ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ২৯ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বিশ্বের আলোচিত মুসলিম নারী

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম উচ্চারণ করেছিলেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ সময় পেরিয়েছে। যুগ বদলেছে। তবু কবির এ কথার সত্যতা আজও দিগন্তজোড়া। দেশে দেশে আলোচিত হন নারী। তার কর্ম তাকে নিয়ে যায় সীমান্ত ছাড়িয়ে। পৌঁছে দেয় দূর জনপদে। তাদের কাজ, গুণাবলি ও অবদান ধীরে ধীরে রূপ নেয় ইতিহাসে। নতুন প্রজন্ম সেই কীর্তি পড়ে। ভাবনার আলোয় দেখে ভবিষ্যৎ। অজান্তেই তারা হয়ে ওঠেন সময়ের দলিল। একটি জীবনের গল্প হয়ে যায় জাতির স্মৃতি। এমন কীর্তিমান নারীদের নিয়ে আজকের আয়োজন। লিখেছেন- হাবীবুল্লাহ সিরাজ
বিশ্বের আলোচিত মুসলিম নারী

বেগম খালেদা জিয়া (বাংলাদেশ) : বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও প্রভাবশালী নাম বেগম খালেদা জিয়া। তিনি শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি একটি সুন্দর রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধি। বন্ধু ও শত্রুর সঙ্গে রাজনীতি করার চমৎকার উদাহরণ বেগম খালেদা জিয়া। বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম ১৫ আগস্ট ১৯৪৫ সালে দিনাজপুরে। তার শৈশব কেটেছে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে। রাজনীতির সঙ্গে তার প্রাথমিক জীবনের কোনো সরাসরি যোগ ছিল না। তার শিক্ষাজীবন ছিল তুলনামূলকভাবে সাধারণ। পরবর্তী জীবনে রাজনীতিই তার প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে। তার রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ ঘটে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মাধ্যমে। স্বামী শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে শাহাদতবরণ করেন। এরপর তিনি রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। এর ফলেই সামরিক শাসনের পতন ঘটে। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়। ১৯৯১ সালে তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। এ সময়ে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনর্বহাল হয়। রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসে দেশ। তবে তার প্রথম মেয়াদ ছিল সংঘাতপূর্ণ। বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চলে। নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তার সরকার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। ২০০১ সালে তিনি দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। এ সময়ে অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়। অবকাঠামো খাতে কাজ হয়। তবে জঙ্গিবাদ ও রাজনৈতিক সহিংসতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। এ সময়েই তার সরকার আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে। মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মূলত এগুলো ছিল তার সরকারকে দুর্বল করার হীন ষড়যন্ত্র। আওয়ামী লীগপন্থী দল ও ভারতীয়দের কূট-কৌশলই ছিল এসবের মূলে। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা রাজনীতিকে আরও মেরুকৃত করে তোলে। এটাও ছিল আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত সাজানো নাটক। ২০০৬ সালের পর থেকে তিনি ক্ষমতার বাইরে। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় তিনি গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতি অভিযোগ এনে মামলা করে আওয়ামী লীগ সরকার। তিনি দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকেন। এ কারাবাস আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনার জন্ম দেয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে। পশ্চিমা কূটনীতিক মহলেও তার অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়। দীর্ঘ কারাবাসের সময় উন্নত চিকিৎসার অভাবে তার স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। বিশ্লেষকদের ধারণা, তার সেই অচিকিৎসাই তাকে মরণের দিকে দ্রুত ঠেলে দেয়। বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন প্রায় ১০ বছর। কিন্তু তার রাজনৈতিক প্রভাব আরও দীর্ঘ। তিনি দুই দশকের বেশি সময় বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়া শুধু ক্ষমতার রাজনীতির চরিত্র নন; তিনি বিরোধী রাজনীতিরও প্রতীক। তিনি দেখিয়েছেন, ক্ষমতা ও ক্ষমতার বাইরে থেকেও প্রিয় হওয়ার রাজনীতি কীভাবে করতে হয়, তিনি দেখিয়েছেন সংকট ও বিপদের মুহূর্তেও কীভাবে শক্ত প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে থেকে অধিকার আদায় করা যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া নারী নেতৃত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।

