
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) অপারেটিং কার্যক্রম কার হাতে যাবে এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা, তর্ক-বিতর্ক যেন থামছেই না। বলা চলে, চট্টগ্রাম বন্দরের বৃহত্তম নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) ভাগ্য এক প্রকার ঝুলে আছে। বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল আন্দোলন থেমেছে। কিন্তু অপারেটর নিয়ে বিতর্ক থেমে নেই। শ্রমিক সংগঠনগুলো দুবাইভিত্তিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে পরিচালনার ঘোরবিরোধী। অপরদিকে বন্দর ব্যবহারকারী আমদানি রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীরা অনেকটা নীরব। ব্যবহারকারীরা নীরব হলেও শ্রমিক সংগঠনগুলো তৎপর। প্রকাশ্যে মিছিল-মিটিং নেই। তবে নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। অপারেটর নিয়ে বিতর্ক সুরাহা না হওয়ায় বন্দর ব্যবহারকারীরা উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা যেকোনো মুহূর্তে এনসিটি অচল হতে পারে। এনসিটি গেল প্রায় এক বছর ধরে পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল)। প্রতি মাসে এনসিটিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কের মধ্যে একের পর এক রেকর্ড গড়ছে এই অপারেটর প্রতিষ্ঠান। গত বছরের মতো চলতি বছরেও হ্যান্ডেলে সাফল্যের ধারা অব্যাহত আছে। গেল মে মাসে রেকর্ড কনটেইনার হ্যান্ডেল করেছে। আগামী কয়েক মাসেও আরও বেশি কনটেইনার হ্যান্ডেলের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। কনটেইনার হ্যান্ডেলে এই সাফল্য টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশেষ করে দুবাইভিত্তিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা যথাযথ কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আন্দোলনরত শ্রমিক নেতারা বলছেন, চট্টগ্রাম ড্রাইডক বেশ ভালোভাবে পরিচালনা করছে এনসিটি। এই মুহূর্তে ডিপি ওয়ার্ল্ড বা অন্য কোনো অপারেটরের প্রয়োজন নেই। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশি না বিদেশি অপারেটর পরিচালনা করবে তা নির্ধারণ করবেন আদালত। দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজে যুক্ত হবে না বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দর সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের বৃহত্তম টার্মিনাল এনসিটি। কনটেইনারের বড় অংশ হ্যান্ডেল হয় এই টার্মিনালে। কনটেইনার রাখা এবং এক সঙ্গে বেশি কনটেইনার জাহাজ বার্থিং সুবিধা আছে এই টার্মিনালে। এই কনটেইনার টার্মিনাল ২০০৭ সালে নির্মাণ শেষ হয়। এনসিটির জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪৬৯ কোটি টাকা ব্যয় করে। নির্মাণের পর থেকে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে দায়িত্ব পালন করেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ার টেক।
এনসিটি পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনতে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। ২০২৫ সালের ৭ জুলাই থেকে সিডিডিএল চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনালের অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে। সিডিডিএল দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই টার্মিনালটির কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে গতিশীলতা বাড়ছে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ জানান, আমরা চাই এনসিটি ভালভাবে পরিচালিত হোক। কার মাধ্যমে পরিচালনা হলো তা আমাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। বন্দরের বৃহত্তম এই টার্মিনাল যারা ভালোভাবে পরিচালনা করবে আমরা তার পক্ষে। সেটা দেশি বিদেশি কোনো সমস্যা নেই। তবে বর্তমানে ড্রাইডক লিমিটেড বেশ ভাল পারফরম্যান্স করছে। মে মাসে বেশ ভাল পরিমাণে কনটেইনার হ্যান্ডিলং করেছে। গত বছর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তারা দক্ষতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। এদিকে বিদেশি অপারেটর প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনার ভার তুলে দেওয়ার বিরোধী শ্রমিক সংগঠনগুলো এখনও সক্রিয়। বিদেশি অপারেটরবিরোধী আন্দোলন করছে জোটভুক্ত সংগঠন স্কপ। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)সহ গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের কাছে ইজারা না দেওয়ার দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে চট্টগ্রাম শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। গত বুধবার (১০ জুন) এ উপলক্ষে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে স্কপের নেতারা চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি জমা দেন। সমাবেশে বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম এই বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে বন্দর পরিচালনার ওপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম স্কপের যুগ্ম সমন্বয়কারী এসকে খোদা তোতনের সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম সমন্বয়কারী ইফতেখার কামাল খানের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন টিইউসি চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সভাপতি খোরশেদ আলম, বিএফটিইউসির সাধারণ সম্পাদক কেএম শহিদুল্লাহ, বিএলএফের সভাপতি নুরুল আবছার তৌহিদ, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের হেলাল উদ্দিন কবির, ডক শ্রমিক দলের সভাপতি মো. হারুন, সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিমসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। বক্তারা বলেন, রাষ্ট্র্রীয় অর্থায়নে নির্মিত এনসিটি বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক কনটেইনার টার্মিনাল। দেশীয় শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টার্মিনালটি সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে এনসিটিতে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউ’স কনটেনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা টার্মিনালটির ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড। এ সাফল্য প্রমাণ করে যে দেশীয় সক্ষমতা দিয়েই আধুনিক ও দক্ষ বন্দর পরিচালনা সম্ভব। চট্টগ্রাম বন্দর একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং এটি কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন (কেপিআই-১) হিসেবে স্বীকৃত। বন্দর এলাকায় নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের স্থাপনা এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। ফলে বন্দর পরিচালনার বিষয়টি শুধু বাণিজ্যিক নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্মারকলিপিতে স্কপ নেতারা দাবি জানান, এনসিটি, সিসিটি, জিসিবিসহ চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ড বা অন্য কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ সংক্রান্ত চলমান আলোচনা ও প্রক্রিয়া বাতিল, বন্দর পরিচালনায় দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হবে না মর্মে সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার দাবি জানানো হয়। বন্দর সূত্র জানায়, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কনটেইনার হ্যান্ডেলে নতুন নতুন রেকর্ড করেছে নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল)। গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে এই টার্মিনাল হ্যান্ডেল করে আসছে ড্রাইডক। চলতি বছরের শুরু থেকে কনটেইনার হ্যান্ডেলে নতুন রেকর্ড করছে ড্রাইডক। মে মাসে এনসিটিতে এক লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্পন্ন হয়েছে। যা এনসিটির ইতিহাসে একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ। দৈনিক হিসেবে টার্মিনালটিতে গড়ে চার হাজার ৮১টি করে কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. নাসির উদ্দিন জানান, বিদেশি প্রতিষ্ঠান এনসিটি পরিচালনা করবে কি না বা কবে থেকে করবে সে ব্যাপারে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বর্তমান অপারেটর সরকারি প্রতিষ্ঠান বেশ ভালো করছে। কনটেইনার হ্যান্ডেলও বাড়ছে। গেল মে মাসে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ কনটেইনার (প্রতিটি ২০ ফুট দৈর্ঘ্যরে) হ্যান্ডলিং হয়েছে। এর মধ্যে আমদানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ৫৯ হাজার ৮৫১টি। রপ্তানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ৬৬ হাজার ৬৪৫টি। স্কপভুক্ত সংগঠন শ্রমিক দলের বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার জানান, আমরা আন্দোলন কর্মসূচিতে বিরতি দিলেও সক্রিয় আছি। নিজেদের মধ্যে বৈঠক করছি করণীয় নির্ধারণে। কারণ ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। আগামী সপ্তাহে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। আগামী সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হবে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের মাধ্যমেই প্রধান করা হবে। এই স্মারকলিপিতে বিদেশি অপারেটরদের এনসিটি তুলে না দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি হস্তান্তর কোন পর্যায়ে আছে জানি না। তবে আমাদের বিশ্বাস বিদেশি অপারেটরকে হ্যান্ডওভার করার চেষ্টা থেমে নেই। আমরাও আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। দেখা যাক কী হয়। আমরা কোনোভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বার্থবিরোধী বা এনসিটিবিরোধী কোনো কাজ হতে দেব না। ফিরতে চায় বিতর্কিত অপারেটর! প্রায় দুই দশক আগে কোনো টেন্ডার ছাড়াই এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিল বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড। বিতর্কের মধ্যে দাপটের সঙ্গে পরিচালনা করেছিল এনসিটি। অভিযোগ আছে কনটেইনার হ্যান্ডেলে বাড়তি অর্থ আদায় করত এই প্রতিষ্ঠান। কাজের দক্ষতা নিয়েও ছিল প্রশ্ন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে বছরের পর বছর নির্বিঘ্নে কাজ চালিয়ে গেছে এই প্রতিষ্ঠান। নানা অভিযোগের কারণে সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড গত বছর থেকে নেই এনসিটিতে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সাইফ পাওয়ারের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়ায়নি। এরপর এনসিটি থেকে অনেকটা বিতাড়িত হয় এই প্রতিষ্ঠান। তবে অভিযোগ আছে শ্রমিক সংগঠনের তীব্র আন্দোলনের পেছনে হাত আছে সাইফ পাওয়ারের। তারা চায় প্রথমে বিদেশি অপারেটর হটাতে। এরপর কৌশলে আবার নিয়ন্ত্রণ নেবে এনসিটির। কিন্তু সরকারের বর্তমান অবস্থানের কারণে সাইফ পাওয়ারের এনসিটিতে ফেরা কঠিন মনে করছেন ব্যবহারকারীরা।