
কুষ্টিয়া সুগার মিল ১৯৬৫-৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মাড়াই কার্যক্রম শুরুর বেশ কয়েক বছর লাভের মুখ দেখলেও নব্বই দশকের পর ধারাবাহিক লোকসানের মুখে পড়ে মিলটি। পাহাড়সম লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে নিভু নিভু করে চলতে থাকে মিলের উৎপাদন কার্যক্রম। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থ বছরে ৫৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এক সময়ের লাভজনক প্রতিষ্ঠান কুষ্টিয়া চিনিকল। সেই থেকে কুষ্টিয়া চিনিকলের চাকা বন্ধ রয়েছে।
গোঁড়ার দিকে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক হলেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ, চুরি, ট্রেড ইউনিয়ন, দুর্নীতি-অনিয়মসহ নানা কারণে ৯০ দশকের পর থেকে ধারাবাহিক লোকসানের মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। এ ধারাবাহিকতায় আনুষ্ঠানিকভাবে আখ মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ হওয়া পর্যন্ত কুষ্টিয়া চিনিকলের লোকসানের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৬০৬ কোটি ৫ লাখ টাকা। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে দিন দিন রুগ্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপ নেওয়ায় ২০২০-২১ আখ মাড়াই মৌসুম শেষ হওয়ার পর সরকার দেশের ১৫টি সরকারি চিনিকলের মধ্যে কুষ্টিয়াসহ ৬টি চিনিকল বন্ধ ঘোষণা করে। সেই থেকে কুষ্টিয়া চিনিকলের চাকা বন্ধ রয়েছে।
সরেজমিন কুষ্টিয়া চিনিকল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে ৭৫ জন প্রতিষ্ঠানটিতে এখনও কর্মরত রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির চাকা বন্ধ থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে বর্তমানে মিলের জায়গা-জমি এবং পুকুর জলাশয় সাধারণ মানুষের কাছে লিজ দেওয়া ছাড়া কার্যত আর তেমন কোনো কাজ নেই। মিলের প্রায় ২২০ একর জায়গার মধ্যে ১১৩ দশমিক ৩৩ একর জায়গা লিজ বাবদ বছরে মিলের প্রায় ২৭ লাখ টাকা আয় হয়।
এদিকে কুষ্টিয়া চিনিকলের কাছে দীর্ঘদিন ধরে ২০২ জন শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রায় ২৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিক-কর্মচারীদের এই বকেয়া পাওনা টাকা নিয়ে অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে। আবার অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় মিলের প্রায় শত কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ার উপক্রম প্রায়। অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে রয়েছে বছরের পর বছর। এর মধ্যে ২০২১ সালের ৩ জুন রহস্যজনকভাবে কুষ্টিয়া চিনিকলের গোডাউন থেকে ৫২ দশমিক ৭ টন চিনি গায়েব হয়ে যাওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এ ঘটনায় সেদিনই গুদামের স্টোরকিপার ফরিদুল হককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বন্ধ চিনিকলের গোডাউন থেকে বিপুল পরিমাণ এই চিনি গায়েবের ঘটনা, সে সময় দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচিত হয়।
পরবর্তীতে চিনিকলের গুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ এই চিনি গায়েবের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার আসামিরা হলেন- কুষ্টিয়া চিনিকলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আল-আমীন, গুদাম রক্ষক ফরিদুল হক ও সর্দার বশির উদ্দিন।
কুষ্টিয়া চিনিকল পুনরায় চালু করার বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার জানান, মিলটি পুনরায় চালু করার জন্য বর্তমান সরকার যখেষ্ট আন্তরিক। মিলটি চালু করতে হলে মাড়াই মৌসুমে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ হাজার মে: টন আখ লাগবে। বর্তমানে কুষ্টিয়া জেলায় পূর্বের যে সনাতনী পদ্ধতিতে আখ চাষ হচ্ছে তাতে বছরে প্রায় ৪০ হাজার মে: টনের বেশি আখ উৎপাদন হবে না। সেজন্য আমরা উচ্চ ফলনশীল জাতের আখ চাষের জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি। আমরা যদি উচ্চ ফলনশীল জাতের আখ চাষ করতে পারি তাহলে এই ২০০০ একর জমিতেই বছওে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মে. টন আখ উৎপাদন সম্ভব হবে। আশার কথা চলতি বছর অনেক কৃষকই তাদের জমিতে সনাতনী জাতের পরিবর্তে উচ্চ ফলনশীল জাতের আখ চাষ শুরু করেছেন।
কুষ্টিয়া চিনিকলের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সাইফুল ইসলাম জানান, কুষ্টিয়াসহ যেসব চিনিকল বন্ধ রয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করার বিষয়ে সরকারের যথেষ্ট সদিচ্ছা আছে। খোঁজখবর নিয়ে যতটুকু জানতে পেরেছি সরকার এ সব বন্ধ চিনিকল পুনরায় চালু করার বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করছে।