ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

কিশোরগঞ্জে বিলুপ্তির পথে জিআই সনদপ্রাপ্ত রাতাবোরো ধান

কিশোরগঞ্জে বিলুপ্তির পথে জিআই সনদপ্রাপ্ত রাতাবোরো ধান

সরকারি নজরদারির অভাবে বিলুপ্ত হতে বসেছে কিশোরগঞ্জের জিআই সনদপ্রাপ্ত রাতাবোরো ধান। এক সময় জেলায় বাণিজ্যিকভাবে স্থানীয় জাতের এই ধান প্রচুর চাষাবাদ হলেও এখন সামান্য পরিমানে চাষ হচ্ছে কৃষকের নিজেদের খাবারের জন্য। সরকারি-বেসরকারিভাবে এ ধানের বীজ সংগ্রহের উদ্যোগ নেই বলছে খোদ কৃষি বিভাগ। বীজের সহজলভ্যতা ও বিপনণ নিশ্চিত করা গেলে লাভজনক সুগন্ধি এ ধানের চাষ বাড়াতে চান কৃষকেরা। এখন চলছে বৈশাখ মাস। প্রতিবছর এমন সময় এলেই কিশোরগঞ্জের প্রায় দেড় হাজার বর্গকিলোমিটার হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার ধুম লাগে। দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করেন কৃষক-কৃষাণিরা। বরাবরের মতো এবারও চলছে ধান কাটাই-মাড়াই ও শুকানোর কাজ।

জেলার নিকলী হাওরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অন্যান্য ধানের পাশাপাশি রাতাবোরো পাঁকাধান কাটছেন কৃষক।

পরে, নৌকাতে বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে। বাড়ির আঙিনাতে চলছে ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজ। এ জেলার হাওরাঞ্চলে বহুবছর ধরেই বোরো মৌসুমে চাষ হয়ে আসছে রাতাবোরো ধান। অন্য ধানের চেয়ে অনেক ছোট এবং ভিন্ন আকৃতির এ ধানের চাল রান্নার পর সুগন্ধ ছড়ায়। খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু এ চালে রয়েছে ক্যান্সার প্রতিরোধের উপদান।

২০২৫ সালে সব গুণাগুণ যাচাইয়ের পর কিশোরগঞ্জের রাতাবোরো ধানকে জিআই সনদ দেয় সরকার। জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হলেও রাতাবোরো ধান আবাদ হয়েছে মাত্র ১৭৮ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে নিকলী হাওরেই আবাদ হয়েছে ১৫৫ হেক্টর জমিতে। কৃষকেরা বলছেন, বাজারে এ ধানের বীজ পাওয়া না যাওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে এ ধানের চাষ সম্ভব হয় না। তাই নিজেদের খাবারের জন্য অল্প পরিমানে চাষ করেন তারা।

নিকলী দামপাড়া এলাকার কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘রাতাবোরো ধান আমরা আগে বেশি পরিমানে করতাম। এখন অল্পকিছু করি, নিজে খাই এবং আত্মীয়-স্বজনদের কিছু দেই। বাজারজাত করতে পারলে দাম খুব বেশি, খেতেও খুব টেস্ট।’ নিকলী সদর ইউনিয়নের কৃষক তাইজুল ইসলাম বলেন, ‘রাতাবোরো ধানের বীজ আমরা পাচ্ছিনা। পাশের কৃষকের কাছ থেকে অল্প আনা যায়, পর্যাপ্ত পাইনা। পাইলে এ ধানের দাম ভাল তাই চাষ করতাম বেশি করে।’ দেশীয় জাতের গুণগত মানসম্পন্ন এ ফসল বিলুপ্ত হওয়ার আগেই এর বীজ সংরক্ষণের পাশাপাশি এ ধানের বিপনণ ব্যবস্থার নিশ্চয়তাও জরুরী মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা।

নিকলীর উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, ‘রাতাবোরো হলো এ অঞ্চলের স্থানীয় জাতের ধান। বর্তমানে এ ধান কৃষক বেশি করে চাষ করে না কারণ, প্রথমত এর বীজ পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, প্রচুর ধান বিক্রির বাজার তারা পায় না। অল্প করে চাষ করে নিজেদের মধ্যেই এলাকায় বিক্রি করে।’ নিকলি উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আবদুস সামাদ বলেন, ‘আমাদের দেশে যারা সুগন্ধি চালের ব্যবসা করেন, এসব কোম্পানী যদি আমাদের কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, কৃষক যদি প্রচুর পরিমানে বিক্রির নিশ্চয়তা পায় তাহলে আগামী বছর থেকেই এর চাষ বৃদ্ধি পাবে।’

জিআই সনদ পাওয়ার পর রাতাবোরো ধানের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হযেছে বলে জানান, জেলা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সাদিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এই রাতাবোরো ধানটি যেহেতু সম্পূর্ণভাবে একটি স্থানীয় জাত, এ জাতের বীজ সরকারি বা বেসরকারিভাবে সংরক্ষণও করে না, বিপনণও করে না। জিআই পণ্য হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর আমরা এটিকে কীভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি পর্যায়ে যারা বীজ উৎপাদনকারী আছে তাদের মাধ্যমে উৎপাদন এবং বিপনণ করা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরইমধ্যে আমি বিএডিসি’র সঙ্গে কথা বলেছি, এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের কিছু বীজ উৎপাদক কিশোরগঞ্জে আছে। তাদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করছি, যাতে এ রাতাবোরো ধানের বীজ সঠিক মানের উৎপাদন করা যায় এবং কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করে এর উৎপাদন বাড়ানো যায় এবং সারাদেশে এর পরিচিতি যাতে আরও ব্যাপক করা যায়।’ রাতাবোরো ধান রোপণের ১৪০ থেকে ১৪৫ দিনের মধ্যে ফলন ঘরে তোলা যায়। প্রতি হেক্টর জমিতে আবাদ করে এর ধান থেকে দুই থেকে সোয়া দুই টন চাল পাওয়া যায়। যার প্রতি কেজির বাজার মূল্য ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত