ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

৬ বছর ধরে বন্ধ আমদানি এবার রপ্তানিও বন্ধের পথে

৬ বছর ধরে বন্ধ আমদানি এবার রপ্তানিও বন্ধের পথে

মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নে অবস্থিত চাতলাপুর স্থল শুল্ক স্টেশন। এই স্টেশন দিয়ে প্রায় ছয় বছর ধরে পণ্য আমদানি বন্ধ রয়েছে। এবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে রপ্তানিও। এই রুটে শুধু মাছ ছাড়া আর কোনো পণ্য রপ্তানি হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের ধারণা, নানা সমস্যার কারণে মাছ রপ্তানিও বন্ধ হয়ে যাবে যেকোনো সময়।

জানা যায়, চাতলাপুর স্থল শুল্ক স্টেশন ও অভিবাসন কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয় দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে। একসময় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাশহর ও আগরতলাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আমদানি করা হতো বিভিন্ন ফল, কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হতো এসব আমদানি করা পণ্য। তবে, ২০২০ সালের পর থেকে সেই বাণিজ্য থমকে গেছে। ডলার সংকট ও ট্যাক্স বেড়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় আমদানি। সর্বশেষে ২০২৪ সাল থেকে মাছ ছাড়া আর কিছুই রপ্তানি হচ্ছে না। সময় যত যাচ্ছে আরও কমে যাচ্ছে আমদানি ও রপ্তানি। ফলে আমদানির পর যেকোনো সময় বন্ধ হবে রপ্তানিও।

আমদানি ও রপ্তানি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, ২০২০ সাল থেকে বন্ধ হয় আমদানি আর এখন বন্ধ হচ্ছে রপ্তানি। বছর দুই এক আগেও এ রুট দিয়ে নিয়মিত রপ্তানি হতো মাছ, সিমেন্ট, প্লাস্টিক সামগ্রী, জুসসহ নানা ধরনের পণ্য। তবে, এখন শুধু মাছ ছাড়া আর কিছুই রপ্তানি করা যাচ্ছে না। ডলারের দাম বৃদ্ধি ও ডলার সংকট, অতিরিক্ত ট্যাক্স ও পণ্যের অভাবে রপ্তানি ও আমদানি করা যায় না। আগে সিমেন্ট প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি করা গেলেও এখন ভারত থেকে এগুলো রপ্তানি না করার জন্য নিষেধ করেছে ব্যবসায়ীরা। এছাড়া আগে নিয়মিত বিভিন্ন ফল ও সবজি আমদানি করা হলেও বছরে এখন এক-দুই গাড়ি আদা আমদানি করা হয়।

সরেজমিনে চাতলাপুর শুল্ক স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, এই রুটে নিয়মিত রপ্তানি করতো বিডিএফ অ্যাগ্রো, জারা এন্টারপ্রাইজ, ফাবি এন্টারপ্রাইজ, রিমন ট্রেডার্স, প্রাণ-আরএফএলের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে, ছয় বছর ধরে পণ্য আমদানি বন্ধ হলেও এখন দুই বছর ধরে রপ্তানিও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমদানি বলতে বছর এক দুই বার আদা ও সাতকরা করা হয়। আর গত দুই বছর ধরে শুধু মাছ ছাড়া আর তেমন কিছু রপ্তানি করা হয় না। আমদানি রপ্তানি বন্ধের পেছনে বড় একটা কারণ হলো- সীমান্তে অবকাঠামো দুর্বলতা, মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যা এবং রাস্তার বেহাল দশা। আর এতেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

শুল্ক স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালেও প্রতি মাসে গড়ে ৪০০-৫০০ টন মাছ, ৫০০-৬০০ টন সিমেন্ট, ৫০-৭০ টন প্লাস্টিক পণ্য এবং আরও ৫০-৮০ টনের মতো অন্যান্য পণ্য রপ্তানি হতো। কিন্তু গত দুই বছর ধরে শুধু মাছ ছাড়া আর কিছুই রপ্তানি হচ্ছে না। আর এই রুটে আমদানি প্রায় ৬ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। মাঝে মধ্যে আদা ও সাতকরা আমদানি করা হয়। পূর্ণাঙ্গ বন্দর হলে আমদানি-রপ্তানির পাশাপাশি বদলে যাবে পুরো অঞ্চলের দৃশ্য।

আমদানি ও রপ্তানিকারক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, আমদানি বন্ধের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এরমধ্যে প্রধান কারণ হলো ডলার সংকট, অতিরিক্ত কর এবং ভারতীয় বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য না পাওয়া। আমরা যেসব পণ্য আমদানি করতে চাই, সেসব পণ্য পাওয়া যায় না। একই সাথে রপ্তানি বন্ধের কারণ এগুলো। আমরা চাহিদা অনুযায়ী পণ্য দিতে পারি না।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, চাতলাপুর স্থল শুল্ক স্টেশন ত্রিপুরা রাজ্যের শেষ দিকে হওয়ায় আমদানি ও রপ্তানি কম হয়। দুই দেশের যৌথ আলোচনার মাধ্যমে ট্যাক্স হার কমানো গেলে আবারও আমদানি-রপ্তানি শুরু হতে পারে।

আমদানি ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ফাবি এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি জসিম উদ্দিন বলেন, ডলার সংকটের কারণে আমদানিমূল্য অনেক বেড়ে গেছে। এর কারণে আমদানি করা পুরোটাই বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে মাছ ও প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি করা হতো। তবে, গত দুই বছর ধরে প্লাস্টিক রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কিছু পণ্য ৯৫ রুপি করে ক্রয় করলেও বিক্রি করতে হয়েছে ৮০-৮২ রুপিতে। কারণ ডলার সংকট থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এরজন্য বেশিরভাগ ব্যবসায়ীরা বন্ধ করে দিয়েছেন ব্যবসা।

আমদানি ও রপ্তানির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী রুবেল আহমদ বলেন, চাতলাপুর স্থল শুল্ক স্টেশন দিয়ে আগে নিয়মিত আমদানি-রপ্তানি করা হতো। বিশেষ করে প্লাস্টিক, মাছ, সিমেনসহ অন্যান্য জিনিসপত্র। যত সময় যাচ্ছে, এই স্টেশন দিয়ে বৃহৎ আকারে আমদানি-রপ্তানি করার কথা থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা একেবারে কমে আসছে। এই স্থলবন্দর নিয়ে এখনই ভারত-বাংলাদেশ আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও ব্যবসায়ী নেতা হাসান আহমেদ জাবেদ বলেন, চাতলাপুর স্থল ও শুল্ক স্টেশন পুরোপুরি চালু হলে সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের আমূল পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে ব্যবসায়ীক বন্ধন আরও দৃঢ় হবে। সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামোসহ নানা সমস্যার কারণে আমদানি ও রপ্তানি একেবারে কমে যাচ্ছে। সরকারের কাছে স্থলবন্দরটি পুরোদমে চালু করার দাবি জানান ব্যবসায়ী এই নেতা।

চাতলাপুর শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা মং সাচিং মারমা বলেন, মাছ ছাড়া তেমন কিছু রপ্তানি হয় না। একই সঙ্গে মাঝেমধ্যে আদা ও সাতকরা ছাড়া আর কিছুই আমদানি হয় না। ব্যবসায়ীরা ট্যাক্স বেশি ও ডলার সংকট বলে আমদানি রপ্তানি করছেন না।

এই রুটে আবার সব পণ্য আমদানি-রপ্তানির জন্য আমরা উভয় দেশের মধ্যে চিঠি পাঠিয়েছি। এই রুটে আমদানি-রপ্তানি বাড়লে উভয় দেশের মধ্যে এই অঞ্চলগুলে বাণিজ্যিক অঞ্চল হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত