ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

চট্টগ্রাম বিভাগের ১২ কারাগারে ধারণক্ষমতার বাইরে কারাবন্দি

চট্টগ্রাম বিভাগের ১২ কারাগারে ধারণক্ষমতার বাইরে কারাবন্দি

চট্টগ্রাম বিভাগের ১২টি কারাগারে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি থাকায় চরম চাপের মধ্যে রয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। এসব কারাগারে বন্দি ধারণক্ষমতা সাত হাজার ৮৫০ জন হলেও বর্তমানে বন্দি রয়েছেন ১৯ হাজার ৯৬৬ জন। অতিরিক্ত বন্দির চাপে কারাবিধি অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণির বন্দিকে পৃথক রাখার ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন অপরাধ ও মামলায় আটক বন্দিদের অনেক ক্ষেত্রেই একই সঙ্গে রাখতে হচ্ছে। কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের ১২টি কারাগারে পুরুষ বন্দির ধারণক্ষমতা সাত হাজার ৪৭৯ জন এবং নারী বন্দির ধারণক্ষমতা ৪১৩ জন। এর বিপরীতে বর্তমানে পুরুষ বন্দি রয়েছেন ১৯ হাজার ২২২ জন এবং নারী বন্দি ৭৪৪ জন।

অর্থাৎ ধারণক্ষমতার তুলনায় পুরুষ বন্দি প্রায় আড়াই গুণ এবং নারী বন্দিও ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি। এসব কারাগারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন এক হাজার ১৩১ জন। এর মধ্যে পুরুষ এক হাজার ৬৮ জন ও নারী ৬৩ জন। এছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ২৫৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২৪০ জন ও নারী ১৭ জন। অন্যদিকে মাদক মামলায় আটক বন্দির সংখ্যা চার হাজার ২৬৮ জন। কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কারাগারে বিভিন্ন শ্রেণি ও অপরাধের বন্দিদের পৃথক রাখার বিধান রয়েছে। কিন্তু ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দি থাকায় বাস্তবে সেই ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে একই স্থানে বিভিন্ন মামলার ও অপরাধে আটক বন্দিদের রাখতে হচ্ছে। অতিরিক্ত বন্দির চাপ সামাল দিতে গিয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে কারাবন্দী ধারণক্ষমতা আছে দুই হাজার ২৪৯ জন। ধারণক্ষমতার বাইরে এ কারাগারে বন্দির সংখ্যা ছয় হাজার ৯০৩ জন। এর মধ্যে মাদক মামলার আসামি ৯০৯ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন ২২৬ জন, এর মধ্যে নারী ১৬ জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন পুরুষ ৪৯৫ জন ও নারী ২২ জন। এ কারাগারে পুরুষ হাজতি পাঁচ হাজার ৪৯১ জন এবং নারী হাজতি ১৬৯ জন। পুরুষ কয়েদি ৪৯৫ জন ও নারী কয়েদি ২৩ জন। বিদেশি বন্দি আছেন ৭৬ জন। এক হাজার ৭৪২ জনের ধারণক্ষমতার কুমিল্লা কারাগারে বর্তমানে বন্দি আছেন তিন হাজার ১৮০ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি দুই হাজার ১২৭ জন ও নারী ১০৬ জন। পুরুষ কয়েদি ৭১৩ জন এবং নারী ১৬ জন। এ কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন তিনজন পুরুষ। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পুরুষ ১৯৮ জন ও নারী ১৫ জন। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ৮৩৩ জন। ৮৩০ জনের ধারণক্ষমতার কক্সবাজার কারাগারে বন্দি আছেন দুই হাজার ৮৮৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি দুই হাজার ৭৪১ জন ও নারী ১৪৪ জন। পুরুষ কয়েদি ২৮৪ জন এবং নারী কয়েদি সাত জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন চার জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পুরুষ ১৬২ জন ও নারী চার জন। বন্দিদের মধ্যে ৮৮৪ জন মাদক মামলার আসামি। ৭৮০ জনের ধারণক্ষমতার ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে বন্দি আছেন দুই হাজার ১৯১ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি এক হাজার ৫১৫ জন ও নারী ৩১ জন। পুরুষ কয়েদি ৫৩১ জন এবং নারী ৫৬ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন দুই জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পুরুষ ৩৮ জন ও নারী পাঁচ জন। মাদক মামলার আসামি আছেন ৬৮০ জন। বিদেশি বন্দি রয়েছেন একজন। ৫০০ জনের ধারণক্ষমতার নোয়াখালী কারাগারে বর্তমানে বন্দি আছেন এক হাজার ৯০ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ৮৬৪ জন ও নারী ২৯ জন। পুরুষ কয়েদি ১২৯ জন এবং নারী পাঁচ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন ছয় জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পুরুষ ৫৫ জন ও নারী দুই জন। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ২০১ জন। ৪৭৫ জনের ধারণক্ষমতার চাঁদপুর কারাগারে বর্তমানে বন্দি এক হাজার ৮৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ৮০১ জন ও নারী ২৮ জন। পুরুষ কয়েদি ২০৭ জন এবং নারী চার জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন একজন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পুরুষ ৪০ জন ও নারী চার জন। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ৪৪৬ জন।

