
এক সময় শীত এলেই বরগুনা জেলা যেন খেজুরের গুড়ের সুবাসে মাতোয়ারা হয়ে উঠত। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে গাছের মাথায় ঝুলে থাকা হাঁড়িতে জমা সাদা খেজুরের রস, আর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতো সেই রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরির কর্মযজ্ঞ। ২০ থেকে ২৫ বছর আগেও এমন দৃশ্য ছিল প্রায় প্রতিটি গ্রামে। প্রতিটি পরিবারই ছিল নিজের গাছের রস থেকে তৈরি গুড়ের মালিক। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে আজ বরগুনা থেকে সেই খেজুরের গুড়ের ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্তির পথে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বরগুনা জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামাঞ্চলে খেজুর গাছ এখন চোখে পড়ে খুবই কম। স্থানীয়দের দাবি, যেখানে একসময় শত শত খেজুর গাছ দেখা যেত, সেখানে এখন এক শতাংশ গাছও টিকে নেই। বেশিরভাগ গাছ হয় মরে গেছে, নয়তো ইটভাটার মালিকদের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে জ্বালানি কাঠ হিসেবে। দিনের পর দিন নির্বিচারে গাছ কেটে ইটভাটার চুল্লিতে পোড়ানো হয়েছে, যার ফলেই আজ এই সংকট।
বরগুনা সদর উপজেলার কালিরতবক গ্রামের এক প্রবীণ রস সংগ্রাহক আব্দুল মোতালেব মিয়া বলেন, এক সময় শীতকালে আমাদের ঘুম হতো রাত ৩টায়। রস তুলতে গাছে উঠতাম। সকাল হলেই হাঁড়ি ভরে রস নামানো হতো। সেই রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানিয়ে হাটে বিক্রি করতাম। এখন গাছই নেই, আমরা পেশা হারিয়ে ফেলেছি।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। আগের মতো শীত আর নেই, শীতের স্থায়িত্ব কমে গেছে। ফলে রসের পরিমাণ কমে গেছে, গাছও দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক গাছ রোগাক্রান্ত হয়ে দ্রুত মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে ইটভাটার দাপটে কৃষিজমি ও গাছপালা উজাড় হয়ে যাওয়াও অন্যতম বড় কারণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, খেজুর গাছের কোনো সরকারি সংরক্ষণ নীতি নেই। গাছ কেটে ফেললেও বাধা দেওয়ার কেউ নেই। ইটভাটার মালিকরা মোটা অঙ্কের টাকায় গাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। অভাবের তাড়নায় মানুষ বাধ্য হয়ে গাছ বিক্রি করছে, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কথা কেউ ভাবছে না।
একসময় বরগুনার খেজুরের গুড় ছিল জেলার গর্ব। আশপাশের জেলা এমনকি দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ এই গুড় কিনতে আসতো। শীত মৌসুমে গুড়ের তৈরি নানা পিঠাণ্ডপুলি ছিল ঘরে ঘরে উৎসবের অংশ। আজ সেই ঐতিহ্য শুধু স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ। খেজুর গাছ শুধু গুড়ের উৎস ছিল না, এটি উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে এই গাছ অনেকাংশে প্রাকৃতিক বাঁধের মতো কাজ করতো। এখন গাছ কমে যাওয়ায় দুর্যোগের ঝুঁকিও বেড়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।