ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০১ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০১ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন

উচ্চশিক্ষাকে যুগোপযোগী, কর্মমুখী ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার অঙ্গীকার নিয়ে গাজীপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮তম সিনেট অধিবেশন-২০২৬। গতকাল শনিবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে অনুষ্ঠিত এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সিনেট চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এএসএম আমানুল্লাহ। অধিবেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে আধুনিক, দক্ষতাণ্ডভিত্তিক ও কর্মমুখী শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।

তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানের অ্যাপ্রেন্টিসশিপ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে আগামী দিনে ৫০ হাজার শিক্ষানবিশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক কর্মবাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলতে মাল্টি ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং ইনস্টিটিউটের (এমএলএলআই) মাধ্যমে মান্দারিন, জাপানি, কোরিয়ান, আরবি, ইতালীয়, স্প্যানিশ ও ফরাসি ভাষা শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, সিলেবাস সংস্কার, শিক্ষক প্রশিক্ষণের আধুনিকায়ন, স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি ও আইসিটি কোর্স বাধ্যতামূলককরণ এবং নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা সম্প্রসারণে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কর্মসূচির আওতায় দেশব্যাপী খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তুলতে ‘গ্রিন ক্যাম্পাস’ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে দুই কোটি গাছ রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দেশের পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। অধিবেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. এটিএম জাফরুল আযম ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের মূল বাজেট এবং ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট উপস্থাপন করেন। সিনেট সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে ৮০১ কোটি ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকার মূল বাজেট এবং ৬৬৪ কোটি ৮ লাখ ৪১ হাজার টাকার সংশোধিত বাজেট অনুমোদন করা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৬১৭ কোটি ১৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৮৩ কোটি ৯০ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২৫ কোটি ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা এবং ঘাটতি রয়েছে ৩৯ কোটি ৫ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। সিনেট চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এএসএম আমানুল্লাহ তার অভিভাষণে বলেন, বর্তমান বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। এই বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু ডিগ্রি প্রদান নয়; বরং এমন প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে এবং ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ে উঠবে এমন এক প্রজন্মের হাত ধরে, যারা কেবল তথ্যের ধারক নয়, বরং জ্ঞান সৃষ্টিকারী; যারা চাকরি প্রার্থী নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী; যারা পরিবর্তনের শিকার নয়, বরং পরিবর্তনের নেতৃত্বদানকারী।

সিনেট চেয়ারম্যানের অভিভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সিনেট সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। তারা বিভিন্ন গঠনমূলক পরামর্শ প্রদান করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়ন ও মানোন্নয়নের উদ্যোগ বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। অধিবেশনের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে কার্যক্রমের সূচনা হয়। পরে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্মরণে শোক প্রস্তাব উত্থাপন ও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। তাদের স্মরণে উপস্থিত সদস্যরা এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। অধিবেশনে সিনেট সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সংসদ সদস্য ইমরান আহমেদ চৌধুরী, ওয়ারেস আলী মামুন, আবুল হোসেন খান এবং জি এম সিরাজ উপস্থিত ছিলেন। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ এবং বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। এছাড়া অনলাইনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক এবং বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় কমিশনাররা যুক্ত ছিলেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফসহ প্রায় ৭০ জন সিনেট সদস্য, সিন্ডিকেট সদস্য, ডিন, রেজিস্ট্রার, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানরা অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন। উচ্চশিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম প্রজন্ম গঠনের প্রত্যয়ে অনুষ্ঠিত এই সিনেট অধিবেশন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রায় নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত