ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জামায়াতের উদ্বেগ

কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জামায়াতের উদ্বেগ

খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়েই চলেছে কক্সবাজারে। বিশেষ অভিযান পরিচালিত হলেও জেলায় অপরাধ প্রবণতা কমছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে মানবপাচার ও মাদক কারবারও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বড় বড় ইয়াবার চালান জব্দ হলেও মূল গডফাদাররা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কক্সবাজার জেলা শাখা। গতকাল সোমবার কক্সবাজার শহরের হাসপাতাল সড়কে দলীয় কার্যালয়ে কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে জেলা জামায়াত।

সভায় ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ কক্সবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, দেশের মানুষের প্রত্যাশিত পরিবর্তন বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করা হচ্ছে না বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

তার ভাষ্য, নির্বাচন-পরবর্তী শাসন ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের পরিবর্তে আগের ধারা বহাল রয়েছে। তিনি বলেন, কক্সবাজারের উন্নয়নে চলতি বাজেটে সুনির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি, যা সরকারের অদক্ষতার পরিচায়ক। প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার সফরে এলেও জেলার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কোনো ঘোষণা না থাকায় স্থানীয়রা হতাশ হয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। হামিদ আযাদ বলেন, সোনাদিয়ায় ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পরিকল্পিত উন্নয়ন ছাড়া কক্সবাজার কিংবা দেশের টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে কক্সবাজার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হতে পারে। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে জাতীয় রাজস্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব। জ্বালানি হাব, অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিদ্যুৎ, জিরকন, ব্লু-ইকোনমি ও পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কক্সবাজারকে বাজেটে উপেক্ষা করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। সরকার স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও নিয়ন্ত্রণে আনছে বলে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা বজায় থাকা জরুরি। কক্সবাজারের উন্নয়ন পরিকল্পনা স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত না করেই ঢাকায় বসে করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন হামিদ আযাদ। তিনি বলেন, শহরে এসটিপি না থাকায় জলাবদ্ধতা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। নিরাপত্তা ও যোগাযোগ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা পর্যটকদেরও ভোগান্তিতে ফেলছে।

কক্সবাজার-৩ আসনের প্রার্থী শহিদুল আলম বাহাদুর বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার কক্সবাজার। এবারের বাজেটেও আশার প্রতিফলন নেই। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।

তিনি বলেন, শহরে একাধিক হত্যাকাণ্ড, আদালত চত্বরে গুলিবর্ষণ এবং নানা সহিংস ঘটনা প্রমাণ করে নিরাপত্তাহীনতা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। জেলার ২৮ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা জেলা সদর হাসপাতাল ৫০০ শয্যায় উন্নীতের ঘোষণা পেলেও বাস্তবায়ন হয়নি। এতে স্বাস্থ্যসেবায় দুর্ভোগ বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, নবগঠিত ঈদগাঁও উপজেলা-তে পাঁচ বছরেও স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় পৃথক ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও ঈদগড়-ঈদগাঁও সড়কে ডাকাতি রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা প্রয়োজন। কক্সবাজার-১ আসনের প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, জাতীয় রাজস্বে বড় অবদান রাখা সত্ত্বেও কক্সবাজার উন্নয়ন বঞ্চিত। জেলার উন্নয়ন পরিকল্পনায় সাধারণ মানুষের মতামত প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।

তিনি কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা, চকরিয়ায় যানজট নিরসনে বিকল্প সড়ক বা ফ্লাইওভার নির্মাণ এবং মাতামুহুরী উপজেলা ভবন সুবিধাজনক স্থানে নির্মাণের দাবি জানান।

কক্সবাজার-৪ আসনের প্রার্থী ও জেলা আমীর নুর আহমদ আনোয়ারী বলেন, সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ ও উখিয়া অপহরণ, হত্যা ও পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, সীমান্ত দিয়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও অস্ত্র প্রবেশ করছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গত ছয় মাসে কক্সবাজারে ৬৮ জন খুন এবং ৪২ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন মুফতি হাবিব উল্লাহ, জেলা সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন, আল আমিন মো. সিরাজুল ইসলাম ও কামরুল হাসানসহ জেলা জামায়াতের নেতারা।

এদিকে, কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে জেলায় ২ কোটি ৭৬ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭৬ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ২ হাজার ২৭৭ জন গ্রেপ্তার এবং ১ হাজার ৬৮৭টি মামলা দায়ের করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ ১৭ হাজার ২৯৩ পিস ইয়াবা। এ সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৮৯২ জন এবং মামলা হয়েছে ৭০১টি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) মো. অহিদুর রহমান বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। শুধু বাহক নয়, অর্থ জোগানদাতাদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে কক্সবাজারে ৪৩ লাখ ২১ হাজার ৮৬৪ পিস ইয়াবা, ৫.২৫০ কেজি আইস, ৪০.৩ কেজি গাঁজা ও ৬৩ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আটক হয়েছেন ১৯৮ জন। জব্দকৃত মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য ২৪২ কোটি ৬১ লাখ ২১ হাজার ৫০০ টাকা।

কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা সাব্বির আলম সুজন বলেন, মাদক পাচার রোধে অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে এবং সীমান্ত ও উপকূলীয় অঞ্চলে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

তবে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দের পরও সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের চেষ্টা অব্যাহত থাকায় উদ্বেগ রয়ে গেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক তালিকা অনুযায়ী, কক্সবাজারে ১ হাজার ১৫১ জন মাদক কারবারির নাম রয়েছে। এর মধ্যে ৯১২ জনই টেকনাফের বাসিন্দা। তালিকাভুক্ত শীর্ষ ৭৩ ইয়াবা কারবারির মধ্যে ৬৫ জনের অবস্থানও টেকনাফে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত