
আকার-আয়তনে চট্টগ্রাম জেলার বৃহত্তম এবং বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উপজেলা ফটিকছড়ি। ফটিকছড়িতে অবস্থিত ১৮টি চা বাগান। যা শুধু চট্টগ্রামেই নয়; সারা দেশের চা শিল্পের শক্তিশালী বুনিয়াদ। ব্যাপক অবদান রাখছে বাণিজ্য, শ্রমিক কর্মসংস্থান, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও অর্থনীতিতে। ফটিকছড়ির চা বাগানগুলোতে বার্ষিক উৎপাদিত হয় এক কোটি কেজিরও বেশি চা-পাতা। দেশে চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশই জোগান দিচ্ছে উৎপাদিত চা। তবে আধুনিক মানসম্মত আবাদণ্ডউৎপাদনে রূপান্তরে অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে থাকা, খরা-অনাবৃষ্টি, দক্ষ শ্রমিক সঙ্কট, ব্যয় বৃদ্ধি ও অবকাঠামো দুর্বলতার কারণে সুযোগ-সম্ভাবনা ও চাহিদার তুলনায় কমছে উৎপাদন। বাগান মালিকরা বলছেন, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্য শ্রমনীতি নিশ্চিত হলে আবারও রেকর্ড পরিমাণে চা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। সবুজে ঘেরা দু’টি পাতা- একটি কুঁড়ির আদিগন্ত চা বাগান, ঢালুপথ, বাংলো, লেক আর সহজ যাতায়াতের সুবাদে প্রকৃতির অপরূপ নিসর্গ এসব চা বাগান। শিল্প, অর্থনীতি ও পর্যটনের বহুমুখী সম্ভাবনায় ফটিকছড়ি দেশের অন্যতম চা-রাজ্যে রূপ নিচ্ছে। বৃহত্তর সিলেটের পর সবচেয়ে বেশি চা বাগান চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ৩৩ হাজার ৯০০ একর বিস্তীর্ণ জমিতে ১৮টি বাগানে চা চাষ হচ্ছে। বার্ষিক গড়ে উৎপাদিত হয় গড়ে এক কোটি ১০ লাখ কেজি চা। কর্মরত আছেন ২২ হাজারেরও বেশি শ্রমিক-কর্মচারী। দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ কর্ণফুলী চা বাগানসহ চট্টগ্রামের বড় বাগানগুলো অবস্থিত এ উপজেলায়। দেশের চা আবাদণ্ডউৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের পাশাপাশি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ফটিকছড়ির চা শিল্পের ভূমিকা অপরিসীম। উল্লেখযোগ্য বাগানগুলো হচ্ছে কর্ণফুলী, রামগড়, উদালিয়া, বারমাসিয়া, রাঙ্গাপানি, এলাহী নুর, ডলু কৈয়াছড়া, আছিয়া, হালদা ভ্যালি, পঞ্চবটী, মোহাম্মদ নগর, মা-জান, নিউ দাঁতমারা, ইস্পাহানি গ্রুপের নেপচুন, চৌধুরী টি এস্টেট, নাছেহাসহ মোট ১৮টি। বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের গত অক্টোবর’ ২৫ইং প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলে চা উৎপাদন গত বছরের (২০২৪ইং) একই সময়ের তুলনায় কমেছে ১০ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৮ কেজি (১১.৫১ শতাংশ)। ওই সময়ে গড় বৃষ্টিপাত হয়েছে ৩.০৫ ইঞ্চি, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য কম। বৃষ্টিপাতে ঘাটতি ও ব্যয় বৃদ্ধিকে উৎপাদন হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন চা বিশেষজ্ঞরা। দেশের অন্যতম বৃহৎ কর্ণফুলী চা বাগানের (৬৫৭২ একর) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফি আহমেদ খান জানান, এ বাগানে ২০২২ সালে ১৭ লাখ কেজি, ২০২৩ সালে ১৮.৭৫ লাখ কেজি, ২০২৪ সালে ২১ লাখ কেজির বেশি চা উৎপাদন হয়। চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রা ২২ লাখ কেজি। তবে প্রথম ছয় মাসে তীব্র খরায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। তিনি জানান, ২০৩০-৩৫ সালের মধ্যে বাগানটিকে দেশের সর্ববৃহৎ চা উৎপাদনকারী হিসেবে উন্নীত করার টার্গেট রয়েছে। এ বাগানে কাজ করছেন প্রায় ৩ হাজার শ্রমিক। রয়েছে স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সুবিধা। হালদা ভ্যালি চা বাগানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহসিন জানান, ২০২৩ সালে ৯.৫ লাখ কেজি, ২০২৪ সালে ১১ লাখ কেজি এবং ২০২৫ সালে লক্ষ্যমাত্রা ১১ লাখ কেজি হলেও উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ কেজি। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন। তাছাড়া রাঙ্গাপানি, বারমাসিয়া, উদালিয়া, নেপচুন, রামগড়, কৈয়াছড়া, মা-জান, চৌধুরী টি এস্টেটসহ সবক’টি চা-বাগানে উৎপাদন কমবেশি ব্যাহত হচ্ছে মূলত খরা, শ্রমিক সঙ্কট ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যায়। এদিকে সীমিত মজুরি দিয়ে বাজারের অগ্নিমূল্যে সংসার চলছে না বলে শ্রমিকরা অভিযোগ করেছেন। শ্রমিক নেতা মৃদুল দাশ বলেন, মালিকপক্ষের সঙ্গে চুক্তির কথা থাকলেও তা হয়নি। পুরনো চুক্তিতেই শ্রমিকরা কাজ করছে। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি নিরঞ্জন নাথ মন্টু বলেন, শ্রমিকরা দিন-রাত পরিশ্রম করলেও উৎপাদন বাড়ুক বা কমুক, মজুরি একই থাকছে।
এটি সুস্পষ্ট বৈষম্য। বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার সুবিধা অত্যন্ত অপ্রতুল। কঠোর পরিশ্রমের বাস্তবতা তুলে ধরলেন পুরস্কারপ্রাপ্ত জেসমিন আক্তার। নেপচুন চা বাগানের বারবার ‘শ্রেষ্ঠ পাতা চয়নকারী’ জেসমিন আক্তার বলেন, বাগানের রাস্তা-ঝোঁপঝাড় পরিষ্কার না থাকায় কাজের গতি কমছে। প্রচুর রোদণ্ডবৃষ্টিতে পাতার মান কমে, শ্রমিকদের কষ্টও বাড়ে। পোকাণ্ডমাকড়ের কামড়, হাতে কেটে যাওয়া- সবই নিত্যনৈমিত্তিক। যথাযথ সুরক্ষা পাই না। তিনি শ্রমিক-বান্ধব পরিবেশ, চিকিৎসা-সুরক্ষা ও মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানান।
বাংলাদেশ টি এস্টেট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অমল দাশ জানান, চুক্তি থাকা সত্ত্বেও কিছু মালিক স্টাফদের ন্যায্য সুবিধা দিচ্ছেন না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রাজীব আচার্য্য বলেন, ফটিকছড়িতে ৩ হাজার ৭৬৫ জন চা শ্রমিক সরকারি অনুদান পাচ্ছেন। আগের ৫ হাজার টাকা থেকে এখন অনুদান বৃদ্ধি করে ৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা উপবৃত্তি চালু, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক বলেন, চা বাগানের অনুপযোগী বা অনাবাদি জমিগুলোকে কৃষি উৎপাদনের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। অনেক বাগানে চায়ের পাশাপাশি ড্রাগন, মালটা, কফি, আগরসহ বিভিন্ন ফল-ফসল চাষ হচ্ছে। চৌধুরী টি এস্টেটের পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে। যা চা শিল্পে বড় বাধা। অধিকাংশ বাগানে গ্যাস সংযোগ নেই। পিক সিজনে শ্রমিক সঙ্কটে উৎপাদন ব্যাহত হয়। কৃষিঋণের আওতায় না থাকায় বাগান মালিকরা সুদ বেশি দিচ্ছেন। গ্যাস-বিদ্যুৎ স্থিতিশীল হলে এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় এনে কৃষিঋণ দিলে উৎপাদন বাড়বে। ফটিকছড়ির পাইকারি চা বিক্রেতা সালাউদ্দীন বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর চা উৎপাদন কম হওয়ায় ব্রোকারদের কাছ থেকে বেশি দামে চা কিনতে হচ্ছে। খুচরা বাজারেও চায়ের দাম বেড়েছে। পর্যটন সম্ভাবনা দিগন্ত উন্মেচিত হলে স্বর্গভূমিতে পরিণত হবে ফটিকছড়ির ১৮টি চা বাগান। সবুজে ঘেরা বাগান, বাংলো, কৃত্রিম লেক, বনাঞ্চল, সহজ যাতায়াতের ফলে ক্রমেই বাড়ছে পর্যটক। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাস্তাঘাট সড়ক সংস্কার, নিরাপত্তা, বিনোদনকেন্দ্র, হোটেল-মোটেল নির্মাণ, চিকিৎসাসেবা বাড়লে ফটিকছড়ি জাতীয় পর্যটনে বিরাট অবদান রাখবে।