তানসু চিল্লার (তুরস্ক) : তুরস্কের রাজনীতিতে একটি ধ্রুবতারার নাম হলো তানসু চিল্লার। তিনি দেশটির প্রথম মুসলিম নারী প্রধানমন্ত্রী। পুরুষশাসিত তুর্কি রাজনীতিতে তার উত্থান ছিল বিস্ময়ের। নব্বইয়ের দশকে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছান। একই সঙ্গে তিনি তীব্র বিতর্কের মুখেও পড়েন। তানসু চিল্লারের জন্ম ২৪ মে ১৯৪৬ সালে। জন্মস্থান ছিল ইস্তাম্বুল, তুরস্ক। তিনি উচ্চ শিক্ষিত পরিবারে বড় হন। অর্থনীতিতে আগ্রহ ছিল শৈশব থেকেই। পড়াশোনাও করেন অর্থনীতি নিয়ে। শিক্ষাজীবনের অনেকটা সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছেন। তিনি রবার্ট কলেজ থেকে স্নাতক হন। পরে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার শিক্ষাজীবন তুরস্কের রাজনীতিতে বিরল ছিল। পেশাগত জীবনে তিনি একজন অর্থনীতিবিদ ছিলেন। তিনি দীর্ঘ সময় ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। পরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি ট্রু পাথ পার্টি (DYP)-তে যোগ দেন। চমৎকার মেধা ও আলোকিত বুদ্ধির দীপ্তিতে দ্রুতই দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৯৩ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। তার শাসনকাল ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভরপুর। কুর্দি সমস্যা তখন তীব্র ছিল। দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কে সামরিক অভিযান জোরদার হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। যদিও এগুলো ছিল বিরোধী পক্ষ থেকে। চিল্লার আন্তর্জাতিকভাবেও সমালোচিত হন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে। দেশে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। কিছু ব্যাংক কেলেংকারিতে তার নাম জড়ায়। তিনি সংসদীয় তদন্তের মুখোমুখি হন। তবে তিনি শুধু বিতর্কের প্রতীক ছিলেন না। তিনি অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা বলেন। তিনি পশ্চিমমুখী পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে ছিলেন। ন্যাটো ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে ভূমিকা রাখেন। তিনি তুরস্কে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথ খুলে দেন। নারীদের ক্ষমতায় জোর দেন। ক্ষমতা হারানোর পরও তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তবে তার প্রভাব ধীরে ধীরে কমে যায়। তবুও তার তুরস্কের রাজনীতিতে ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। তানসু চিল্লারের জীবন তুরস্কের নারী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আমিনা মোহাম্মদ (নাইজেরিয়া) : নাইজেরিয়া অর্থনৈতিক দুর্বল দেশ বলেই আমরা জানি; কিন্তু সেখানেও জন্মে আলোকিত ও আলোচিত সমাজকর্মী। তেমনই একজন আমিনা মোহাম্মদ। যিনি আধুনিক বৈশ্বিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি নাইজেরিয়ার প্রতিনিধি হিসেবেই নয়, জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বেও আলোচিত। উন্নয়ন, পরিবেশ ও নারীর অধিকার- এ তিন ক্ষেত্রেই তার প্রভাব স্পষ্ট। আমিনা মোহাম্মদ জন্মগ্রহণ করেন ২৭ জুন ১৯৬১ সালে নাইজেরিয়ার গোম্বে। তিনি একটি যুগসচেতন মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব কাটে বিভিন্ন দেশে। তার পরিবার কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক চিন্তার সঙ্গে চকলেট খাওয়ার বয়স থেকেই পরিচিত হন। তিনি উচ্চশিক্ষা লাভ করেন যুক্তরাজ্যে। বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি উন্নয়ন ও প্রশাসন বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। তার শিক্ষা তাকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন নীতিতে দক্ষ করে তোলে। পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি বেসরকারি উন্নয়ন খাতে কাজ করেন। পরে তিনি জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি পরিবেশ ও দারিদ্র্য নিরসন নিয়ে কাজ করেন। তার কাজ আফ্রিকা ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পরিচিতি পায়। নাইজেরিয়ার রাজনীতিতে তার উত্থান ঘটে দ্রুতই। তিনি ২০১৫ সালে নাইজেরিয়ার পরিবেশমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এ পদে তিনি ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষা ছিল তার মূল কাজ। তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন। ২০১৭ সালে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বড় দায়িত্ব পান। তিনি জাতিসংঘের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল নিযুক্ত হন। এ পদে তিনি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের তদারকি করেন। তিনি আজও এ দায়িত্বে রয়েছেন। তার কাজ সবসময় প্রশংসিত হয়নি। কিছু দেশে তিনি পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলের প্রতিনিধি হিসেবে সমালোচিত হন। জলবায়ু নীতিতে কঠোর অবস্থানের কারণে শিল্পগোষ্ঠীর বিরোধিতার মুখে পড়েন। তবুও তিনি নিজের অবস্থানে অটল থাকেন। তিনি কখনও সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন না। তবে তার প্রভাব রাষ্ট্রের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তিনি দেখিয়েছেন, নারীরা শুধু জাতীয় রাজনীতিতে নয়, বৈশ্বিক সিদ্ধান্তের টেবিলেও নেতৃত্ব দিতে পারেন। আমিনা মোহাম্মদ আজ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও কূটনীতিতে মুসলিম নারীদের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

তাওয়াক্কোল কারমান (ইয়েমেন) : একজন মুসলিম সমাজকর্মী কীভাবে পশ্চিমাদের কাছে সমাদৃত হয়, তাওয়াক্কোল কারমান তার প্রমাণ। তাওয়াক্কোল কারমান আধুনিক আরব বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত নারী নেত্রীদের একজন। তিনি একজন সাংবাদিক ও সমাজকর্মী। আবার একজন রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখ। ইয়েমেনের রুদ্ধ রাজনীতিতে তার উপস্থিতি ছিল চ্যালেঞ্জিং। তিনি তার লাইফস্টাইলে পশ্চিমা কালচারের প্রতিনিধিত্ব করতেন। ফলে তিনি পশ্চিমাদের প্রিয়পাত্রে পরিণত হন। তাওয়াক্কোল কারমানের জন্ম ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ সালে। তিনি একটি শিক্ষিত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। শৈশব থেকেই তিনি রাজনীতি ও সমাজের বাস্তবতা দেখেছেন। তিনি ইয়েমেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে রাজনীতি বিষয়েও উচ্চতর শিক্ষা নেন। শিক্ষাজীবনেই তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি সাংবাদিকতাকেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন। ২০০৫ সালে তিনি ‘Women Journalists Without Chains’ নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এ সংগঠন সাংবাদিকদের স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করত। সরকার তখন কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করেছিল। কারমান প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেন। এতে তিনি দ্রুত আলোচিত হয়ে ওঠেন। ২০১১ সালে ইয়েমেনে আরব বসন্ত শুরু হয়। তাওয়াক্কোল কারমান রাজপথে নামেন। তিনি নিয়মিত বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন। তাকে বলা হতো ‘ইয়েমেনি বিপ্লবের মা’। তিনি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। সহিংসতা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। এ আন্দোলনের কারণে রাষ্ট্রের কড়া রোষানলে পড়েন। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তাকে মুক্তি দিতে হয়। এরপর তার জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে। ২০১১ সালেই তিনি বিশ্বস্বীকৃতি পান। তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ছিলেন প্রথম আরব নোবেল বিজয়ী নারী এবং ইয়েমেনের প্রথম নোবেল বিজয়ী। এ পুরস্কার তাকে বৈশ্বিক নেতৃত্বে তুলে আনে। পরবর্তীতে ইয়েমেন গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। কারমান হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি হস্তক্ষেপ- দুয়েরই সমালোচনা করেন। এতে তিনি বিভিন্ন পক্ষের বিরাগভাজন হন। এমনকি তার নাগরিকত্ব নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। তার কণ্ঠ আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তিনি নারী, মতপ্রকাশ ও গণতন্ত্রের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাওয়াক্কোল কারমান প্রমাণ করেছেন, নারী শুধু পরিবর্তনের সাক্ষী নন; তারা পরিবর্তনের চালিকাশক্তিও হতে পারেন।

