প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ জুন, ২০২৬
ঈদ, পূজা কিংবা বড় ছুটির মৌসুম এলেই দেশের রেলস্টেশনগুলোতে শুরু হয় মানুষের ঢল। ঘরমুখো মানুষের একমাত্র লক্ষ্য, যেকোনো উপায়ে বাড়ি পৌঁছানো আর ছুটি শেষে যথাসময়ে ঢাকায় ফেরা। এই সুযোগকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর আলোচনায় আসে দূরপাল্লার ট্রেনের স্ট্যান্ডিং টিকিট। নীতিমালা অনুযায়ী আসন পূর্ণ হয়ে গেলে মোট ধারণক্ষমতার সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত স্ট্যান্ডিং (দাঁড়িয়ে ভ্রমণের) টিকিট ইস্যু করা যায়, যা শুধু যাত্রা শুরুর দিন স্টেশন কাউন্টার থেকে দেওয়া হয়। কিন্তু এর বাস্তবচিত্র ভিন্ন। নির্ধারিত সীমার অনেক বেশি টিকিট বিক্রি করা হয়, যার একটি অংশ সরকারি হিসাবের বাইরে থেকে যায়। ফলে একদিকে যাত্রীরা অমানবিক ভোগান্তির শিকার হন, অন্যদিকে সরকারও হারায় বিপুল রাজস্ব।
রেলপথ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন ব্যবস্থা। নিরাপত্তা, স্বল্প খরচ এবং তুলনামূলক আরামদায়ক যাত্রার কারণে দূরপাল্লার ভ্রমণে ট্রেনের চাহিদা সবসময়ই বেশি। কিন্তু চাহিদার তুলনায় আসন সংখ্যা কম হওয়ায় বিশেষ সময়ে সৃষ্টি হয় তীব্র সংকট। এই সংকটকে কেন্দ্র করেই স্ট্যান্ডিং টিকিটের ব্যবসা একটি আলাদা অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী কোনো ট্রেনের আসনসংখ্যার ২৫ শতাংশ এর বেশি স্ট্যান্ডিং টিকিট বিক্রির সুযোগ নেই। এর উদ্দেশ্য হলো যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ট্রেনে অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায়, ট্রেনে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীর সংখ্যা বসা যাত্রীর সংখ্যার কাছাকাছি, কখনও কখনও তারও বেশি। করিডোর, দরজার সামনে, বগির সংযোগস্থল এমনকি টয়লেটের আশপাশেও যাত্রীদের অবস্থান করতে দেখা যায়। এটি শুধু অস্বস্তিকর নয়, বরং বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করে।
প্রশ্ন হলো, এই অতিরিক্ত যাত্রীরা কোথা থেকে আসে? অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ ওঠে যে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি স্ট্যান্ডিং টিকিট বিক্রি করা হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে টিকিটবিহীন যাত্রীদের কাছ থেকেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। যেহেতু অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে যাত্রী গণনা করা কঠিন, তাই প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করাও সহজ নয়। এই সুযোগেই অনিয়মের সম্ভাবনা তৈরি হয়। স্ট্যান্ডিং টিকিটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অনিয়মের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ যাত্রী। একটি দূরপাল্লার যাত্রা কখনও কখনও ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময়ের হতে পারে। এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা একজন যাত্রীর জন্য শারীরিকভাবে অত্যন্ত কষ্টকর। শিশু, নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য এটি আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। অনেক সময় টিকিট কেটেও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে ট্রেনে উঠতে পারেন না যাত্রীরা। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে ট্রেনের ভেতরে স্বাভাবিক চলাচলও অসম্ভব হয়ে পড়ে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বের হওয়ার সুযোগ না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে।
এই সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি রাজস্ব। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রতিটি টিকিট বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে যাওয়ার কথা। কিন্তু যদি নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বাইরে অতিরিক্ত টিকিট বিক্রি হয় কিংবা বিক্রিত অর্থের পুরোটা সরকারি হিসাবে জমা না পড়ে, তাহলে সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়ে রাষ্ট্র। একদিকে সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন রেললাইন, আধুনিক কোচ ও সেবার মানোন্নয়নে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে; অন্যদিকে অনিয়মের কারণে সম্ভাব্য আয় হারালে সেই উন্নয়ন প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থনীতির ভাষায় এটি শুধু দুর্নীতি নয়, বরং সম্পদের অপচয়। কারণ একটি ট্রেনের ধারণক্ষমতা পরিকল্পনা করা হয় নিরাপত্তা, আরাম ও পরিচালনাগত সক্ষমতার ভিত্তিতে। যখন সেই সীমা অতিক্রম করা হয়, তখন রেলব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। বগির ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে, পরিষেবা ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদি কিছু ব্যক্তিগত লাভের বিনিময়ে পুরো ব্যবস্থাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো- জবাবদিহির অভাব। