
কঠোর শ্রম সাধনা আর চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে উন্মুক্ত গবাদিপশু পালন করে শুন্য থেকে সফল খামারি কৃষক কুষ্টিয়া সদর উপজেলার গোস্বামী দূর্গাপুর ইউনিয়নের উত্তর মাগুরা গ্রামের মৃত সোরাপ মন্ডলের ছেলে কৃষক হাসমত মন্ডল। অন্যের পশুদেখা শোনার দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে, কখন যে নিজের মধ্যে পশুর মালিক হওয়ার ঘুমিয়ে থাকা স্বপ্ন দেখা শুরু করেন তিনি। এক সময় কঠোর শ্রমণ্ডসাধনা আর চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে আজ শূন্য হাতে ১৭টা গরুর মালিক হয়েছেন হাসমত মন্ডল।
জানা যায়, হাসমত মন্ডল প্রায় ত্রিশ বছর পূর্বে বাবার সংসার থেকে শূন্য হাতে পৃথক (আলাদা) হয়ে প্রতিবেশি জলিল কারিগরের নিকট থেকে একটি ছোট বকনা বাছুর পোষাণি (বর্গা) নিয়ে উন্মুক্ত চারণভূমিতে পালন শুরু করেন। পালিত সেই বকনা বাছুর আদর যত্নে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে সেই সঙ্গে হাসমত মন্ডলও সফলতার বীজ বপণ করতে থাকেন পালিত বকনা বাছুরের বুকে। বাছুরটা এক সময় গর্ভবতী হয়। সেই ছোট বকনা বাছুরটির কোলজুড়ে আসে একটি কাজল রঙের বকনা বাছুর। শর্তানুযায়ী হাসতম মন্ডল পালিত বকনার থেকে প্রথম যে বাছুর হবে তার মালিকানা পাবেন। দ্বিতীয় বাছুর পাবেন বকনার মালিক জলিল কারিগর। পালিত বকনার প্রথম বাচ্চা বকনা হওয়ায় হাসমত মন্ডলের কপাল যেন খুলে গেলো। তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। গাভীটির দুধ বিক্রি করে কোনো মতে হাসমত মন্ডলের সংসারটা টানাপোড়নের মধ্যে দিয়ে চলতে থাকে। এভাবেই কাটতে থাকে হাসমত মন্ডলের দিন গরু-বাছুর নিয়ে উন্মুক্ত চারণভূমির মাঠে মাঠে।
গরুর খড় ভূষি কেনার পয়সা না থাকায় সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার সময় কাটে গরু চরিয়ে। সকাল বিকাল মোড়ের চায়ের দোকানে যেন এক মিনিটও বসার ফুসরৎ নেই তার। নেই অযথা কারও সঙ্গে দু’দণ্ড দাড়িয়ে বুকের ভেতরে জমানো না বলা কথা বলবার। হাসমত মন্ডল বলেন, আমি একটি ছোট বকনা বাছুর পোষাণি (পালিত) নিয়েছিলাম। সেই বকনা বাছুর থেকে বছর দুয়েক পরে একটি বকনা বাছুর হয়। আমার পাওনা ঐ বকনা বাছুরটি প্রায় তিন বছর পরে একটা বাচ্চার জন্ম দেয়। বকনার প্রথম বাছুরটাও ছিল বকনা বাছুর। পাওনা ঐ বকনা বাছুরটা আল্লাহর রহমতে আমায় আজ পর্যন্ত ১৯টা বাছুর দিয়েছে। ঐ একটি পালিত গরু থেকে আজ আমার পালে ১৭টা গরু রয়েছে।
বর্তমানে আমার পালে ৬টা গাভী রয়েছে। ৬টা গাভী প্রতি বছর একটা করে বাচ্চার জন্ম দেয়। গাভীগুলো প্রতিদিন ১২-১৪ কেজি দুধ দেয়। প্রতিদিন গড়ে ৬০০-৭০০ টাকার দুধ বিক্রি করে থাকে। বছর শেষে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা গরু বিক্রি করে থাকি। হাসমত মন্ডলের ঘরে পাচ সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ের বিয়েতে ৫টা গরু দিয়েছেন উপহার হিসেবে মেয়েকে। এর মধ্যে তিন বিঘা জমিও বন্ধক রেখেছেন। হাসতম মন্ডল আরও বলেন, আমি ছোট বেলা থেকেই বাবার গরু চরিয়ে আসছি। তখন থেকেই বুঝেছিলাম গাভী গরু পালন করা খুবই লাভজনক।
গরুর খাবার কিভাবে যোগান দিয়ে থাকেন জানতে চাইলে হাসমত মন্ডল বলেন, আমি প্রায় সময় গরু মাঠে চরিয়ে থাকি, বাড়ীতে তেমন একটা খাবার দেয় না বললেই চলে। রোদ বৃষ্টি যাই হোক আমি গরু মাঠে চরিয়ে থাকি। কোথাও ঋণী হয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ঋণ দেখলে ভয় পায়, আর ঋণ নেওয়ার কোনো প্রয়োজনও আমার পড়েনা, যখন টাকার খুব বেশি দরকার হয় তখন পাল থেকে একটি গরু বিক্রি করে সেই বড় ধরনের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকি। সংসারের খরচের জন্য তো গাভী থেকে দুধ বিক্রি করে নগদ টাকা পেয়ে থাকি।
আপনার কখনও চায়ের দোকানে বসে বন্ধু বান্ধব প্রতিবেশিদের সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছে হয় না এমন প্রশ্নের জবাবে কঠোর পরিশ্রমি হাসমত মন্ডল বলেন, আমার সেই সময় কোথায় খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে গরুগুলোকে পানি দেই, খাবার দেই। আর দুধের গাভীর থেকে দুধ দোহন করি। সাথে বেলা বাড়ে। এবারে গোসল খাওয়া শেষে গরু চরাতে মাঠে চলে যাই। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত নেমে আসে। সব গরু গোয়ালে তুলে আবার পানি দেই। মশা তাড়াবার জন্য ধোঁয়া দেই। এরপর হাত মুখ ধুয়ে খেতে খেতে প্রায় রাত অর্ধেক হয়ে যায়। এবার বলুন কাজ ফেলে কখন চায়ের দোকানে মোড়ে বসে গল্প করবো গরুর রোগবালাই সর্ম্পকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার গরু রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে এর পরও আল্লাহর রহমতে কোনো রোগবালাই হয় না। ডাক্তার-ওষুধ লাগে না। বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে উন্মুক্ত চারণভূমি দিন দিন সঙ্কুচিত হয়ে আসাটা।