ঢাকা সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

জামালপুর শাহী মসজিদ

মোস্তফা কামাল গাজী
জামালপুর শাহী মসজিদ

ইতিহাস ঐতিহ্যের ‘জামালপুর শাহী মসজিদ’। এটি অক্ষত অবস্থায় আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবে অর্থাভাবে থমকে গেছে নানা উন্নয়নমূলক কাজ। গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়ন পরিষদের পূর্ব পাশে মসজিদটি অবস্থিত।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ইংরেজ শাসনামলে মসজিদটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। সে এলাকায় তেমন লোকবসতি না থাকায় একসময় বনজঙ্গলে ঢাকা পড়ে যায় মসজিদটি। গত ৬০ দশকের প্রথম দিকে গাইবান্ধা মহকুমা প্রশাসক হক্কানি কুতুবউদ্দিন নামে এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি এসডিও হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর স্থানীয় লোকদের কাছে মসজিদটির ইতিকথা শোনেন।

লোকজনের কথা শুনে তিনি স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় মসজিদটি অনুসন্ধান করতে থাকেন। মসজিদের জায়গায় বিশাল বটবৃক্ষ গজিয়ে ওঠায় মসজিদটি বটবৃক্ষের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। হঠাৎ একদিন প্রচণ্ড এক ঝড়ে বটবৃক্ষটি ভেঙে পড়লে স্থানীয় লোকজন মসজিদটি দেখতে পায়। সেই থেকে মানুষ মসজিদটিকে গায়েবি মসজিদ হিসাবেও অবহিত করে। লোকমুখে কথিত আছে, এমনি সময় সিলেটের হজরত শাহ জামাল (রহ.) স্বপরিবারে এ এলাকায় আগমন করেন। সেই থেকে মসজিদের নামকরণ হয় জামালপুর শাহী মসজিদ।

কথিত আছে, তৎকালীন সময়ে সৈয়দ ভোম আলি ভারতের শিলিগুড়ি থেকে সুলতান মাহমুদের আমলে হজরত খাঁজা মঈন উদ্দিন চিশতির নির্দিশে ইসলাম প্রচারের জন্য এই এলাকায় এসে হজরত শাহ জামালের সঙ্গে মিলিত হোন। তারাই এই মসজিদ নির্মাণ করেন বলে ধারণা করা হয়। এ হিসেবে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে প্রায় ৭০০ বছর আগে। মসজিদের পাশে একটি পুকুর খনন করা হয়েছে। কথিত আছে, এই পুকুরে এক সময় স্বর্ণের চালন ভাসত। পুকুর খননের কোন ইতিহাস জানা নেই কারও। এলাকার একজন প্রবীণ মুরুব্বি জানান, লোকমুখে শুনেছি, ‘এই এলাকায় বিরাট জঙ্গল ছিলো। জঙ্গলে বাঘ-ভালল্লুক বাস করতো। মসজিদের দুই পার্শ্বে পাহারাদারের মতো সার্বক্ষণিক দুটি বাঘ থাকত। এই জঙ্গল পরিস্কার করার সময় এই মসজিদ ও পুকুর আবিষ্কৃত হয়। তখন থেকেই এই মসজিদের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা নামাজ আদায় করতে থাকে।’

মোঘল আমলে ১৯০০ শতাব্দের ১ম বা ২য় দশকে এই মসজিদ আবিস্কার হয়। মোঘল আমল থেকেই হজরত শাহ জামালের নামের শেষে চৌধুরী উপাধি দেওয়া হয়। জিয়াউর রহমানের সময় ড. আর.এ গণি প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন এই মসজিদ সংরক্ষণের জন্য প্রতিনিধি প্রেরণ করলেও সরকার বদলের পর থেকে অদ্যাবধি মসজিদ ও মাজার শরিফ জীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

এরপর হজরত শাহ জামালের নামানুসারে ইউনিয়ন ও গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে ‘জামালপুর’। এই মসজিদের উত্তর পাশেই রয়েছে পীরে কামেল হজরত শাহ জামাল (রহ.) এর মাজার শরিফ।

মসজিদটি এখনও কয়েক ফুট মাটির নিচে দেবে আছে বলে এলাকার অনেকই জানান। মসজিদের নিচের দেয়ালে আছে ইটের ৭২ ইঞ্চি ও উপরের দেয়ালে আছে ৫৬ ইঞ্চি চেপ্টা দেয়াল।

মসজিদটির জমির কাগজপত্র খতিয়ে দেখা গেছে, ৪০ সনের রেকর্ড অনুযায়ী মসজিদের ১৬ শতক জমির মালিক ছিলেন বড় জামালপুর গ্রামের মরহুম খন্দকার আব্দুল মজিদ গং। পরবর্তীতে মসজিদের নামে জমিটি লিখে দিয়েছেন তারা।

মসজিদ ও হজরত শাহ জামালের মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ইউনিয়ন পরিষদ অফিস, পোস্ট অফিস, মাধ্যমিক বালক ও বালিকা বিদ্যালয়, ফাজিল মাদ্রাসা, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পরিবার পরিকল্পনা অফিস এবং এতিমখানা ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা। পাশে গড়ে উঠেছে একটি বাজার। মসজিদটি বাহির থেকে অনেক বড় মনে হলেও মসজিদের ভেতরে শুধু দুই কাতারে ৬০ জন মুসল্লি নিয়ে নামাজ আদায় করা যায়।

বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এলাকার লোকজন মসজিদের মূল অবকাঠামো ঠিক রেখে সামনের দিকে (সংযুক্ত) মসজিদ ভবন নির্মাণ করেছে। ২য় তলার কাজও এরইমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন প্রায় ৫০০-৭০০ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়া যায়।

মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আজহার আলি সরকার বলেন, ‘প্রতি শুক্রবারই দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষরা মসজিদে মান্নতির নগদ টাকা, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, চাল ও মিষ্টি নিয়ে আসেন এবং পোলাও করে শিন্নি বিতরণ করেন এখানে। যে কেউ যে নিয়াতেই মান্নত করে, আল্লাহর অশেষ রহমতে তা পূরণ হয়।’

তিনি আরও জানান, ‘ধর্মপ্রাণ মানুষদের মান্নতির অনুদানসহ স্থানীয় মুসল্লি বা ব্যক্তিদের আর্থিক সহযোগিতায় মসজিদ পরিচালনা করা হয়। এলাকার জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন কিছুটা সহযোগিতা করেন। এতেই ধারাবাহিকভাবে সংস্কার করা হচ্ছে মসজিদোর কাজ, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।’

জামালপুর শাহী মসজিদ কমিটির সভাপতি খন্দকার আব্দুল হেলাল আল-মামুন জানান, ‘আগের চেয়ে মসজিদটি অনেক প্রসার করা হয়েছে। আরো অনেক কাজ অসমাপ্ত রয়েছে।

এ পর্যন্ত ১ম ও ২য় তলার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ৩য় তলা নির্মাণধীন রয়েছে। এখনও মসজিদের টাইলস, জানালার গ্লাস, অজু খানা, টয়লেট, প্রস্রাব খানা, ইমামণ্ডমুয়াজ্জিনদের রুম ও ৩য় তলার কাজসহ অনেক কাজই বাকি রয়েছে; কিন্তু অর্থাভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত