
ফরিদপুরে যৌতুকের এক লাখ টাকা না পেয়ে রমা বিশ্বাস (২৫) নামের এক গৃহবধূকে শ্বাসরোধে হত্যার দায়ে স্বামী মনোজিত সরকারকে (৪৩) আমৃত্যু কারাদণ্ড ও ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন আদালত। জরিমানার এই সম্পূর্ণ টাকা আদায় করে ভুক্তভোগীর পরিবারকে দেওয়ার জন্য ফরিদপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুর দেড়টার দিকে ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) শামীমা পারভীন এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মনোজিত সরকার আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন। পরে তার নামে ওয়ারেন্ট জারি করা হয়। তবে, এ মামলায় সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় মামলার এজাহারভুক্ত অন্য ছয় আসামিকে, যারা প্রত্যেকেই মনোজিতের নিকটাত্মীয়, তাদেরকে আদালত বেকসুর খালাস প্রদান করেন। তারা হলেন- বিপুল সরকার (৫৩), সরজিৎ সরকার (৪৬), লিটন সরকার (৩৬), বিপ্লব সরকার (৩৩), সবুজ সরকার (৩০) ও দীপালী সরকার (৪৮)। মামলার বিবরণী ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে হিন্দু ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী মধুখালী উপজেলার জারজননগর গ্রামের রঞ্জন বিশ্বাসের মেয়ে রমা বিশ্বাসের সঙ্গে একই উপজেলার কলাইকান্দা গ্রামের চিত্তরঞ্জন সরকারের ছেলে মনোজিত সরকারের বিয়ে হয়। এই দম্পতির বর্তমানে নয় বছর বয়সি একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ সালে রমার বিয়ের সময় চার লাখ টাকা, সাড়ে তিন ভরি সোনা এবং ৫০ হাজার টাকার ফার্নিচার যৌতুক হিসেবে দেওয়া হয় মনোজিতকে। এরপর ধাপে ধাপে ২০১৫ সাল থেকে ২০১৮ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত নগদ আরও এক লাখ টাকা যৌতুক হিসেবে তাকে দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৫ এপ্রিল শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে নগদ এক লাখ টাকা যৌতুকের দাবি করেন মনোজিত। এই টাকা দিতে না পারায় ২০ এপ্রিল বিকেল চারটার দিকে স্ত্রী রমা বিশ্বাসকে গলায় নাইলনের সুতা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।
মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, স্ত্রীকে হত্যা করে মধুখালী থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেন তিনি। এছাড়া শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে জানান পেটের ব্যথা সহ্য করতে না পেরে রমা আত্মহত্যা করেছে। পরে হাসপাতালের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও পুলিশ নিশ্চিত হয় এটি আত্মহত্যা নয়, বরং তাকে হত্যা করা হয়েছে। পরে ১০ মে রমার বাবা রঞ্জন বিশ্বাস বাদী হয়ে মনোজিত ও তার ৬ জন আত্মীয়ের নাম উল্লেখ করে তার মেয়েকে যৌতুকের দাবিতে হত্যার অভিযোগ এনে মধুখালী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করেন মধুখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহাবুল করিম। তিনি মামলাটি তদন্ত করে এজাহারে উল্লিখিত মনোজিত সরকার ও তার ৬ জন আত্মীয়কে অভিযুক্ত করে মোট ৭ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর এই অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) গোলাম রব্বানী ভূঁইয়া বলেন, বর্তমানে যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। যৌতুকের প্রবণতা কমাতে এবং অপরাধ করলে যে অবশ্যই সাজা পেতে হবে, এ রায়ের মাধ্যমে সেই বার্তা সমাজে পৌঁছাবে। তিনি বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর ফলে সমাজে এ ধরনের অপরাধের প্রবণতা কমে আসবে।