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীরা অভিযোগ করলেও তার কার্যকর তদন্ত বা দৃশ্যমান ব্যবস্থা দেখা যায় না। ফলে একই ধরনের অনিয়ম বছরের পর বছর চলতে থাকে। যখন কোনো ব্যবস্থায় শাস্তির ভয় কমে যায়, তখন অনিয়ম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। রেল খাতের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রযুক্তির অগ্রগতির এই যুগে এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকা প্রশ্নের জন্ম দেয়। বর্তমানে টিকিট বিক্রির অধিকাংশ ব্যবস্থাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা সম্ভব। প্রতিটি বগির ধারণক্ষমতা, বিক্রিত আসন, স্ট্যান্ডিং টিকিটের সংখ্যা এবং যাত্রীর তথ্য রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা গেলে অনিয়মের সুযোগ অনেকাংশে কমে আসতে পারে। একই সঙ্গে টিকিট বিক্রির তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করলে স্বচ্ছতাও বৃদ্ধি পাবে।
সমস্যার মূল কারণ শুধু কিছু অসাধু কর্মচারী নয়; বরং চাহিদা ও সরবরাহের দীর্ঘদিনের বৈষম্যও এর জন্য দায়ী। ঈদের সময় কয়েক কোটি মানুষ যাতায়াত করলেও ট্রেনের সংখ্যা ও আসন সেই তুলনায় খুবই সীমিত। ফলে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় বিশেষ ট্রেন বৃদ্ধি, অতিরিক্ত কোচ সংযোজন এবং দীর্ঘমেয়াদে রেলসেবার সম্প্রসারণ প্রয়োজন। রেলওয়ে যদি সত্যিই জনগণের প্রতিষ্ঠান হতে চায়, তাহলে প্রথমেই তাকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কারণ ট্রেনের করিডোরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো শুধু যাত্রী নয়; তারা এই দেশের নাগরিক, তারা করদাতা, তারা রাষ্ট্রের মালিক। তাদের কষ্টকে অবহেলা করার অধিকার কারও নেই।
তবে চাহিদা বেশি হওয়া কখনোই নিয়ম ভাঙার বৈধতা দিতে পারে না। কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব জনগণের আস্থা রক্ষা করা। যদি নিয়ম অনুযায়ী ২৫ শতাংশ স্ট্যান্ডিং টিকিট বিক্রির অনুমতি থাকে, তবে সেটিই কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। এর বাইরে অতিরিক্ত টিকিট বিক্রি হলে তার প্রতিটি হিসাব স্বচ্ছভাবে নথিভুক্ত করতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। রেল শুধু একটি পরিবহন মাধ্যম নয়; এটি সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক। একজন কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র কিংবা চাকরিজীবী; সবার কাছে ট্রেন একটি নির্ভরতার নাম। সেই ব্যবস্থার ভেতরে যদি অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি কিংবা অবৈধ অর্থ লেনদেনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু কিছু যাত্রী নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা।
আজ প্রশ্ন একটাই, স্ট্যান্ডিং টিকিটের এই রমরমা ব্যবসা আসলে কার স্বার্থে? যদি এর বোঝা বইতে হয় সাধারণ মানুষকে, যদি এর ফলে রাজস্ব হারায় রাষ্ট্র, যদি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে যাত্রী, তাহলে লাভবান হচ্ছে কে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সময়ের দাবি। কারণ নীরবতা যত দীর্ঘ হবে, অনিয়ম তত শক্তিশালী হবে; আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই সাধারণ মানুষ, যে প্রতি ঈদে শুধু একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক যাত্রার স্বপ্ন দেখে। একটি সভ্য রাষ্ট্রে নাগরিক কখনোই পরিবহন ব্যবস্থার কাছে জিম্মি হতে পারে না। এভাবে গাদাগাদি করে পশুর মতো পরিবহন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একজন নাগরিক হিসেবে তার মর্যাদা আছে, তার অধিকার আছে, তার নিরাপদ যাত্রার নিশ্চয়তা পাওয়ার অধিকার আছে।
দূরপাল্লার ট্রেনে স্ট্যান্ডিং টিকিটের রমরমা ব্যবসা তাই কেবল অতিরিক্ত ভিড়ের গল্প নয়। এটি প্রশাসনিক দুর্বলতা, জবাবদিহির সংকট, সম্ভাব্য রাজস্ব অপচয় এবং যাত্রী অধিকার লঙ্ঘনের একটি বড় প্রতিচ্ছবি। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ হিসাবরক্ষণ এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা। অন্যথায় প্রতি ঈদেই আমরা একই দৃশ্য দেখব অতিরিক্ত ভিড়ে নাকাল যাত্রী, নিয়মের অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রের অদৃশ্য আর্থিক ক্ষতি; আর স্ট্যান্ডিং টিকিটের সেই ‘রমরমা ব্যবসা’ চলতেই থাকবে।
আরিফুল ইসলাম রাফি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়