ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

যশোরে পটোলের দামে ধস, কেজি পাঁচ টাকা

যশোরে পটোলের দামে ধস, কেজি পাঁচ টাকা

অস্বাভাবিক ধস নেমেছে পটোলের দামে। মাঠ থেকে পটোল সংগ্রহ করে পাইকারি বাজারে নিয়ে গিয়ে মাত্র পাঁচ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে চাষীদের। দুই সপ্তাহ আগেও যে পটলের দাম ৪০-৪৫ টাকা কেজি ছিল, তা এখন মাত্র পাঁচ টাকা। পটলের অস্বাভাবিক এই দরপতনে, খেত থেকে তোলা বন্ধ করে দিয়েছেন কোনো কোনো কৃষক। এতে মাঠেই পেকে পচে নষ্ট হচ্ছে অনেকের প্রিয় এই সবজি। আবার কেউ কেউ খেতে উৎপাদিত পটল তাদের গরুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করছেন। পটলের মূল্যহ্রাসে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষীরা। তবে খুচরা বাজারে পটল ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে দেখা গেল। পাইকারী থেকে খুচরা বাজারের মধ্যে কেন এই ফারাক? প্রশ্নের উত্তর খোজার জন্য সরেজমিন মাঠ পরিদর্শনে গিয়ে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে সাক্ষাত হয়।

যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের নতুনহাট কলেজ সংলগ্ন বড় মেঘলা গ্রামের মাঠে গিয়ে কথা হয় পটল চাষি বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘১৩ কাঠা জমিতে পটল চাষ করেছি। ফলনও হয়েছে খুব ভাল। ঝিকরগাছার বেনেয়ালি বাজারের আড়তে পটল বিক্রি করি। ৫-৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে পটল। পটল তোলা, শ্রমিক খরচ, যাতায়াত খরচ করে এই পটল বাজারজাত করতে গিয়ে আরও বেশি লোকসান হচ্ছে। দাম কমে যাওয়ায় তিন চালান পটল তোলা বন্ধ করে দিয়েছি। এতে আমরা ক্ষতির মুখে পড়েছি।

দাম নিম্নমুখী হওয়ার কারণ কি জানতে চাইলে তিনি প্রকৃত কারণ বলতে না পারলেও আশঙ্কা করলেন মধ্যসত্ত্বভোগীদের কারসাজির। তিনি বলেন, আমাদের মাঠে চারজন চাষি পটল চাষ করেছি। খুব বেশি যে আমদানি পটল হয়েছে তাও না। কুরবানি ঈদের দশ দিন আগে থেকেই এই দরপতন বলে উল্লেখ করেন তিনি। দম কমের কারণে আর পটল তুলি না। মাঠেই পেকে নষ্ট হচ্ছে এক সময়ের দামি এই সবজি।

সাত আট মাসে ১৩ কাটা জমিতে পটল চাষে ৮০-৮৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ৫৫-৬০ হাজার টাকার বিক্রি করতে পেরেছেন বিল্লাল। যশোর অঞ্চলের সবজির বড় মোকাম বারীনগর সাত মাইল বাজারেও ৫-৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে বলে খোজ নিয়ে জেনেছেন। বিক্রিতে লোকসান হওয়ায় পটল তুলে বস্তায় ভরে গরুকে খাওয়াচ্ছি।

ইসলাম মোল্লা নামে আরেকজন চাষি বলেন, আমি ১৫ কাটা জমি লিজ নিয়ে পটল চাষ করেছি। পাঁচ টাকা কেজি দরে বর্তমানে পটল বিক্রি করছি। সর্বশেষ ১৫ মণ পটল বাজারে নিয়ে গিয়েছি। ২০০ টাকা মন করে বিক্রি করেছি। তবে এবার হাটে গাড়ি ভাড়া দিয়ে নিজের পকেট ২০০ টাকা লোকসান হয়েছে বলে জানালেন ইসলাম মোল্লা।

কুরবানি ঈদের আগে অর্থাৎ মে মাসের ১০-১৫ তারিখের মধ্যে পটলের পাইকারি দাম পেয়েছেন সর্বোচ্চ ৪০-৪৫ টাকা কেজি। সেই পটল এখন মাত্র পাঁচ টাকা কেজি। এতে চরম হতাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

সপ্তাহে ১৮০০-২০০০ টাকা খরচ হয় জমি পরিচর্যায়। লিজ নিয়ে যে পরিমান খরচ করেছেন সেই টাকা তুলতে তার হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই গ্রামের সব পটল চাষির একই অবস্থা বলে জানালেন তারা।

দেখা গেল পটল ক্ষেতের পাশেই মরিচ, বেগুন ও পুইশাক চাষ শুরু করেছেন তারা। তারা বলেন, কেজিতে ১৫ টাকা করে পেলেও লোকসান হবে না। তবে পটলের এরকম অস্বাভাবিক দরপতন নিকট অতিতে হয়নি। সরকারের কাছে কৃষকদের দাবি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষে খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ন্যায্য দাম প্রাপ্তিতে সরকারকে ভূমিকা রাখার দাবি তাদের। এদিকে শহরের বড় কাঁচাবাজারে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি দোকানে পটল রয়েছে। খুচরা বিক্রেতারা ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। শহরের রেলরোড কাঁচাবাজারে খুচরা বিক্রেতাদের কেউ ১০ টাকা কেজি, কেউ ১৫-২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। রেলরোডের চুন্নু নামে এক বিক্রেতা বলেন, পটলের আমদানি বেশি। মানুষ খাচ্ছে কম। তাই হয়তো দাম কম। চাঁচড়া বাজারের সবজি বিক্রিতাদের ২০ টাকা কেজি দরে পটল বিক্রি করতে দেখা গেল। তাদের কাছে জানতে চাইলে, পাইকারি বাজার থেকে ১০ টাকা কেজি দরে কিনেছেন বলে জানালেন।

অর্থাৎ মাঠ থেকে খুচরা পর্যায়ে পটলের দামে প্রায় ১৫ টাকার পার্থক্য পাওয়া গেল। মধ্যসত্বভোগীদের পকেটে যাচ্ছে সিংহভাগ টাকা। কৃষকরা পাচ্ছেন যত সামান্য। বাজারের এই অসামঞ্জস্য পার্থক্যে চরম হতাশ চাষি। তারা এই অবস্থার প্রতিকার চান। তা না হলে পটল চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাজারে বিক্রিতারা পটলের দাম কমার কারণ জানতে চাইলে বলেন, ঈদের আগ থেকে পটলের দাম নিম্নমুখি। আমদানি বেশি, চাহিদা কম। তাই দামের এই অবস্থা বলে দাবি বিক্রেতাদের।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত