের হাতে অধিকাংশ ক্ষমতা থাকলে এ বৈষম্য কমানো সম্ভব নয়। তাই তাঁর প্রস্তাবিত ফেডারেল ব্যবস্থায় কেন্দ্রের ক্ষমতা সীমিত করার পাশাপাশি প্রদেশগুলোর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার বিষয়টি ছিল মৌলিক।

তিনি আরও বলেন, আবুল মনসুর আহমদ লাহোর প্রস্তাব ও ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী অঙ্গীকারকে গণপরিষদের সদস্যদের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে দেখেছিলেন। যুক্তফ্রন্ট যে তিনটি বিষয়ের ফেডারেশনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেয়েছিল, সেই অঙ্গীকারের বাইরে গিয়ে গণপরিষদ ইচ্ছেমতো সংবিধান প্রণয়ন করতে পারে না—এটাই ছিল তাঁর যুক্তির অন্যতম ভিত্তি।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম বলেন, আবুল মনসুর আহমদকে বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তার ‘প্র্যাগম্যাটিক’ বা বাস্তববাদী চরিত্র বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক প্রজা পার্টি থেকে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে তাঁর যাত্রা, বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান এবং আত্মজীবনীতে নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা—সব ক্ষেত্রেই তিনি কোনো স্থির মতাদর্শের চেয়ে জনগণের প্রয়োজন, বাস্তবতা ও রাজনৈতিক উপযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ১৯৫৬ সালের সংবিধান বিতর্কেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। আবুল মনসুর আহমদ তখন বলেছিলেন, পাকিস্তানের বড় সমস্যা হলো, ‘আমরা দুই জনগোষ্ঠী, কিন্তু আমাদের এক জাতি হতে হবে।’

মোহাম্মদ আজম বলেন, ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধান বিতর্কে আবুল মনসুর আহমদ লাহোর প্রস্তাবকে এমন একটি ফেডারেল ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে দেখেছিলেন, যেখানে প্রদেশগুলোর স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতা নিশ্চিত থাকবে। ১৯৭২ সালেও তিনি একই যুক্তি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে লাহোর প্রস্তাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; বরং তার বাস্তবায়ন হয়েছে।

মোহাম্মদ আজমের মতে, আবুল মনসুর আহমদ যে সমস্যাগুলো নিয়ে লিখেছেন, তার অনেকগুলোই বাংলাদেশ এখনো অতিক্রম করতে পারেনি। এ কারণে তাঁর লেখা ও চিন্তার নিবিড় একাডেমিক পাঠ বর্তমানের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানের আরেক আলোচক গীতিকবি ও সমাজ বিশ্লেষক শহীদুল্লাহ ফরায়জী বলেন, আবুল মনসুর আহমদের প্রাসঙ্গিকতা শুধু তাঁকে স্মরণ করার মধ্যে নয়, তাঁর চিন্তাকে বর্তমান রাষ্ট্র ও সমাজে প্রয়োগ করার মধ্যেই। ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে আবুল মনসুর যে সতর্কতা দিয়ে গেছেন, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ধর্মের ব্যবহার থেকে মুক্ত রাখা জরুরি।

তিনি বলেন, আবুল মনসুর আহমদের চিন্তা থেকে এসব মূল্যবোধ ধারণ করতে পারলেই তাঁকে বর্তমানের রাষ্ট্র নির্মাণের লড়াইয়ে জীবন্ত রাখা সম্ভব।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক ও কবি ইমরান মাহফুজ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আবুল মনসুর আহমদের ছেলে ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিনসহ আরও অনেকে।

আজও প্রাসঙ্গিক,আবুল মনসুর আহমদ,রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত