
পটুয়াখালীর দশমিনায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলে জলজ প্রাণী, মৎস্য সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অভিযান শুরু করেছে বন-বিভাগ। উপজেলা বন-বিভাগ চরহাদী ও চর হায়দার ফরেস্ট ক্যাম্পের উদ্যোগে অভিযান পরিচালনা করে ছোট-বড় অন্তত ১৬টি অবৈধ বাঁধ অপসারণ করেন। দীর্ঘদিন ধরে বনাঞ্চলের বিভিন্ন খালে দুষ্কৃতকারীদের নির্মিত এসব বাঁধ খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল বলে জানা গেছে।
বন-বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চরহাদী ফরেস্ট ক্যাম্পের আওতাধীন লালচর, কাউয়ার চর ও মাঝের চরে এলাকায় নিয়মিত টহল ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনার সময় বনাঞ্চলের অভ্যন্তর এবং সংলগ্ন বিভিন্ন খালে অবৈধভাবে নির্মিত একাধিক বাঁধের অস্তিত্ব শনাক্ত করে। পরে গত মঙ্গলবার, বুধবার ও বৃহস্পতিবার অভিযান পরিচালনা করে বড় বাঁধ তিনটি ও ছোট শাখা খালে ৬টিসহ মোট ৯টি অবৈধ বাঁধ কেটে অপসারণ করা হয়। এছাড়াও উপজেলার চর হায়দার ফরেস্ট ক্যাম্পের আওতায় চর হায়দার ও চর আজমাইন এলাকার বনাঞ্চ থেকে বড় বাঁধ ৩টি ও শাখা খালের ছোট বাঁধ ৪টিসহ মোট ৭টি অবৈধ বাঁধ কেটে অপসারণ করা হয়েছে। দুই ক্যাম্পের আওতায় মোট ১৬টি অবৈধ বাঁধ কেটে অপসারণের ফলে খালের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। বন-বিভাগ সূত্রে আরও জানা যায়, বাঁধগুলোর কারণে খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। এতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জলজ প্রাণী, মৎস্য সম্পদ এবং বনাঞ্চলের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে বন-বিভাগের সদস্যরা তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে লালচর, কাউয়ার চর ও মাঝের চর এলাকার বিভিন্ন খালে নির্মিত সকল অবৈধ বাঁধ অপসারণ করা হয় এবং বাঁধ কেটে দিয়ে খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করা হয়।
এবিষয়ে বন-বিভাগের চরহাদী ফরেস্ট ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস হোসেন জানান, এসব বাঁধ নতুন নয়, প্রায় ৫ থেকে ৭ বছর আগে স্থানীয়ভাবে মাছ আহরণের উদ্দেশ্যে এগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। সাধারণত প্রতি বছর শীত মৌসুম শেষে স্থানীয় জনগণ মাছ ধরার কার্যক্রম শেষ করে বাঁধগুলো অপসারণ করে দেয়। কিন্তু বর্ষা মৌসুম শুরু হলে পুনরায় একই স্থানে বাঁধ নির্মাণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জন্য উদ্বেগজনক।
স্থানীয়দের মতে, বন-বিভাগের এই উদ্যোগের ফলে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসবে এবং উপকূলীয় বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
এবিষয়ে বন-বিভাগ দশমিনার রেইঞ্জ কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, অবৈধ বাঁধ অপসারনে বন-বিভাগের সদস্যদের অভিযান চলাকালে ঘটনাস্থলের স্থির আলোকচিত্র সংরক্ষণ করেছেন। একই সঙ্গে অবৈধ বাঁধ নির্মাণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিয়মিত টহল, নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে বন ও জলজ সম্পদ সংরক্ষণে সচেতন করা এবং অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
এবিষয়ে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোফরেস্ট্রি বিভাগ ও ক্লাইমেট-স্মার্ট এগ্রিকালচার বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. মো. আলমগীর কবির বলেন, উপকূলীয় বনাঞ্চলের খালগুলো জোয়ার-ভাটার পানির স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও কাঁকড়াসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন ও বিচরণের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। এসব খালে অবৈধ বাঁধ নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে পুরো বাস্তুুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।