প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
যে সময়ে আমরা নৈতিকভাবে ক্লান্ত, সামাজিক বৈষম্য এবং ভোগবাদী মানসিকতার চাপে ক্রমেই দিশাহারা হয়ে পড়ছি, ঠিক সেই সময়ে রমজান আসে এক নীরব অথচ শক্তিশালী আহ্বান নিয়ে। এই আহ্বান শুধুই না খেয়ে থাকার নয়; এটি আত্মসংযম, ন্যায়বোধ, আত্মসমালোচনা ও মানবিক পুনর্জাগরণের ডাক। রমজান তাই কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের মাস নয়, এটি ব্যক্তি ও সমাজকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার এক বিরল সুযোগ, এক গভীর নৈতিক অনুশীলন।
ইসলামী দর্শনে রমজানকে বলা হয় রহমত, বরকত ও নাজাতের মাস। এই তিনটি ধারণা একে অপরের পরিপূরক এবং ধারাবাহিকভাবে মানুষের আত্মিক রূপান্তর ঘটায়। প্রথম দশকের রহমত মানুষের হৃদয়কে নরম করে, দ্বিতীয় দশকের বরকত জীবনে ভারসাম্য আনে, আর শেষ দশকের নাজাত মানুষকে আত্মিক ও নৈতিক মুক্তির পথে নিয়ে যায়। এই তিন ধাপ আসলে আত্মশুদ্ধির একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া, যেখানে অনুশোচনা, সংশোধন এবং প্রতিজ্ঞা একসূত্রে গাঁথা।
রমজানের রহমত আমাদের শেখায় ক্ষমাশীলতা ও সহানুভূতি। ব্যক্তি যখন নিজের ভুল স্বীকার করে স্রষ্টার দিকে ফিরে আসে, তখন তার আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে সে হয়ে ওঠে সহনশীল ও মানবিক। আজ যখন অসহিষ্ণুতা, বিদ্বেষ এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি সমাজকে বিভক্ত করছে, তখন রহমতের এই শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি দয়াশীল সমাজই পারে স্থিতিশীল উন্নয়ন ও সামাজিক শান্তির ভিত্তি গড়তে। ক্ষমা ও সহমর্মিতা কেবল ব্যক্তিগত গুণ নয়, এগুলো সামাজিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত।
বরকতের ধারণা আমাদের ভোগবাদী চিন্তার বিপরীতে দাঁড় করায়। রমজানে মানুষ কম খায়, কিন্তু বেশি শিখে; কম ভোগ করে, কিন্তু বেশি সংযমী হয়। দিনের দীর্ঘ সময় ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা মানুষকে শেখায় আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি। সময় ব্যবস্থাপনা, অপচয় রোধ, খাদ্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপন, এসবই বরকতের বাস্তব প্রয়োগ। বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে রমজানের এই শিক্ষা ব্যক্তি ও রাষ্ট্র, উভয়ের জন্যই দিকনির্দেশনামূলক। সংযম কেবল ধর্মীয় অনুশীলন নয়; এটি টেকসই অর্থনীতি ও নৈতিক বাজারব্যবস্থার ভিত্তি।
রমজানের শেষ দশক নাজাতের- যা মুক্তির প্রতীক। নাজাত মানে শুধু পরকালের মুক্তি নয়; এটি অন্যায়, দুর্নীতি, লোভ ও আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে মুক্তির আহ্বান। লাইলাতুল কদর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি রাত, একটি সিদ্ধান্ত, একটি আন্তরিক তওবা ও জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। যদি এই উপলব্ধি ব্যক্তিগত গতি পেরিয়ে সামাজিক আচরণে প্রতিফলিত হয়, তবে পরিবর্তন অনিবার্য। একজন ব্যবসায়ী যদি এই মাসে ন্যায্য মুনাফার নীতি গ্রহণ করেন, একজন প্রশাসক যদি দায়িত্বে সততা বজায় রাখেন, একজন নাগরিক যদি অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন, তবে নাজাত কেবল আধ্যাত্মিক শব্দ থাকবে না, তা বাস্তব সামাজিক শক্তিতে রূপ নেবে।
রমজান ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে আমাদের সামাজিক বাস্ততার মুখোমুখি দাঁড় করায়। যারা প্রতিদিন তিন বেলা খাবারের নিশ্চয়তা পায়, তারা এই মাসে বুঝতে শেখে অনিশ্চিত জীবনের কষ্ট। এই উপলব্ধিই যাকাত, ফিতরা ও দানের মাধ্যমে সম্পদের নৈতিক পুনর্বণ্টনের প্রেরণা দেয়। অর্থনীতির ভাষায়, এটি বৈষম্য কমানোর একটি কার্যকর নৈতিক কাঠামো। সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক অর্থনীতির যে নীতিগুলো আমরা তত্ত্বে আলোচনা করি, রমজান সেগুলোকে বাস্তব জীবনে অনুশীলনের সুযোগ করে দেয়।
তবে বাস্তবতা হলো, আমরা প্রায়ই রমজানকে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখি। ইফতার কেন্দ্রিক অতিভোগ, কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্য অপচয় এবং ধর্মীয় আবেগের বাণিজ্যিকীকরণ রমজানের প্রকৃত চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সংযমের মাসকে যদি আমরা প্রতিযোগিতামূলক ভোগের উৎসবে পরিণত করি, তবে আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এখানে ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের সমান দায়িত্ব রয়েছে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা, বাজারে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করা।
রমজান আমাদের মনে করিয়ে দেয়- সংযম দুর্বলতা নয়, এটি আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি। নৈতিকতা বিলাসিতা নয়, এটি টিকে থাকার শর্ত। আত্মশুদ্ধি কোনো ব্যক্তিগত বিলাস নয়; এটি একটি সুস্থ, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত। এই মাস আমাদের শেখায় পরিবর্তন বাইরে নয়, শুরু হয় ভেতর থেকে। এই আসন্ন রমজান যদি আমরা কেবল রোজার তালিকায় সীমাবদ্ধ না রেখে চিন্তা, আচরণ ও সিদ্ধান্তে রূপ দিতে পারি, তবে রহমত আমাদের হৃদয়ে, বরকত আমাদের জীবনে এবং নাজাত আমাদের সমাজে বাস্তব রূপ পাবে। তখন রমজান কেবল একটি পবিত্র মাস থাকবে না, এটি হয়ে উঠবে নৈতিক পুনর্জাগরণের স্থায়ী ভিত্তি।
দিলশাদ আহমেদ
সামাজিক বিশ্লেষক ও পরিচালক (স্বতন্ত্র), পিপলস্ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি