ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যশোর আইসিটি অফিস

বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যশোর আইসিটি অফিস

জেলা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর (আইসিটি) বিভাগ মূলত জেলায় ডিজিটাল গভর্নেন্স বাস্তবায়ন, প্রযুক্তি নির্ভর মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আইসিটি অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ করছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের যশোর জেলা কার্যালয়টি সরকারি এমএম কলেজ সংলগ্ন, শহরের খড়কির শাহ আব্দুল করিম রোডের একটি ভাড়া বাসায়। তরুণদের জন্য আইটি প্রশিক্ষণ, ফ্রিল্যান্সিং এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা, জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ও ভাষা প্রশিক্ষণ ল্যাব স্থাপন করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে নানা আইসিটি সেবা প্রদান করছে প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যমতে, দেশে ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ১৯ লাখে। এই সংখ্যা যেমন দিনকে দিন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা। ইন্টারনেট ভিত্তিক কাজ করে অনেক তরুণ তরুণী এবং বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ অর্থ উপার্জন করছেন। কেউ ইন্টারনেট ভিত্তিক ব্যবসা (ই-কমার্স), ফেসবুক ভিত্তিক ব্যবসা (এফ কমার্স), ফ্রিল্যান্সিং, ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক, ইনাস্টাগ্রাম, লিংকডিনসহ অসংখ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে এবং অনলাইন প্লাটফর্মে পেশাদার কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে কাজ করছেন। অনলাইন ভিত্তিক পেশার পরিধি দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পেশার বাইরে শখে বা ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটাতে মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছেন। এসব ক্ষেত্রে নানা রকম সমস্যার সম্মুখিন হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সমস্যা সমাধানে বেসরকারি বা ব্যক্তিপর্যায়ে সহযোগিতা পেতে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। অনেকে এসব মাধ্যম ব্যবহার করতে গিয়ে ব্লাক মেইলিং, হয়রানি, ডিজিটাল বুলিং, হ্যাকিংয়ের শিকার হচ্ছেন। কাউকে আবার হুমকি ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। ছবি বা ভিডিও এডিট করে কারো কারো চরিত্র হনন করা হচ্ছে। গোপন ভিডিও বা ছবি আপলোড করে পরিকল্পিত সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে। এতে সমাজে আত্মহত্যার মত ঘটনাও ঘটছে। অনেক নির্দোষ নিরাপরাধ মানুষকে এভাবে অপরাধের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। কারো সাইট হ্যাক করে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এরমধ্যেও গড়ে উঠেছে প্রতারক চক্র। অনলাইনেই ‘ঘরে বসে আয় করুন’ নাম দিয়ে চমকপ্রদ বিজ্ঞাপনে প্রতারণার ভয়ঙ্কর ফাঁদ পাতা হচ্ছে। না বুঝে এসব ফাঁদে পড়ে সর্বশান্ত হচ্ছে মানুষ। প্রতারক চক্রটির প্রধান টার্গেট স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় মাদ্রাসা পড়য়া শিক্ষার্থীরা।

গত ৮ জুলাই বুধবার যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক নতুন সকালের বার্তা পত্রিকায় ঘরে বসে আয় করার প্রলোভনে কলেজ ছাত্রীর দেড় লাখ টাকা উধাও শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা যায়, যশোর সরকারি এমএম কলেজে অধ্যয়নরত ওই ছাত্রীকে ফেসবুকে অনলাইন শপিং প্লাটফর্মে কাজের সূত্রে হোয়াটসঅ্যাপ থেকে টেলিগ্রাম গ্রুপে ফাঁদে ফেলা হয়। সেখানে ধাপে ধাপে তার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্র। এ ঘটনায় কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছেন ওই শিক্ষার্থী। এ ধরনের অনলাইন ভিত্তিক সমস্যা সমাধানে পরাপর্শ এবং কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করছে জেলা আইসিটি বিভাগ।

জেলা আইসিটি অফিসার প্রকৌশলী আবুল কাসেম বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সারদের স্বীকৃতি প্রদানে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এরঅংশ হিসেবে ৫৭৫টি আবেদনের মধ্যে ৩২০ জন ফ্রিল্যান্সারকে তাদের পেশাগত সনদপত্র ও আইডি কার্ড প্রদান করা হয়েছে। এতে ফ্রিল্যান্সাদের ব্যাংক লোন প্রাপ্তি, সঠিক সংখ্যা নিরুপন সহজ হবে।’

তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে যেকোনো নাগরিককে সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির অধিনে জেলা শাখা অফিস হিসেবে আমরা সেবা প্রদান করছি। অনলাইন ফ্যাক্ট চেকিংয়েও আমরা সহয়তা প্রদান করছি।’ সাইবার বুলিং, সাইবার নিরাপত্তায় সচেতনতায় আমরা নাগরিককে বিনামূল্যে পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করছি। এই সেবা সম্পর্কে ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে অবহিত করতে ওয়েব সাইট ও ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছে। এছাড়া আমাদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামে আমরা এ সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করছি।

নতুন ফ্রিল্যান্সারদের তাদের কাজের সুবিধার্থে সাইট সম্পর্কে সঠিক ধারণা প্রদান করা হয় বলেও জানান আইসিটি অফিসার।

আইসিটি অফিসার আরও বলেন, জেলায় ১৯৭টি প্রতিষ্ঠানে আইসিটি ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ছয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্কুল অব ফিউচার ও রোবটিক্স কর্ণার স্থাপন করা হয়েছে। এগুলো হলো- যশোর সদরে মধুসূদন তারাপ্রসন্ন বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঝিকরগাছার সম্মিলনী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, বাঘারপাড়ার চন্ডিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কেশবপুরে সুফলাকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শার্শা সরকারি পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মণিরামপুর গোপালপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এই রোবটিক্স কর্ণার থেকে শিক্ষার্থীরা শুধু রোবট তৈরিই শিখবে না, তারা থ্রি ডি প্রিন্টারসহ বিভিন্ন নতুন বিষয় শিখতে পারবে। কেশবপুর সাতটি উপজেলায় আইসিটি সেবা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলমান। এরইমধ্যে শার্শা এবং মণিরামপুরে এই কেন্দ্র স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তিনি।

ভবিষ্যতে আইসিটি বিভাগ থেকে দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের ডিজিটাল কনটেন্ট শিল্প সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের তরুণদের ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির দক্ষতা উন্নয়ন করা হবে। গ্রাফিক ডিজাইন, অ্যানিমেশন, ভিডিও এডিটিং, গেম ডেভেলপমেন্ট এবং মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট তৈরির প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এর ফলে দেশে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল কনটেন্ট ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠবে এবং ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ডিজিটাল কনটেন্ট রপ্তানির সুযোগও বাড়বে। ডিজিটাল অপর্চুনিটি ফর ইয়ুথ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আইসিটিডি ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন প্রকল্প, স্মার্ট সার্ভিস পয়েন্ট (এসএসপি) স্থাপন করা হবে।

বর্তমানে জেলা আইসিটি কার্যালয়ে একজন অফিস প্রধান হিসেবে একজন আইসিটি অফিসার (প্রোগ্রামার) রয়েছেন। সহকারি নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার রয়েছেন একজন। একজন কম্পিউটার অপারেটর, একজন টেকনিশিয়ান ও একজন অফিস সহায়ক কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া জেলার আওতাধীন আটটি উপজেলায় আইসিটি কার্যালয় রয়েছে। ১২০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি রয়েছে। যশোর জেলায় ১৯৭টি আইসিটিডি ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। যশোর জেলার আওতাধীন উপজেলাতে ১২২০টি প্রাইমারি ও এমপিওভুক্ত স্কুলে ফ্রি ইন্টারনেট কানেকশন স্থাপন করা হয়েছে।

যশোর শহরে অবস্থিত মধুসূদন তারাপ্রসন্ন বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ খায়রুল আনাম বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানে আইসিটি বিভাগের কার্যক্রম ১২ আনা সচল রয়েছে। প্রজেক্ট শেষ হওয়া সাপেক্ষে সয়ংক্রিয় হাজিরা (অটো অ্যাটেন্ডেন্স) সিস্টেমটি বন্ধ রয়েছে। নতুন প্রজেক্ট পাশ হলে এটি চালু হবে। এমএসটিপি স্কুল অ্যান্ড কলেজে আইসিটি বিভাগের উদ্যোগে স্কুল অব ফিউচার ও রোবটিক্স কর্ণার স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ১৭টি ল্যাপটপসহ একটি ডিজিটাল ল্যাব রয়েছে। যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণ পাচ্ছে। অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণিতে ৬টি স্মার্ট বোর্ড রয়েছে। যে বোর্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা ভালভাবে শিখতে পারছে। আরও ২৮টি স্মার্ট বোর্ড প্রয়োজন। অধ্যক্ষ বলেন, অতি সম্প্রতি আমাদের প্রতিষ্ঠান ভিজিট হয়েছে। শিঘ্রই শিক্ষার্থীদের সয়ংক্রিয় হাজিরা সিস্টেম চালু হবে। আইসিটি বিভাগের এসব প্রশংসনীয় উদ্যোগের ফলে শিক্ষাদান পদ্ধতি সহজ ও আকর্ষণীয় হচ্ছে বলে মন্তব্য করে তিনি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত