
চান্দিনার হারং দক্ষিণ পাড়ার দিগন্তজোড়া মাঠে এখন হলুদের সমারোহ। শীতের শেষভাগে সোনালি রোদে দোল খাচ্ছে হাজারো সূর্যমুখী ফুল। এ যেন প্রকৃতির এক অনন্য রূপের ক্যানভাস। কুমিল্লার চান্দিনা পৌর এলাকার এই হলদে আভা শুধু পথচারীদের চোখই জুড়াচ্ছে না, বরং কৃষক হাবিবুল্লাহর চোখে বুনে দিয়েছে এক নতুন স্বপ্ন। প্রথাগত ফসলের বাইরে গিয়ে সূর্যমুখী চাষ করে তিনি এখন এলাকায় এক সফল দৃষ্টান্ত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
তার এই বাম্পার ফলন দেখে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। কৃষক হাবিবুল্লাহ তার নিজের ১৫ শতক জমিতে এবারই প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে সূর্যমুখী চাষের সিদ্ধান্ত নেন। শুরুতে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও কৃষি বিভাগের সঠিক দিকনির্দেশনা তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
এই স্বল্প পরিমাণ জমিতে চাষাবাদ থেকে শুরু করে পরিচর্যা পর্যন্ত তার মোট খরচ হয়েছে মাত্র ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। অথচ ফলনের বর্তমান অবস্থা দেখে বোঝা যাচ্ছে, লাভের পরিমাণ খরচের কয়েক গুণ ছাড়িয়ে যাবে। হাবিবুল্লাহর এই সাফল্যের নেপথ্যে বড় ভূমিকা রেখেছে সরকারি সহায়তা। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তাকে প্রণোদনা হিসেবে উন্নত মানের বীজ সরবরাহ করা হয়েছিল। শুধু বীজ দিয়েই দায় সারেনি কৃষি বিভাগ, বরং চারা রোপণ ও বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সারের একটি অংশও তাকে সরকারিভাবে প্রদান করা হয়েছে।
তবে শুধু উপকরণ সহায়তা পেলেই যে ভালো ফলন সম্ভব নয়, তা ভালোভাবেই জানেন হাবিবুল্লাহ। চারা রোপণ থেকে শুরু করে পোকা দমন এবং সেচ ব্যবস্থাপনায় তিনি নিয়মিত পরামর্শ নিয়েছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। বিশেষ করে চান্দিনা পৌর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোলাম সরোয়ারের সার্বিক সহযোগিতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তিনি নিয়মিত হাবিবুল্লাহর জমিতে গিয়ে গাছের তদারকি করেছেন এবং আধুনিক পদ্ধতিতে কীভাবে পরিচর্যা করলে তেলের গুণগত মান বজায় রেখে ভালো ফলন পাওয়া যায়, সে বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়েছেন। মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তার এমন নিবিড় তত্ত্বাবধান হাবিবুল্লাহর এই বাম্পার ফলনের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সূর্যমুখী মূলত একটি ভোজ্য তেলের ফসল হলেও বাংলাদেশে এর চাষাবাদ ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। অন্যান্য তেলজাতীয় শস্যের তুলনায় সূর্যমুখীর খরচ কম কিন্তু ফলন ও তেলের পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। হাবিবুল্লাহর জমিতে ফুটে থাকা প্রতিটি ফুল এখন পরিপক্ক হওয়ার পথে। কৃষকের ভাষ্যমতে, সঠিক সময়ে ফসল ঘরে তুলতে পারলে তিনি এখান থেকে যে পরিমাণ তেল বা বীজ পাবেন, তা তার পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে বাজারে ভালো দামে বিক্রি করতে পারবেন। বর্তমান বাজারে ভোজ্য তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সূর্যমুখী চাষ কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক বিকল্প হিসেবে দেখা দিচ্ছে। হারং দক্ষিণ পাড়ার এই সূর্যমুখী বাগানটি এখন শুধু কৃষিজমি নয়, বরং এলাকার দর্শনার্থীদের কাছে এক অন্যতম আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন বিকালে অসংখ্য মানুষ এই দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য উপভোগ করতে ভিড় জমাচ্ছেন। হাবিবুল্লাহর এই সাফল্য দেখে পার্শ্ববর্তী কৃষকরাও আগামীতে সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। কম খরচে ও সরকারি সহায়তায় এমন লাভজনক চাষাবাদ গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। তেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে হারং গ্রামের হাবিবুল্লাহর মতো প্রান্তিক কৃষকদের এই ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোই ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা পালন করবে। হলদে আভার এই মাঠে এখন শুধু ফসল কাটার অপেক্ষা, যা কৃষক হাবিবুল্লাহর মুখে হাসি ফুটিয়ে সমৃদ্ধির নতুন বার্তা নিয়ে আসবে।