৫৬৪ জনের ধারণক্ষমতার ফেনী-১ কারাগারে বর্তমানে বন্দি আছেন ৫২৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ৩৯৫ জন ও নারী ১৮ জন। পুরুষ কয়েদি ৫৯ জন এবং নারী চার জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন ১২ জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পুরুষ ২৮ জন ও নারী তিন জন। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ১৩ জন। বিদেশি বন্দি রয়েছেন তিনজন। ৭২ জনের ধারণক্ষমতার ফেনী-২ কারাগারে বর্তমানে বন্দি আছেন ৪৬৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ১৭০ জন। পুরুষ কয়েদি আছেন ২৮১ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন ১২ জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ১৩ জন পুরুষ। ২৯৫ জনের ধারণক্ষমতার লক্ষ্মীপুর কারাগারে বন্দি আছেন ৬৬৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ৪৪৯ জন ও নারী নয় জন। পুরুষ কয়েদি ১৫৩ জন এবং নারী চার জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন দুই জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ৪৬ জন পুরুষ। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ৬৩ জন। ১৪৮ জনের ধারণক্ষমতার রাঙামাটি কারাগারে বন্দি আছেন ২৬৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ২১১ জন ও নারী পাঁচ জন। পুরুষ কয়েদি ৪৬ জন এবং নারী দুই জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পাঁচ জন পুরুষ। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ১০৮ জন। বিদেশি বন্দি রয়েছেন দুই জন। কারাগার সূত্র জানিয়েছে, জেল কোড অনুযায়ী প্রত্যেক বন্দিকে ৩৬ বর্গফুটের জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার কথা। অথচ চট্টগ্রামের ১১টি কারাগারে বন্দির সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ায় এই সুবিধা দেওয়া যাচ্ছে না। একজনের জায়গায় দুই থেকে তিন জন করে রাখতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী জানান, 'কারাগারের মূল স্লোগান হচ্ছে— 'রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ'। তাই কারাগার শুধু শাস্তি দেওয়ার স্থান নয়, এটি একটি সংশোধনাগারও। বন্দিদের মানবিক জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারাবিধি অনুযায়ী একজন বন্দি যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী, তা তাকে দিতে হবে।' তিনি বলেন, 'কারাগারে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তি অপরাধী— এমনটি মনে করার সুযোগ নেই। অনেকেই মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলায় কারাগারে রয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে এমন মামলায় আটক ব্যক্তিদের আদালত থেকে খালাস পাওয়ার ঘটনাও আমরা দেখেছি। তাই বিচারাধীন বন্দিদেরও মানবিক মর্যাদা ও কারাবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি আরও বলেন, 'আধুনিক সমাজে কারাগারগুলো সংশোধনাগার হওয়ার পরিবর্তে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত