
ফরিদপুরে মোবাইল নম্বর ক্লোন এবং ব্যাংক কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন-হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সর্বশেষ ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকীর মোবাইল নম্বর ক্লোন করে তার পরিচিতজনদের কাছে টাকা দাবি করে একটি প্রতারক চক্র। এর আগে একই কৌশলে ব্যাংকের কর্মকর্তা পরিচয়ে এক সরকারি কর্মচারীর ব্যাংক হিসাব থেকে ৮০ হাজার টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়া হয়। দুই ঘটনায় মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকারও বেশি।
গতকার রোববার ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। পুলিশ ও জিডি সূত্রে জানা যায়, রোববার দুপুর ১২টা ২৪ মিনিটে ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকীর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে শহরের গুহলক্ষ্মীপুর এলাকার বাসিন্দা মো. নাঈম মোল্লার হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা আসে। বার্তায় একটি বিকাশ নম্বরে ১০ হাজার টাকা পাঠাতে বলা হয়। বিষয়টি যাচাই না করেই তিনি দুপুর ১২টা ৩৬ মিনিটে ওই টাকা পাঠিয়ে দেন।
এরপর আরেকটি বিকাশ নম্বরে আরও ৩০ হাজার ৫৪০ টাকা পাঠাতে বলা হলে দুপুর ১টা ৯ মিনিটে সেটিও পাঠিয়ে দেন। পরে আরও ২০ হাজার টাকা চাওয়া হলে তার সন্দেহ হয়। তখন তিনি কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, তার মোবাইল নম্বর ক্লোন করে প্রতারক চক্র এ প্রতারণা চালিয়েছে। এ ঘটনায় প্রতারণার শিকার নাঈম মোল্লা কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন।
ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব পিয়াল এক সতর্কবার্তায় জানান, সভাপতির মোবাইল নম্বর ক্লোন করে প্রতারকরা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে টাকা চাইছে। তিনি সবাইকে অনুরোধ করেন, ওই নম্বর থেকে টাকা চাওয়া হলে যেন কেউ অর্থ পাঠানো, ওটিপি, পিন নম্বর বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করেন।
ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, আমার জানা মতে ইতোমধ্যে ৪০ হাজার টাকার বেশি প্রতারণা হয়েছে। আরও কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। এর আগে গত ৬ জুন ব্যাংকের হেড অফিসের কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে ফরিদপুর জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সরকারি কর্মচারী আজাদ আলীর ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের হিসাব থেকে মোট ৮০ হাজার ২০ টাকা হাতিয়ে নেয় একই ধরনের একটি প্রতারক চক্র।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রথমে একটি নম্বর থেকে নিজেকে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে আজাদ আলীকে জানানো হয়, তার ব্যাংক হিসাব বন্ধ হয়ে যাবে। পরে আরেক ব্যক্তি হোয়াটসঅ্যাপে তার ভিসা কার্ড ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি পাঠাতে বলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওটিপি সংগ্রহ করে প্রতারকরা ডাচ্-বাংলা ব্যাংক থেকে ৬০ হাজার এবং সোনালী ব্যাংক থেকে ২০ হাজার ২০ টাকা তুলে নেয়।
ঘটনার চার দিন পর ১০ জুন কোতোয়ালি থানায় প্রতারণার অভিযোগে মামলা করেন আজাদ আলী। মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় মামলা রুজু করা হয়। ব্যাংকের লেনদেনের বিবরণও আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।
আজাদ আলী বলেন, ব্যাংকের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। আমার মতো আরও অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। দ্রুত চক্রটিকে গ্রেপ্তার ও টাকা উদ্ধারের দাবি জানাই।
ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রেসক্লাব সভাপতির মোবাইল নম্বর ক্লোনের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরির ভিত্তিতে প্রতারক চক্রকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ব্যাংক প্রতারণা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই হিরামন বিশ্বাস বলেন, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। কল রেকর্ড, ব্যাংক লেনদেন ও ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান কখনো ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্য কোনো মাধ্যমে গ্রাহকের কার্ড নম্বর, সিভিভি, ওটিপি কিংবা পিন নম্বর জানতে চায় না। এ ধরনের তথ্য শেয়ার না করা এবং অর্থ পাঠানোর আগে পরিচয় নিশ্চিত হওয়াই প্রতারণা এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।