প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬
উনবিংশ শতকের শেষভাগে এবং বিংশ শতকের শুরুতে আইরিশ সাহিত্য অঙ্গনে একটি পুনর্জাগরণ ঘটেছিল যা ছিল ইংরেজি সাহিত্যের আগ্রাসন থেকে আইরিশ সাহিত্যকে টিকিয়ে রাখার একটা আন্দোলন। একে 'কেলটিক রিভাইভাল'ও বলা হয়। এ আন্দোলনের মাধ্যমে আইরিশ লোক-গাঁথা, পৌরাণিক কাহিনি, ও আইরিশ ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। ঠিক একই সময়ে বাংলা সাহিত্যে যখন ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল এবং শহরের সাহিত্য যখন বাংলা সাহিত্যের অনেকটা জায়গা দখল করে নিয়েছিল, সেই সময় আধুনিকতাকে পাশ কাটিয়ে গ্রাম বাংলার জীবন, প্রেম ও বিরহকে নানা আখ্যানের মাধ্যমে এঁকেছেন পল্লীকবি জসীম উদদীন।
'নকশী কাঁথার মাঠ' কবির তেমনই এক আখ্যানকাব্য যা প্রেম ও বিরহের গল্পের পাশাপাশি গ্রামীণ জীবনধারা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের পরিচয় বহন করে, যা সাহিত্যকর্মটিকে নিঃসন্দেহে বাঙালির গ্রামীণ আত্মপরিচয়ের ধারক হিসেবে উপস্থাপন করে। আরেকভাবে বলা যায়, বিংশ শতকে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার যে স্রোত বইছিল, এটি সেই স্রোতের বিরুদ্ধে বাঁধ দিয়ে নিজস্ব সম্পদ রক্ষার একটা চেষ্টা যেন। তাই বাঙালির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে এই বইটি পুনঃ পুনঃ পাঠের প্রয়োজনীয়তা অসীম।
আখ্যানের শুরুতেই দুটি গ্রামের বর্ণনা পাওয়া যায় যা ধু ধু মাঠ দ্বারা বিভক্ত। আর আছে জলীর বিল যেখানে দুই গ্রাম থেকে আসা দু'টি পথের মিলন ঘটেছে। গ্রাম বাংলার মানুষের জীবনে সংঘাত বা বিবাদ রয়েছে। তারপরও তারা মিলেমিশে পাশাপাশি অবস্থান করছে— এই চিত্র যেন তারই বর্ণনা।
'এ গাঁর লোকে দল বাঁধিয়া ও গাঁর লোকের সনে,
কাইজ্জা ফ্যাসাদ করেছে যা জানেই জনে জনে।
এ গাঁর লোকও করতে পরশ্রম ও গাঁর লোকের বল,
অনেক বারই লাল করেছে জলীর বিলের জল।
তবুও ভাল, এ গাঁও ও গাঁও, আর যে সবুজ মাঠ
মাঝখানে তার ধুলায় দোলে দুখান দীর্ঘল বাঁট,
দুই পাশে তার ধান কাউনের অথই রঙের মেলা,
এ গাঁর হাওয়ায় দোলে দেখি, ও গাঁয় যাওয়ার ভেলা।'
আমেরিকান আধুনিক কবি রবার্ট ফ্রস্ট-এর Good fences make good neighbors ধারণাটি এখানে অনুপস্থিত। ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের চেয়ে সমষ্টিগত জীবনে অভ্যস্ত গাঁয়ের মানুষ প্রতিবেশীর মাঝে কোনো দেয়ালের অস্তিত্ব অন্তত না। শুধু যে দু'টি গ্রামের মানুষ পাশাপাশি মিলেমিশে অবস্থান করছে তাই-ই নয়, আখ্যানের তৃতীয় অধ্যায়ে সাজুর বর্ণনায় যেসব উপমা দেওয়া হয় তাতে গ্রামীণ জীবনে হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির মিশ্রিত রূপটি দেখতে পাওয়া যায়।
'তুলসী-তলায় প্রদীপ যেন জ্বলছে সাঁঝের বেলা।
তুলসী-ফুলের মঞ্জুরি কি দেব দেউলের ধূপ!
জ্বলছে সোনার পঞ্চ প্রদীপ কার বা পূজা বয়ে।
মোর কথা যদি মনে পড়ে তবে পবির সিদ্ধুরখানি।'
আবার অনাবৃষ্টির কারণে দরগায় সিন্নি দেওয়া বা 'নাইলা গানের ঝঙ্কার'—ইত্যাদি বিষয়গুলো কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের পরিচয় বহন করে না। বৈশাখ বা চৈত্রের খরায় যখন মাঠ ঘাট ও জলাশয় শুকিয়ে যায় তখন কৃষকেরা বৃষ্টির প্রার্থনায় এই গান গায়। অপরদিকে গ্রামের নারী ও শিশুরা বউলা বিয়ের গান নামে একটি গান গাইত যা মেঘনারীর গান নামেও পরিচিত। বৃষ্টির প্রার্থনায় কুলা অথবা বদনা হাতে গ্রামের নারী ও শিশুরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল, ডাল ইত্যাদি সংগ্রহ করে আর গান গায়।
'বারো মেঘের নামে নামে এমনি ডাকি ডাকি,
বাড়ি বাড়ি চলল তারা মাঙন হাঁকি হাঁকি।
কেউবা দিল এক পোয়া চাল, কেউবা ছটাকখানি,
কেউ দিল নুন, কেউ দিল ডাল, কেউবা দিল আনি।'
চেক ভাষার লেখক দুশান জভাভিতেল বলেন, জসীম উদদীন গ্রাম্য গান নকল করেন তা মনে করলে একেবারে ভুল হবে। লোকসাহিত্যের উপমা নিজের কবিত্ব শক্তি দিয়ে বদলিয়ে তিনি তাদের নতুন মানে সৃষ্টি করেন। উল্লেখ্য যে আখ্যানটি লেখার আগে কবি ময়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহের জন্য কিছুদিন উক্ত অঞ্চলে অবস্থান করেছিলেন। এ গীতিকার একটা প্রভাব দেখা যায় এই কাব্যে লেখা গানগুলোর মধ্যে। এ গানগুলো আধুনিকতা বর্জিত গ্রামীণ বাংলা সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে যা কোনো ধর্মীয় বেড়াজালে আবদ্ধ নয়। লোকগানগুলি বাংলার মানুষের কাব্য ও সুরের প্রতি অসীম ভালোবাসা ও ভাবনার প্রকাশ করে। আবার আইরিশ আন্দোলনের কবি ইয়েটস যেমন তাঁর কবিতায় কেলটিক আধ্যাত্মিকতাকে তুলে ধরে সাহিত্যে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে চেয়েছেন, নকশী কাঁথার মাঠ-এর কবিও যেন একই চেষ্টা করে গেছেন।
আখ্যানটির দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অধ্যায়ে রূপাই এবং সাজুর যে বর্ণনা কবি দিয়েছেন তাতে রূপাইয়ের পাশাপাশি সাজুকে কোথাও কম করে দেখান নাই। রূপাই যেমন লাঠিখেলা এবং জারিগানে পারদর্শী সাজুও তেমনি নানাবানা এবং পিঠা বানানোতে দক্ষ। এ দক্ষতায় নারী-পুরুষ কেন্দ্রিক কোনো রকম সংঘর্ষ অনুপস্থিত।
রূপাই এর বর্ণনা :
'আখড়াতে তার বাঁশের লাঠি অনেক মানে মানি,
খেলার দলে তারে নিয়েই সবার টানাটানি।
জারীর গানে তাহার গলা উঠে সবার আগে,
'শাল-সুন্দ্রী-বেত' যেন ও সকল কাজেই লাগে।'
রূপাই এর বর্ণনার মধ্যে বাংলার পুরুষের সাহসী ও দামাল রূপটি দেখা যায়। ফর্সা, গৌরবের স্মৃতি না, বরং কালো বরনের জয়গান করা হয়েছে এখানে। নিজ মাটিকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষায় যে বীরত্বের কথা বর্ণিত হয়েছে তা বাংলার তরুণদের বীরত্বের প্রতীক বলা যায়।
সোনা নহে, পিতল নহে, নহে সোনার মুখ,
কালো-বরণ চাষির ছেলে জুড়ায় যেন বুক।
সাজুর বর্ণনা :
'তাহার মতন চেকন 'সেওই' কে কাটিতে পারে,
নকশী করা 'পাকান পিঠায়' সবাই তারে হারে।
হাঁড়ির উপর চিত্র করা শিখেয়ে তোলা ফুল,
এই গাঁয়েতে তাহার মত নাইক সমতুল।'
গ্রামীণ পরিবেশে পুরুষের পাশাপাশি নারীর মর্যাদা যে সমান এ বিষয়টিই এ বর্ণনায় উঠে আসে। সাজুর বাইরের রূপের পাশাপাশি তার স্বাধীন সত্তাকেও কবি এঁকেছেন নান্দনিকভাবে :
'পড়শিনা কয়, 'মেয়ে তো নয়, হলদি পাখীর ছা,
ডানা পেলেই পালিয়ে যেত, ছেড়ে তাদের গাঁ।'
গ্রামে যখন খরা চলছিল, তখন গ্রামের মেয়েরা বউনা বিয়ের গান করতে করতে মাঙন হেঁকে হেঁকে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছিল। গাঁয়ের ভালো মন্দে মেয়েরাও যে শামিল হতো— বিষয়টি এই বর্ণনায় উঠে এসেছে। অপরদিকে, রূপাই ও সাজুর মাঝে যে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে এতে গ্রামের লোকেরা বাধা হয়ে দাঁড়ায় না এবং বিয়ের পর সাজুকে তার স্বামী এবং শ্বশুরের কাছে কোন বঞ্চনার শিকার হতে দেখা যায় না। রূপাই এবং সাজুর দাম্পত্য জীবনে পরস্পরের প্রতি যে শ্রদ্ধা— এটাই গ্রাম বাংলার শাশ্বত চিত্র। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে পুরুষশাসিত সমাজের যে চিত্র পাওয়া যায় তা এখানে অনুপস্থিত। সাজুর উদ্দেশ্যে বলা রূপাই এর কথায় তার প্রমাণ মেলে,
'আহা আহা সখি, তুমি যাহা কর, মোর মনে লয় তাই,
তোমার ফুলের পরাণে কেবল দিয়ে যায় বেদনাই।'
আখ্যানের নামকরণে যে নকশী কাঁথার উল্লেখ আছে তা মূলত বাংলাদেশের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য। গ্রামের নারীদের সৃজনশীলতা আর আবেগ অনুভূতির প্রতীক। নকশী কাঁথা সেলাইয়ের মধ্য দিয়ে গ্রাম বাংলার নারীরা অতি যত্নের সাথে নিজ নিজ সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের অবসর সময় কাটান। বর্তমানে এ নকশীকাঁথা বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রূপাইয়ের প্রতীক্ষায় বিরহিণী সাজু নকশী কাঁথা সেলাইয়ের মধ্যে তাঁর দুঃখের গল্প গাঁথা গেঁথে যায়। তাঁর মৃত্যুর পর যেন এই নকশীকাঁথায় তাঁর কবরটা ঢেকে দেওয়া হয় সেই আকুতি জানান তাঁর মায়ের কাছে।
শিক্ষাবিদ ও গবেষক দীনেশচন্দ্র সেন বলেন, ইংরেজি সাহিত্যে ইংরেজি সমাজ আমাদের বাংলা সাহিত্য ও বাংলা সমাজের গায়ে যে দাগ দিয়া যাইতেছে, তাহা বড় স্পষ্ট এবং সময়ে কলঙ্কস্বরূপ। তিনি আরও বলেন, নকশী-কাঁথার মাঠ-এর কবি দেশের পুরাতন রূপভাণ্ডারকে নতুনভাবে উজ্জ্বল করিয়াছেন, সঙ্গে সঙ্গে অনাগত রাজ্যের বার্তা বহিয়া আনিয়াছেন। এ বার্তা কবি আধুনিক তত্ত্বকে পাশ কাটিয়ে নিজস্বতার ফ্রেমে বেঁধেছেন যা কালের বাঁধাকে অতিক্রম করে নিজ পরিচয়কে এগিয়ে নিয়ে আগামী পাঠকের কাছে।
কবি জসীম উদদীনের এ সৃষ্টি আইরিশ সাহিত্য আন্দোলনের মতো কোন সাহিত্য আন্দোলনের অংশ হতে পারে নাই ঠিক, তবে তাঁর সমসাময়িক সাহিত্যিকরা যদি এই ধারার সাহিত্য রচনা করতেন তাহলে নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যে একটা সাহিত্য আন্দোলন গড়ে উঠতে পারতো, নকশী-কাঁথার মাঠ যার প্রতিনিধিত্ব করতো।