প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ আগস্ট, ২০২৬
জগলুল হায়দার, নামটা শুনলেই ভেসে ওঠে একজন ছড়াকারের মুখচ্ছবি। কিন্তু মনে রাখা জরুরি যে, উনি শুধু একজন ছড়াকার নন। ছড়াকারের ‘অধিক কিছু’। আমরা মনে করি, এই ‘অধিক কিছু’ হয়ে ওঠাই জগলুল হায়দারের এক জীবনের সার্থকতা।
যে জীবন সর্বজনীন পরিচয় বা পরিচিতি নির্মিত হওয়ার পরও নিরলস সাধনায় হয়ে ওঠে তারও ‘অধিক কিছু’, সেই জীবনই হল মহোত্তম জীবন। সক্রেটিসকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, দেশপ্রেম কী? উনি বলেছিলেন, নিজের কাজটা ঠিকভাবে করাটাই হল দেশপ্রেম।
নিজের কাজটা সঠিকভাবে করাটা যেমন দেশপ্রেম, তেমনি কোন কাজ যতটুকু করার তার চেয়ে যদি কিঞ্চিত হলেও বেশি করা হয়। যতটুকু দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ দরকার, দায় ও দরদ প্রয়োজন- তার চেয়ে যদি ‘একটু বেশি’ বা ‘অধিক কিছু’ যুক্ত হয়; তখন সেই কাজে প্রতিফলিত হয় মহোত্তম এক জীবনের প্রতিচ্ছবি। জগলুল হায়দারের ছড়ায় রয়েছে সেই মহোত্তম জীবনের উপস্থিতি। কেন কীভাবে- সেই নিমিত্তে এ ঘোষণা, বুদ্ধিজীবী শুনুন সবে।
ছড়া হচ্ছে সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী শাখা। কিন্তু এ শাখার এ সময়ের যে প্রকাশ, বিশেষত আমাদের কালে, কিংবা নিকট অতীতে- তা আশাবাদী হওয়ার মতো নয় মোটেই। প্রত্যাশাকে গভীরভাবে ছুঁয়েও যায় না। তাৎক্ষণিকতার দাবি মেটায়, কিন্তু বিশেষ সমীহ আদায় করে নিতে পারে না। তাৎক্ষণিকতার দৌড়ে শামিল থেকেই বাদ্যি বাজায়, আত্মতুষ্টিতে ভুগে- বন্ধু জয়ের-রাজ্য জয়ের, ক্ষেত্রবিশেষে বিশ্বজয়েরও। কিন্তু সেই বাদ্যি-পটকার শব্দকেও ছাড়িয়ে যায় না। তাৎক্ষণিতাকে পুঁজি করে ধ্রুপদ হয়ে ওঠার যে প্রয়াস ও প্রচেষ্টা তার কোশেশ দুর্লক্ষ্য প্রায়। অথচ যারা ছড়া লেখেন, কতোটা মহোত্তম প্রতিভার অধিকারী উনারা তা যদি একবার ভেবে দেখতেন।
জগলুল হায়দারকে নিয়ে লেখায় এসব কথা কথা বলার প্রাসঙ্গিকতা খুঁজি আসুন উনার কয়েকটা ছড়া পাঠ করে-
এক.
প্রাচ্য ওঠো প্রাচ্য জাগো/মডার্ন ফুটো মডার্ন ভাগো।/ প্রাচ্য ওঠো সাইদ ডাকে/ওরিয়েন্টাল পথের বাঁকে/যে বেদনার বর্ণ আঁকে- /উপেক্ষাতে তোমরা তাকে;/আর কতোকাল এড়িয়ে যাবে/আর কতোকাল আগের মতোই/মডার্ন পথে বেড়িয়ে যাবে।/ প্রাচ্য ওঠো প্রাচ্য জাগো/মডার্ন ফুটো মডার্ন ভাগো।/
তোমার কাবা তোমার কাশি/জেরুজালেম যিশুর হাসি/এসব তোমার;/তবুও করিম কেশব তোমার/ আর কতোকাল ধুঁকবে/ গাজার হাজার নির্যাতিত/কেবল মাথা ঠুকবে?/প্রাচ্য ওঠো প্রাচ্য জাগো/মডার্ন ফুটো মডার্ন ভাগো।/
মডার্নিজম কী দিয়েছে?/ কলোনি- /সেই কলোনির কূপে তুমি/ চারশ বছর জ্বলোনি!/ তাইলে হালা বোধের তালা/ জলদি এবার খুইলা ফালা/মডার্নরে ক বাই!/
পোস্টমডার্ন প্রেক্ষিতে আজ/ নতুন শ্লোগান চাই;/ সিদ্ধার্থের সাম্য এবং/ মুহাম্মদের মহান আশা!/ কালার বাঁশি মুসার লাঠি/ প্রাচ্য খাঁটি প্রাচ্য খাঁটি/ ইব্রাহিমের পোলায়- / আর কতোকাল/ ঘুরবে ছেঁড়া ঝোলায়? (‘নতুন স্লোগান’/দশ ছড়া বস ছড়া)।
দুই.