মেগাওয়াতি সুকর্ণপুত্রী (ইন্দোনেশিয়া) : মেগাওয়াতি সুকর্ণপুত্রী একজন মুসলিম প্রধানমন্ত্রী। তিনি ইন্দোনেশিয়ার রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক নাম। তিনি শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না; ছিলেন রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে নারী নেতৃত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তিনি। তিনি ইন্দোনেশিয়ার ইয়োগ্যাকার্তায় ২৩ জানুয়ারি ১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইন্দোনেশিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি সুকর্ণোর কন্যা। তার শৈশব কেটেছে ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছেই। তবে সেই ক্ষমতা ছিল অস্থির ও বিপজ্জনক। তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন ইন্দোনেশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃষিবিদ্যা ও মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেননি। তবুও তার রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল গভীর। পেশাগতভাবে তিনি শুরুতে রাজনীতিবিদ ছিলেন না; বরং গৃহিণী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তার বাবার পতনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। সামরিক শাসক সুহার্তোর আমলে সুকর্ণো পরিবার ছিল প্রান্তিক। এ অবহেলা থেকেই তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু। ১৯৯০-এর দশকে তিনি ইন্দোনেশিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (চউও)-তে যুক্ত হন। দ্রুতই তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তার নামের সঙ্গে সুকর্ণোর স্মৃতি জড়িত ছিল। এটি জনগণের আবেগ জাগিয়ে তোলে। এতে শাসকগোষ্ঠী অস্বস্তিতে পড়ে। ১৯৯৬ সালে তার দলের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়। দল ভেঙে দেওয়া হয়। এ দমনই তাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯৯৮ সালে সুহার্তোর পতনের পর তার রাজনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হয়। ১৯৯৯ সালের নির্বাচনের পর তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। পরে ২৩ জুলাই ২০০১ সালে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। তিনি ছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। ক্ষমতায় ছিলেন ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত। তার শাসনকাল ছিল কঠিন। অর্থনীতি দুর্বল ছিল। পূর্ব তিমুর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আচেহ ও পাপুয়ায় বিদ্রোহ চলছিল। সন্ত্রাসবাদও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বালি বোমা হামলা তার সময়েই ঘটে। তার নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনা হয়। তাকে নীরব ও ধীর সিদ্ধান্তপ্রবণ বলা হয়। অর্থনৈতিক সংস্কারে গতি কম ছিল। তবে তিনি গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। সামরিক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করেন। ক্ষমতা হারানোর পরও তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। তিনি এখনও চউও দলের নেত্রী। ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান রাজনীতিতে তার প্রভাব রয়ে গেছে। মেগাওয়াতি সুকর্ণপুত্রী প্রমাণ করেছেন, মুসলিম সমাজে নারী নেতৃত্ব শুধু প্রতীকী নয়; এটি বাস্তব ও ক্রিয়াশালী হতে পারে।

লেইলা আবুলেলা (সুদান) : লেইলা আবুলেলা সমকালীন মুসলিম সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি কোনো রাষ্ট্রনেত্রী নন; তিনি ক্ষমতার রাজনীতিতে ছিলেন না। তবুও তার প্রভাব গভীর। তিনি ভাষা, বিশ্বাস ও অভিবাসনের ভেতর দিয়ে মুসলিম নারীর অভিজ্ঞতাকে বিশ্বসাহিত্যে দৃশ্যমান করেছেন। লেইলা আবুলেলার জন্ম ১৩ আগস্ট ১৯৬৪ সালে। জন্মস্থান কায়রো, মিসর। তার পরিবার ছিল সুদানের। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে খার্তুম, সুদানে। এ বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ তার চিন্তাজগৎ গড়ে দেয়। তিনি উচ্চশিক্ষা লাভ করেন খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি পরিসংখ্যানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি উচ্চতর শিক্ষার জন্য স্কটল্যান্ডে যান। তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি গ্রহণ করেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল বিজ্ঞানভিত্তিক। কিন্তু তার মন ঝুঁকেছিল সাহিত্যের দিকে। পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি একজন পরিসংখ্যানবিদ ছিলেন। তবে অভিবাসনের অভিজ্ঞতা তাকে লেখালেখির দিকে টেনে আনে। তিনি ব্রিটেনে একজন মুসলিম নারী হিসেবে নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। সেই ভাবনা থেকেই তার সাহিত্যযাত্রা। তার প্রথম উপন্যাস ‘The Translator’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে। এ উপন্যাসে একজন মুসলিম নারীর প্রেম, বিশ্বাস ও সংস্কৃতিগত দ্বন্দ্ব তুলে ধরা হয়। পশ্চিমা সাহিত্যে এটি ছিল ব্যতিক্রমী। কারণ, এখানে ইসলামকে সমস্যা হিসেবে নয়, পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখানো হয়। এরপর তিনি একের পর এক উপন্যাস লেখেন। ‘Minaret’, ‘Lyrics Alley’, ‘The Kindness of Enemies’ তার উল্লেখযোগ্য কাজ। তার লেখায় রাজনীতি সরাসরি আসেনি। কিন্তু ইতিহাস, উপনিবেশ, ধর্ম ও নারীর অবস্থান নীরবে প্রবাহিত হয়। তিনি আলোচিত হন একটি বিশেষ কারণে। তিনি ইসলাম ও ধার্মিকতাকে সাহিত্যের কেন্দ্রে আনেন। অনেক পশ্চিমা সমালোচক এটিকে অস্বস্তিকর মনে করেন। তাকে কখনও ‘ধর্মপ্রচারমূলক’ লেখক বলা হয়। আবার মুসলিম সমাজের ভেতর থেকেও প্রশ্ন ওঠে। তবুও তিনি নিজের অবস্থানে স্থির থাকেন। তিনি কখনও রাষ্ট্রের সরাসরি রোষানলে পড়েননি। তবে সাহিত্যিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। রাজনীতি তাকে ঘিরেছিল। তিনি নারী, মুসলিম, অভিবাসী- এ তিন পরিচয়ই তাকে আলোচনায় রেখেছে। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন না; তবে তার প্রভাব সাংস্কৃতিক। তিনি পাঠকের চিন্তাজগতে প্রবেশ করেছেন। দেখিয়েছেন, মুসলিম নারীর জীবন শুধু নিপীড়নের গল্প নয়; এটি আধ্যাত্মিকতা, প্রেম ও নৈতিক অনুসন্ধানের গল্পও। লেইলা আবুলেলা আজ সুদান ও ব্রিটেন দুই দেশের সাহিত্যিক পরিচয়ের সেতু। তিনি প্রমাণ করেছেন, মুসলিম নারী লেখক বিশ্বসাহিত্যে নিজের ভাষা নিজেই তৈরি করতে পারেন।

বেনজির ভুট্টো (পাকিস্তান) : ভুট্টো পরিবারের সঙ্গে আমাদের বাংলাদেশের মানুষের পরিচয় ও জানাশোনা বহুদিনের। বেনজির ভুট্টো মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে একটি উজ্জ্বল নাম। তিনি ছিলেন প্রথম মুসলিম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি একই সঙ্গে ছিলেন ক্ষমতার প্রতীক ও সংঘাতের কেন্দ্র। তার জীবন রাজনীতি, সাহস ও ট্র্যাজেডিতে ভরা। বেনজির ভুট্টোর জন্ম ২১ জুন ১৯৫৩ সালে করাচিতে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারে। তার বাবা ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট। রাজনীতি ছিল তার পারিবারিক উত্তরাধিকার। তিনি পড়াশোনা করেন বিদেশে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি অধ্যয়ন করেন। তার শিক্ষা ছিল অভিজাত ও আন্তর্জাতিক মানের। পেশাগতভাবে তিনি শুরু থেকেই রাজনীতিবিদ ছিলেন। ১৯৭৭ সালে তার বাবার সরকার উৎখাত হয়। সামরিক শাসক জিয়াউল হক ক্ষমতা দখল করেন। এরপর ভুট্টো পরিবার নিপীড়নের শিকার হয়। বেনজির গ্রেপ্তার হয়ে গৃহবন্দি থাকেন। নির্বাসনেও যেতে হয়। ১৯৭৯ সালে তার বাবাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এ ঘটনা তার রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি ইতিহাস তৈরি করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারী সরকারপ্রধান। ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। তবে তার সরকার দুর্বল ছিল। রাষ্ট্রপতি তার সরকার ভেঙে দেন। ১৯৯৩ সালে তিনি আবার ক্ষমতায় ফেরেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। এ সময়েও তার সরকার টেকেনি। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তার স্বামী আসিফ আলী জারদারির নাম বারবার আলোচনায় আসে। তিনি রাষ্ট্রের রোষানলে পড়েছেন বহুবার। আন্তর্জাতিকভাবেও তিনি সমালোচিত হন। তবে তিনি পশ্চিমা বিশ্বে জনপ্রিয় ছিলেন। তাকে উদার ও গণতান্ত্রিক নেতা হিসেবে দেখানো হতো।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত