ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

দূষণমুক্ত হচ্ছে না হালদা নদী

দূষণমুক্ত হচ্ছে না হালদা নদী

পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন প্রতিবছর নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মহাসমারোহে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ পালন করলেও, তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে না দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর ওপর। ফলে কাগজে-কলমে নানা প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে দূষণমুক্ত হচ্ছে না এই নদী। হালদা পাড়ের বাসিন্দা এবং পরিবেশ সচেতন মহলের মতে, পরিবেশের ওপর অশুভ প্রভাব মোকাবেলার অঙ্গীকার নিয়ে ১৯৭২ সাল থেকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়ে আসছে। অথচ বাস্তবে পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী খাতগুলো চিহ্নিত করে তা বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। তাদের অভিযোগ, ‘মৎস্য হেরিটেজ’ ঘোষিত হালদা নদী আজ চরম পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার হলেও, দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক এই মৎস্য খনিটিকে রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা রাখছে না।

সম্প্রতি হালদা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, সংযুক্ত খাল ও নালা হয়ে প্রতিনিয়ত নদীতে নামছে নানা রকমের শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে অবাধে চলাচল করছে যান্ত্রিক নৌযান। মদুনাঘাট এলাকায় নোঙর করে রাখা হয়েছে বালু পরিবহনের বড় বড় যান্ত্রিক নৌকা। এছাড়া স্পিডবোটের তীব্র গর্জন ও অবাধ চলাচল নদীর শান্ত পরিবেশকে বিঘ্নিত করছে। একই সঙ্গে, আশপাশের বিভিন্ন পোলট্রি খামার থেকে সরাসরি মুরগির বিষ্ঠা, লোকালয়ের পচা লতাপাতার পানি এবং কলকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য এসে মিশছে হালদার পানিতে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মারাত্মক দূষণের কারণে গত ছয় বছরে নদীটিতে ৫০টিরও বেশি বিপন্ন প্রজাতির ডলফিন এবং অন্তত ৩১টি বড় মা মাছ মরে ভেসে উঠেছে। ভেসে ওঠা কার্পজাতীয় এসব মা মাছের একেকটির ওজন ছিল ৭ থেকে ১৫ কেজি পর্যন্ত। এছাড়া নদীর তলদেশ ও উপরিভাগে ভাসছে টন টন পলিথিন, প্লাস্টিক ও অপচনশীল বর্জ্য। নদী ও খালের পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা অসংখ্য মুরগি ও গরুর খামারের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলায় পানির রঙ ও গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে।

হালদা গবেষক, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির চেয়ারম্যান ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন: ‘হালদা নদীর জীববৈচিত্র ধ্বংসের মূল কারণ পানি দূষণ। বিভিন্ন শিল্পকারখানার বর্জ্য অব্যাহতভাবে খাল-নালা হয়ে নদীতে পড়ছে। এছাড়া অপরিকল্পিত পোলট্রি ও ডেইরি ফার্মের বর্জ্য এবং মরা পশু নদীতে ফেলার কারণে পানিতে ক্ষতিকারক ‘অ্যামোনিয়া গ্যাস’ সৃষ্টি হচ্ছে। এই গ্যাসের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণেই মা মাছ এবং ডলফিনসহ জলজ প্রাণীর মৃত্যু হচ্ছে। হালদা ও তার সংযুক্ত খালগুলোর অববাহিকায় থাকা জেলে পল্লীর বাসিন্দারা জানান, বর্তমানে বিভিন্ন খালে একশ্রেণির অসাধু চক্র বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধন করছে। পাশাপাশি জোয়ার-ভাটার সময় খালের কিনারায় মিহি সুতার জাল (কারেন্ট জাল) বসিয়ে ছোট মাছের বংশ ধ্বংস করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট পরিবেশবাদী ও নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, হালদার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে দক্ষিণ এশিয়ার এই অনন্য মৎস্য খনিটি অচিরেই মাছশূন্য নদীতে পরিণত হতে পারে।

বি: হালদা নদীর রাউজানের নাপিতের ঘোনা এলাকা থেকে তোলা ছবিনাপিতের ঘোনা এলাকার অংশ।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত