প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
মানবজীবনের ছবি হচ্ছে 'বিষাদ-সিন্ধু'। কাহিনি উপস্থাপনে ইতিহাস রাষ্ট্র ও রাজনীতি এবং ধর্ম নিয়ে এলেও হৃদয়ানুভূতির প্রকাশ দারুণভাবে পরিলক্ষিত হয়। ঔপন্যাসিক কোথাও কোথাও খুব মানবিকও হয়ে ওঠেন। তাতে কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকাশ পেলেও মানবীয় বৈশিষ্ট্যে পুষ্ট কাহিনি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তিনি তার সততা বশত পাঠককে দৃশ্যমান কাহিনির প্রতি অতি আবেগীয় না হওয়ার ইঙ্গিতও প্রদান করেছেন। বিষাদ-সিন্ধু প্রথম পর্ব মহরম পর্বে সর্বমোট ছাব্বিশটি উপপর্ব-সমন্বয়ে পর্বটি সংযোজিত হয়। উপ-পর্বসমূহকে তিনি প্রবাহ নামে সম্পৃক্ত করেন।
মহরম পর্বের পূর্বে ধর্মীয় আবেগ রক্ষিত যেখানে তিনি ইসলামের রসুল (সা.) ও তাঁর সাহাবি মুয়াবিয়ার মধ্যে সংগঠিত ঘটনাও রয়েছে। মুয়াবিয়া রসুলের নিকট জানতে পারেন যে, ইমাম হাসান ও হোসেনের হত্যাকারী হবে কোন এক সাহাবি পুত্র মুয়াবিয়া এখবরের পর অকৃতদার থাকতে চান। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি ঐশ্বরিক পরিকল্পনায়। বরং তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং মাবিয়ার ঔরসে জন্মগ্রহণ করে প্রফেট দৌহিত্রের হন্তারক এজিদ। অন্যান্য চরিত্রগুলোর চেয়ে এজিদ চরিত্র উপন্যাসের কাঠামোকে চরম দ্বন্দ্বমুখর ও বিভাজনের রাজনীতির দ্বার খুলে দেয়।
পাঠক হৃদয়ে আবেগঘন চিন্তা ও মন মানসিকতার ইমাজিনের নেশা তৈরি করে। অতিকথনের সীমাবদ্ধতাকে তখন আর পাঠকের মনোযোগকে নষ্ট করে না বরং কাহিনির প্রতি উদগ্রীব হয়ে ওঠে। এবং উপন্যাসটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে মহাকাব্যিক রূপায়ণ। যা লেখকের চিত্রপ্রতিভার প্রকাশ। এ সম্পর্কে আব হেনা মোস্তফা কামালের বর্ণানায়- কারবালা ট্রাজেডির হতভাগ্য নায়ক হোসেনের প্রতি তার সহানুভূতি অপ্রতুল না হলেও শিল্পী মশাররফ হোসেন এজিদ- চরিত্র রূপায়ণেই তার শ্রেষ্ঠ মনোযোগ অর্পণ করেছিলেন। একজন সামাজিক মানুষ হিসেবে অন্যান্য ক্ষেত্রে তিনি ব্যাথিত, বেদনাতুর আবার শিল্পী হিসেবে এজিদ চরিত্রের বিচিত্র সম্ভাবনা উপেক্ষা করতেও অপারগ। এজিদের শঠতা, হৃদয়হীনতা,পররাজ্যলোলুপতা, সবকিছুর কেন্দ্রে মশাররফ চোখে সেই সর্বগ্রাসী রূপজ মোহ যার উত্তাপ এ উপান্যাসের উপর দিয়ে দাবানলের মতো প্রবাহিত।
জয়নব চরিত্র উপন্যাসে বেশ আড়োলন সৃষ্টি করেছে। এজিদের রূপতৃষ্ণা নতুন নাটকীয়তার জন্ম দেয়। তাকে পাওয়ার তৃষ্ণায় তার প্রবল নেশা রয়েছে। সুরাপানগ্রস্ত এজিদের মনোবৃত্তির তৃষ্ণা ও মনোযন্ত্রণার ভাষা ঔপন্যাসিক ভাবনায় দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। এখানে স্পষ্টভাবে আত্মদ্বন্দ্বের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। এজিদ কী সত্যি ভালোবাসে যদিও তা প্রতিয়মান হয়নি। কারণ তার ভেতরে ছিল সীমাহীন ছলনা, কুটিলতা ও কামনার প্রাবল্য।
উদ্বার পর্বের উনত্রিংশ প্রবাহটি এজিদ মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। এজিদ সত্ত্বার মর্মবিদারী মনোভাব কাহিনিসূত্রকে নতুনমাত্রা এনে দেয়। প্রেমভাবনা মানুষের জীবনকে বিগলিত করে। যদি প্রেম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় তবে মানবিক বিকারগস্ত হয়ে ওঠে। রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি প্রেমে ব্যর্থ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আবেগের ঘনঘটা বেশ উপস্থিতি থাকায় পাঠককে মাঝে মাঝে অনুরণিত করে। হানিফার আক্রমণে মন্ত্রী মারওয়ান ও সীমারসহ অন্যদের মৃত্যুও ক্রমশ পরাজয়ের গ্লানিতে ভরপুর। এজিদের ভেতরে প্রবল ক্রোধ ও ক্ষোভ রয়েছে। যা তাকে আরও নিষ্ঠুর ও ভয়ঙ্কর করে তোলার কথা থাকলেও মানবিক করে তোলে।
কেননা তার ভেতরে ছিল বেদনার সুতীব্র চিন্তা। সীমারের মৃত্যুতে তার মাঝে অসহায়ত্বের চাপ দেখা দেয়। মৃত্যুর টানাপোড়েনের আশঙ্কাই এজিদ ভাবনায় চরম হতাশা তৈরি করে। ইতিহাসের ছায়া উপন্যাসে দারুণভাবে সম্পৃক্ত হয়েছে। বিষাদ-সিন্ধু শুধু ঔপন্যাসিক ধারণা প্রসূত হয়নি। লক্ষ্যবস্তুতে রূপান্তরিত হয়েছে। কোন কোন ইতিহাসবিদগণ ইতিহাসের ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে চরিত্রকে ঐতিহাসিকতার বদলে রহস্যময়ী করে তুলতে বদ্ধপরিকর।
বিষাদ-সিন্ধু উপন্যাসের আলোকে নারীবাদ ও জয়নবের কণ্ঠে প্রতিরোধ এবং আত্মমর্যাদার প্রকাশ স্পষ্টভাবে উল্লেখিত। তিনি মূলত সমাজ ও রাষ্ট্র ও রাজনীতি, ইতিহাস বিষয়ে একটু বেশি আনুষাঙ্গিক করলেও কল্পনা সৃষ্টিতে দারুণ ও শুভদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। তিনি মনে করেন নারী সমাজে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তাদের চিন্তা ও পরামর্শর ভার বহন করে। যা নানাভাবে প্রাসঙ্গিক হওয়া দরকার। কেননা নারীবাদ মূলত পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা-কাঠামোর ভেতর নারীর অবস্থান, অধিকার ও কণ্ঠস্বরের পুনর্মূল্যায়ননই অংশ। এসবে মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদসিন্ধু ধর্মীয়-ঐতিহাসিক আখ্যান হলেও এতে নারীর ভূমিকা কেবল শোক ও সহনশীলতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি।
বিশেষত হযরত জয়নব (রা.)-এর চরিত্রের মাধ্যমে লেখক নারীর নৈতিক নেতৃত্ব ও প্রতিবাদী চেতনাকে নতুনভাবে শক্তিশালী ও দারুণ শিল্পরূপ দিয়েছেন। পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা ও নারীর নিপীড়নে সমাজ বঞ্চিত ও নিপীড়নের স্বীকার। বিষাদসিন্ধু উপন্যাসে কারবালার প্রেক্ষাপট একটি পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা-কাঠামোর নির্মম ও দুসহ চিত্ররূপ বলা যায়। যুদ্ধ, রাজনীতি ও সিদ্ধান্ত সবকিছু পুরুষের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কোন কিছু নারীর জীবন ও গতিপথের মধ্যে অঙ্গীভূত নয়। পুরুষদের কলকব্জা নারী অনেকাংশে নিভৃতশ্রেণি হিসেবেই অনুমেয় হয়েছে। এ কাঠামোতেও সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্ষমতার শিকার হয়েছে নারী ও শিশু।
যুদ্ধ কখনই ভালো কিছু নয় তবুও যুদ্ধের হাঙ্গামায় লিপ্ত। অথচ যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে গভীর ক্ষত নারীর শরীর ও মনে এসে পড়ে স্বামী, ভাই, সন্তান হারানোর বেদনার অশ্রু। তবে মীর মোশাররফ হোসেন নারীদের কেবল ভুক্তভোগী হিসেবে দেখাননি; বরং এ নিপীড়নের ভেতর থেকেই নারীর প্রতিবাদী সত্তা ও কণ্ঠস্বরকে নিঁখুতভাবে তুলে আনেন।
নীরবতার ভাঙন থেকে নারীকে মুক্ত করার প্রয়াসে জয়নব অগ্রগণ্য চরিত্র। নারীবাদী পাঠে জয়নব হয়ে ওঠে বিষাদ-সিন্ধু উপন্যাসের কেন্দ্রীয় শক্তি। তিনি যুদ্ধের ময়দানে ততটা পারদর্শি না হলেও ভাষার ময়দানে তিনি বিজয়িনী ও সুকৌশলী। সমাজ যখন ধীরে ধীরে পুরুষদের দহনে পুড়ছে। তিনি তখন নারীদের সহায় হয়ে দাঁড়ান। পুরুষশাসিত দরবারে দাঁড়িয়ে তিনি এজিদের ক্ষমতাকে অঙ্গুলি দেখান এবং প্রশ্নবিদ্ধ করেন- শাসনব্যবস্থাকে। যা এক গভীর নারীবাদী অবস্থান হিসেবেই অনুমেয় হয়। মাতৃত্ব, শোক ও শক্তি বিষাদ-সিন্ধু উপন্যাসে নারীর শোককে দুর্বলতা হিসেবে নয়, শক্তির উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে। মাতৃত্ব এখানে কেবল আবেগের ঘনঘটা নয়, বরং নৈতিক শক্তি। সন্তানহারা মায়েদের কান্না পাঠককে নাড়িয়ে দেয়, কিন্তু সেই কান্নাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অভিযোগে রূপ নেয়। নারীবাদী দৃষ্টিতে এই শোক রাজনৈতিক। এটি রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী প্রতিবাদও বটে।
জয়নব ও নারীবাদী নেতৃত্ব জয়নবের নেতৃত্ব ক্ষমতালোভী নয়, নৈতিকতার বিষয়। তিনি কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন না; ইতিহাসের বয়ান নিয়ন্ত্রণ করেন। নারীবাদী তত্ত্বে একে বলা যায়, নৈতিক নেতৃত্ব, যেখানে শক্তি আসে সত্য ও আত্মমর্যাদা থেকে, অস্ত্র থেকে নয়। এ কারণে জয়নব এক বিকল্প নারীবাদী মডেল। যা পশ্চিমা ক্ষমতাকেন্দ্রিক নারীবাদের চেয়ে ভিন্ন ও শক্তিশালী। বিষাদসিন্ধু ও নারীবাদী চেতনার সীমা হিসেবে ধরা হয়। তবে এটিও স্বীকার্য যে, বিষাদসিন্ধু পুরোপুরি আধুনিক নারীবাদী গ্রন্থ নয়-লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি আংশিকভাবে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই রয়ে গেছে।