মন্ত্রী ডেকে রাজা হাঁকেন, নোটিশ দিয়ে বলিও- / এখন থেকে প্রশাসনে সবাই হবেন দলীয়,/ টার্মিনাল আর হলের পরে দখল হবে গলিও/ দলের নামেই চাঁদ উঠবে ফুটবে ফুলের কলিও!/ দলের নামে বাষ্প থেকে মেঘ হবে সব জলীয়/ দল-পরিচয় যাচাই করেই পড়বে ক্ষেতের পলিও,/ দলের নামে চলবে চ্যানেল, উড়বে ভ্রমর অলিও/ দলের প্রেমে ঘাটতি হলে ভাঙবে ঠ্যাঙের নলিও! (‘দলীয়করণ’/দশ ছড়া বস ছড়া)।
জগলুল হায়দারের ছড়ার পরতে পরতে রয়েছে রাজনীতির গতায়াত। তাই বলে আমরা যেন মনে না করি, উনি শুধুই রাজনৈতিক ছড়াকার। তিনি আসলে বিবিধ বিষয়ে লিখেছেন এবং এটাই মহোত্তম প্রতিভার শক্তি বলে।
মাকে নিয়ে জগলুলের এ ছড়াটা বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ সংযোজন। যা পাঠ করলে আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের, শামসুর রাহমানের মাকে নিয়ে লেখাগুলোও স্মৃতিতে হাজির হয়। তিনি লিখেছেন-
‘কৌতূহলে/ কোলের ছেলে/ প্রশ্ন করে মাকে- / কেমন করে/ কোলটা ভরে/ মা পেয়েছেন তাকে?/
মা বলে এই/ বুকের খানিক মাঝে/ তুই ছিলি বাপ/ আশার ভাঁজে ভাঁজে।/ তারপর?/ তারপর!/ একদিন এক/ গভীর নিশি যামি- / স্বপ্ন হাটে/ হঠাৎ তোকে/ কুড়িয়ে পেলাম আমি।’
ফিরে আসি জগলুল হায়দারের রাজনৈতিক ছড়া প্রসঙ্গে। রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রযত্ন দিয়ে গেছেন নিজস্ব দর্শনকে। যা ব্যক্তি অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভুত হলেও আবেদনে সর্বজনীন। এখন তা হলে ছড়াকারের রাজনীতির গুটিগুলো উন্মীলন করা যাক।
‘প্রাচ্যবাদ’- ‘নতুন স্লোগান কবিতায় তিনি যে প্রাচ্যকে হাজির করেছেন। প্রাচ্যকে নিয়ে বাংলা ভাষার কোনো ছড়াকারের এরকম বোঝাপড়া এবং প্রত্যাশা আমাদের সম্মুখে এর আগে হাজির হয়নি। উনার প্রাচ্যচিন্তা আকর্ষণীয় ও প্রাচ্যের মানুষের মুক্তির জন্য ইশতেহার স্বরূপ। প্রাচ্যবাদ বা অরিয়েন্টালিজম সম্পর্কে আমাদের সেতুবন্ধ ও জানাশোনার অনেকটাই এডওয়ার্ড সাঈদের অরিয়েন্টালিজমকে ঘিরে। প্রাচ্যের আত্মাকে আবিস্কার করেছেন তিনি। প্রাচ্যতত্ত্বকে নানাভাবে খোলতাই করে দেখিয়েছেন কেন এ তত্ত্বের সঙ্গে প্রাচ্যের মানুষের অধিষ্ঠান অপরিহার্য ও জরুরি। উনার ‘কাভারিং ইসলাম’ বইও প্রাচ্যকে বোঝার জন্য হতে পারে প্রয়োজনীয় এক জ্ঞানকোষ। বাংলাদেশের সাহিত্যে প্রাচ্যের উপস্থিতিতে প্রবন্ধেই বোধ করি সীমিত। মননশীল জগতেই তার অধিষ্ঠান। সৃজনশীলতায় তার উপস্থিতি সেভাবে কখনোই উচ্চকিত হয়নি, হাজির আছে বলেও আমাদের জানা নেই। এক্ষেত্রে জগলুল হায়দার বোধ করি একমাত্র ব্যতিক্রম। তিনি প্রাচ্যতত্ত্বকে সৃজনশীল জগতে এমনভাবে হাজির করেছেন, যা প্রশংসার দাবি রাখে। কারণ পুরো বিষয়টাকে তিনি আন্দোলন হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। যে আন্দোলনের আরেক নাম রাজনীতি। ছড়ায় রাজনীতির উপস্থিতি নতুন নয়।
অন্নদাশঙ্কর রায় লেখেন, ‘তেলের শিশু ভাঙলো বলে শিশুর ওপর রাগ করো/ তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙ্গে ভাগ করো?’ এ ছড়ায় শুধু মানবতা কথা বলে ওঠেনি। দেশভাগের অব্যক্ত ক্রন্দন-যন্ত্রণা ভাষাপ্রাপ্ত হয়নি শুধু? পদণ্ডপদবিতে যারা বড় ও যাদের বড়’র দায়িত্ব পালন করার কথা তাদের ব্যর্থতাকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়নি? এখানে রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, যার মধ্যে অঙ্গুলি নির্দেশ করা হয়েছে সব ক্ষেত্রকে সেই সঙ্গে ব্যক্তিকে। সবচেয়ে বেদনার বিষয় হল, এসব করে রাজনীতির নামে শুদ্ধতা দেয়া হয়েছে। জগলুল হায়দারের ছড়াও এভাবে কথা বলে ওঠে রাজনীতিকে আশ্রয় করে, কখনওবা রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে।