
গর্ভধারণের শুরু থেকেই ঠাকুরগাঁও মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে নিয়মিত চিকিৎসা নেন জেলার অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারের গর্ভবতী নারী। চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে তাদের আশা ছিল, সরকারি এই প্রতিষ্ঠানেই নিরাপদে জন্ম হবে তাদের সন্তানের। কিন্তু প্রসববেদনা নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর পরই ভেঙে যায় সেই স্বপ্ন।
চিকিৎসকরা জানান, স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব নয় জরুরি সিজারিয়ান করতে হবে। অথচ অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় গত চার মাস ধরে কেন্দ্রটিতে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে সিজারিয়ান কার্যক্রম। ফলে প্রসূতিদের অন্য হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছে। সীমিত আয়ের পরিবারের জন্য এই সিদ্ধান্ত যেন নতুন এক দুর্ভোগের নাম।
এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা গর্ভবতী বিলকিস বেগম। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই এখানে চিকিৎসা নিয়েছি। ভেবেছিলাম সরকারি হাসপাতালে বিনা খরচে সন্তান জন্ম দিতে পারব। এখন বলছে সিজার হয় না, বাইরে যেতে হবে। আমরা নিম্নবিত্ত মানুষ, এত টাকা খরচ করার সামর্থ্য নেই।
বিলকিস বেগমের মতো একই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন আরও শত শত অন্তঃসত্ত্বা নারী। অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞের অভাবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ঠাকুরগাঁও মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে সিজারিয়ান সেবা বন্ধ রয়েছে। ফলে যেসব প্রসূতির স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হচ্ছে না, তাদের বাধ্য হয়ে অন্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, একসময় রোগীতে পরিপূর্ণ থাকা কেন্দ্রটির ওয়ার্ডগুলো এখন অনেকটাই ফাঁকা। অপারেশন থিয়েটারেও নেই কোনো কর্মচাঞ্চল্য। সিজারিয়ান সেবা বন্ধ থাকায় দিন দিন রোগীর সংখ্যা কমছে। অনেক অন্তঃসত্ত্বা শুরু থেকেই অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিলকিস বেগমের বাবা বলেন, সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা হবে ভেবেছিলাম। এখন বাইরে যেতে বলছে। বেসরকারি হাসপাতালে সিজার করতে অনেক টাকা লাগে, যা আমাদের মতো মানুষের পক্ষে বহন করা কঠিন।
সদর উপজেলার বাসিন্দা নাহিদা সুলতানা বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা পাব বলে এসেছিলাম। কিন্তু সিজার হয় না বলে অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছে। গরিব মানুষের জন্য এটা খুবই কষ্টের।’
রোগীর স্বজন সাইমন শুভ্র বলেন, নরমাল ডেলিভারি সম্ভব না হলেই রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। জরুরি সময়ে রোগী নিয়ে ছুটতে হয়, আবার অতিরিক্ত টাকাও খরচ হয়।
শুধু সিজারিয়ান সেবাই নয়, চিকিৎসাসামগ্রীর সংকটও রয়েছে কেন্দ্রটিতে। প্রয়োজনীয় ডেলিভারি কিটের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে সেবাদান। এছাড়া কেন্দ্রটির একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
ঠাকুরগাঁও মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) ডা. লাবণী বসাক বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অবসরে গেছেন। অবসরের পর এক মাস দায়িত্ব পালন করলেও পরে আর আসেননি। সে কারণেই সিজারিয়ান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। যেসব মায়ের সিজার প্রয়োজন হচ্ছে, তাদের অন্য হাসপাতালে রেফার করতে হচ্ছে।
অ্যাম্বুলেন্স প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই বছর ধরে জ্বালানির জন্য কোনো বাজেট পাওয়া যাচ্ছে না। পেট্রল পাম্পের কাছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। তাই জ্বালানি সরবরাহও বন্ধ। চিকিৎসাসামগ্রীর বিষয়ে তিনি জানান, প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২টি ডেলিভারি কিট প্রয়োজন হলেও জানুয়ারিতে পাওয়া গেছে আটটি এবং ফেব্রুয়ারিতে মাত্র দুটি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একজন অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে জেলার গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি মাতৃসেবা প্রতিষ্ঠানে মাসের পর মাস সিজারিয়ান কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও তা চালুর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের অন্তঃসত্ত্বা নারীরা।
তাদের দাবি, দ্রুত একজন অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ এবং অ্যাম্বুলেন্স সচল করে ঠাকুরগাঁও মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ সেবা নিশ্চিত করা হোক। তা না হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিম্নবিত্ত পরিবারের গর্ভবতী নারীরা স্বল্প ব্যয়ে কাঙ্ক্ষিত মাতৃসেবা থেকে বঞ্চিত হতে থাকবেন।