নারীর স্বাধীনতা এখানে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়, বরং নৈতিক ও ভাষিক। তবুও উনিশ শতকের প্রেক্ষাপটে জয়নবের এ নির্মাণ একটি অগ্রসর চিন্তা। নারীবাদী পাঠে বিষাদসিন্ধু আমাদের শেখায় নারীর শক্তি কেবল শরীরে নয়, কণ্ঠে; কেবল ক্ষমতায় নয় বরং নৈতিকতায়। জয়নবের চরিত্র প্রমাণ করে পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাসেও নারী তার নিজস্ব ভাষায় সত্যকে উচ্চারণ করতে পারে। এ অর্থে বিষাদ-সিন্ধু নারীবাদের একটি মানবিক, নৈতিক ও প্রতিবাদী পাঠ নির্মাণ করে যেখানে জয়নব চিরকালীন নারীর রূপায়ণ।
বিষাদ-সিন্ধু উপন্যাসে এজিদ চরিত্র ও মেঘনাদবধ কাব্যের রাবণ মনে হচ্ছে একইসূত্রে গাঁথা। তাহলে কী মনে হয় মীর মোশাররফ হোসেন মধুসূদন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। ঠিক তা নয়, ভাষাজ্ঞান ও দক্ষতার ক্ষেত্রে মদূসূদন অন্যতম। কিন্তু রাবণ চরিত্রের সঙ্গে এজিদ চরিত্রের অনেক মিল দেখা যায়। কেননা পুরাণ ও ইতিহাসের ধারা থেকে দুই ভিলেন চরিত্র একই ঘটনা প্রবাহের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্র এবং ক্ষমতালাভের সুতীব্র বাসনা দুটো চরিত্রকে একটু প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই সমাজ ও মানুষের মধ্যে শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে দু চরিত্রের মধ্যে বিধ্বংসী মনোভাব লক্ষ্যনীয়। ধর্মীয় ভাবাপন্ন ভিন্ন হলেও দুটি চরিত্রের মাঝে সুযোগের অনুশীলন রয়েছে। এক্ষেত্রে বুঝা যায়, তারা ক্ষমতা ও দম্ভের মোহে খুব আসক্ত। জেদ ও আপন ইচ্ছায় মত্ত হয়ে ধ্বংসলীলায় মত্ত। তারা কখনই ধর্ম সমাজকে গুরুত্ব দেয়নি মূলত নিজ মনোভাবকেই গুরুত্ব দিয়েছে।
এ সম্পর্কে আবু হেনা মোস্তফা বলেন, 'মদুসূদনের বেলায় ব্যক্তিগত সহানুভুতি ও শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গির কোন বিরোধ ঘটেনি- পক্ষান্তরে মশাররফ হোসেন শিল্পী ও ব্যক্তি চৈতন্যের টানা-পোড়েনে ক্ষত-বিক্ষত, রক্ষাক্ত। সুতরাং মেঘনাদ বধ কাব্যে রাবণ মহাধর ও শক্তিশালী চরিত্র যা কাব্যের কাহিনি ও মহাকাব্যের শিল্প-প্রাসঙ্গিকতাকে সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে যায়। এবং পাঠকের হৃদয়কে আকৃষ্ট করে। এ সূত্রের আলোকে ঘটনার পর ঘটনাসমূহ পাঠকের সম্মুখে নতুনভাবে ভিড় জমায়' বিষাদ-সিন্ধু উপন্যাসে এজিদ চরিত্র না থাকলে ঔপন্যাসিক শিল্প-কাঠামো আরও দুর্বল মনে হতো। ফলে এজিদ চরিত্র একদিকে কাহিনির চাহিদা পূরণ করেছে অন্যদিকে উজ্জ্বল ও পৌরষিত চরিত্র হিসেবে ধরা দেয়। কেননা উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্রসমূহ ছিল অনুজ্বল ও এককেন্দ্রিক মনোভাবে ঠাসা। উপন্যাসকে দ্বন্দ্বমুখর করে তোলার ক্ষেত্রে ভিলেন চরিত্রও যে যথাযথ প্রাসঙ্গিক এজিদ চরিত্রের মাধ্যমে তা অনুমেয় হয়।
বিষাদ-সিন্ধু উপন্যাস সাহিত্যে কীরূপ প্রভাব বিস্তার করেছে এবং প্রাসঙ্গিকতায় পূর্ণ তা সমকালীন প্রেক্ষাপটেও স্বীকৃত হয়ছে নানাভাবে। সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মনে হয় লেখকের আত্মনিষ্ঠ মানসিকতা রয়েছে। একবারও মনে হয়নি লেখাটি বিদেশী কোন ঘটনা ও বা আচার সাদৃশ্যপূর্ণ। শব্দ ও ঘটনা রেশ, বয়ান ও শিল্পচেতনা বঙ্গ-মিষ্টভাব রক্ষায় বদ্ধপরিকর। নীতি-নৈতিকতা ও রাগ-অনুরাগ, অর্ন্তযাতনা ও বেদনার কথামালা মার্জিত ঢঙে সম্পূর্ণ আলাদা গৌরব এনে দিয়েছে।
এ করণে অনেকেই বাংলা মধ্যযুগীয় উপখ্যান ও সাহিত্যের ধারা রসসমৃদ্ধ কাহিনি হিসেবে তুলনা করেছেন। এ সম্পর্কে কাজী আব্দুর ওদুদ এর আলোচনা প্রাসঙ্গিক- 'অনেকের ধারণা, মীর মোশাররফ হোসেনের বিষাদ-সিন্ধু জঙ্গনামা ও এ জাতীয় অন্যান্য পুঁথির সাধুভাষায় রূপান্তর মাত্র। লেখক নিজে বলেছেন: পারস্য ও আরব্য গ্রন্থ হইতে ,মূল ঘটনা সারাংশ লইয়া বিষাদ-সিন্ধু বিরচিত হইল। তা উপকরণ যেখান থেকেই সংগ্রহ করুনম এ বইখানিতে তার যে কৃতিত্ব প্রকাশ পেয়েছে তা অনন্যসাধারণ' শ্বাশত বঙ্গ পৃ-২৯। একথা স্বীকৃত যে, আধা সামন্ত ও সামাজিক ও পারিবারিক পরিবেশ লালিত ছিলেন তিনি। অন্নদামঙ্গল বৈষ্ণব পদাবলী ও দোভাষী পুঁথির সঙ্গে তার কৈশরিক পরিচিতি বিদ্যমান। অন্যদিকে বিদ্যাসাগর বঙ্কিম ও মধুসূদনের প্রতি তার ব্যক্তিগত আগ্রহ ছিল। সময় ও সাহিত্যের যোগসাজেসে তিনি একনিষ্ট শিল্পী হিসেবে সমাধৃত হয়েছেন।
পাঠকের আগ্রহ ও জনপ্রিয়তা অর্জনের মৌলিক উপন্যাস বিষাদ-সিন্ধু। কেননা লেখায় ও কাহিনি আনয়নে ভিন্নধর্মীতা লক্ষ্যণীয়। হাসান ও হোসেনের প্রতিপক্ষ এজিদের রাজনৈতিক বিরোধ মহররম পর্বের চুড়ান্ত সাক্ষ্য দেয়। ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে তুলনা করলে অনুমেয় হয় যে, বিষাদ-সিন্ধু বাংলা ভাষায় রচিত স্বদেশীয় ধাঁচের সৃষ্টি। উপন্যাসের পাঠে মনে হবে একটি ইতিহাস গ্রন্থ কিন্তু ঘটনা পরস্পরা দেখে পরিষ্কার হওয়া যায়, মূলত এটি একটি উপন্যাসই। যদিও কাঠামোগত বিষয়-বৈভব ব্যবহারে লেখকের দৃষ্টি ক্ষীণ ও অসম্পূর্ণ।
তিনি বিষাদ-সিন্ধুর মাধ্যমে সাহিত্যবুননের পাশাপাশি মুসলমান সন্তান ও অন্যদের মাঝেও তা অনুধাবনের সুযোগ করে দিয়েছেন। এতকাল আমরা যা কিছু লোকমুখে শুনেছি তা হৃদয়ে ততটা ঝংকৃত করতে পারেনি। সাহিত্যরসের মাধ্যমে মানুষের মনে সাড়া জাগাতে তার সৃষ্টিশৈলী চিন্তা দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে। ঔপন্যাসিক হিসেবে দুর্বলতা থাকলেও এখানে তিনি অত্যন্ত সফল লেখক। বিষাদ-সিন্ধু পড়ে মনে হয় তিনি দুটো ধারা ও মতৈক্যের বিষয়কে জনসমাজে স্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছেন। মহানবী (স.) এর দোহিত্র ইমাম হাসান ও হোসেনের ধর্মবিশ্বাস, মহত্ব, উদারতা অন্যদিকে এজিদের ক্রু প্রকুতি নিষ্ঠুরতা, বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা পরায়ণতা দ্বিপাক্ষিক যড়যন্ত্র, দাঙ্গা-হাঙামা এবং ক্ষমতা গ্রহণের পালাবদলের ঘটনা অন্তঃকরণে দারূণভাবে ক্ষতবিক্ষত করে।