
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে করা নতুন এক প্রাক্-নির্বাচনী জনমত জরিপে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত মিলেছে। জরিপের ফল অনুযায়ী, ৩৪.৭ শতাংশ সম্ভাব্য ভোট নিয়ে বিএনপি সামান্য এগিয়ে থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ৩৩.৬ শতাংশ, অর্থাৎ দুই দলের ব্যবধান মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রজেকশন বিডি, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি (আইআইএলডি), জাগরণ ফাউন্ডেশন এবং ন্যারাটিভের যৌথ উদ্যোগে ‘প্রি-ইলেকশন পালস: অ্যান ইন-ডেপথ অ্যানালাইসিস অব দ্য বাংলাদেশি ইলেক্টোরেট’ শীর্ষক এই জরিপ পরিচালনা করা হয়।
জরিপের পদ্ধতি
জরিপটি ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালে পরিচালিত হয়। এতে দেশের ৬৪টি জেলার ২৯৫টি সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত ২২ হাজার ১৭৪ জন নিবন্ধিত ভোটার অংশ নেন। ভৌগোলিক, শহর-গ্রাম ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্য নিশ্চিত করতে স্ট্র্যাটিফায়েড স্যাম্পলিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় এবং ২০২২ সালের জাতীয় আদমশুমারির ভিত্তিতে পোস্ট-স্ট্র্যাটিফিকেশন ওয়েটিং প্রয়োগ করা হয়েছে।
সম্ভাব্য ভোটের বণ্টন
জরিপে বর্তমান জনসমর্থনের ভিত্তিতে সম্ভাব্য ভোটের হিসাব উঠে এসেছে এভাবে—
তবে মেশিন লার্নিংভিত্তিক প্রজেকশন অনুযায়ী, সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সম্ভাব্য ঝোঁক যুক্ত হলে বিএনপির সমর্থন ৪৩.২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ৪০.৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
কোন কারণে কোন দলে সমর্থন
বিএনপি: জরিপে বিএনপির ৭২.১ শতাংশ সমর্থক দলটির অতীত অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতাকে সমর্থনের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩০–৪৪ বছর (৩৮.৪%) এবং ৪৫–৫৯ বছর (৩৭.৪%) বয়সী ভোটারদের মধ্যে দলটির সমর্থন বেশি। পেশাভিত্তিকভাবে কৃষক (৪২.৬%) ও শ্রমিকদের (৪০.৬%) মধ্যে বিএনপির অবস্থান তুলনামূলক শক্ত।
জামায়াতে ইসলামী: জামায়াতের সমর্থকরা দলটিকে ‘কম দুর্নীতিগ্রস্ত’ (৪৪.৮%) এবং ‘সততার ভাবমূর্তি’ (৪০.৭%)–এর কারণে সমর্থন করছেন বলে জরিপে উঠে এসেছে। ১৮–২৯ বছর বয়সী তরুণ ভোটারদের মধ্যে দলটির সমর্থন সবচেয়ে বেশি (৩৩.৬%)। পাশাপাশি স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের মধ্যে জামায়াতের সমর্থন ৩৭.৪ শতাংশ, যা অন্য যে কোনো দলের চেয়ে বেশি। তরুণ ও শিক্ষিত ভোটারদের মধ্যে ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যমে দলটির সক্রিয়তাও সমর্থন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
নতুন শক্তি ও সিদ্ধান্তহীন ভোটার
নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি (এনসিপি) সমর্থনের ক্ষেত্রে ৩৬.৭ শতাংশ উত্তরদাতা ‘জুলাই বিপ্লবে ভূমিকা’-কে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
জরিপে দেখা গেছে, ১৭ শতাংশ ভোটার এখনও সিদ্ধান্তহীন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ জানিয়েছেন, তারা কোনো রাজনৈতিক দলকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না। এই সিদ্ধান্তহীন ভোটাররাই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারেন বলে মনে করছেন জরিপকারীরা।
সার্বিক মূল্যায়ন
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনটি মূলত দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে প্রতিযোগিতায় রূপ নিতে পারে। একদিকে ‘প্রয়োজনের শ্রেণিবিন্যাস’ (বিএনপির অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা) এবং অন্যদিকে ‘মূল্যবোধের শ্রেণিবিন্যাস’ (জামায়াতের সততা ও ন্যায়বিচার)। একই সঙ্গে বিপুল সংখ্যক ভোটার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।