
নতুন কোনো করারোপ ছাড়াই নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) এর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ৬০ কোটি ৯৯ লাখ ৭৫ হাজার ১১২ টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ বাজেট।
গতকাল বৃহস্পতিবার নগরভবনের অডিটোরিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বাজেট ঘোষণা করেন সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাড. সাখাওয়াত হোসেন খান। এটি নাসিকের ১৫তম বাজেট এবং প্রশাসক হিসেবে তার প্রথম বাজেট ঘোষণা।
গত অর্থবছরে নাসিকের বাজেট ছিল ৭৭৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। সেই তুলনায় এবারের বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে সর্বোচ্চ ৮৭৯ কোটি টাকার বাজেট ঘোষিত হয়েছিল ২০২৪-২৫ অর্থবছরে।
এবারের বাজেটে নতুন কোনো কর আরোপ করা হয়নি, বরং ছাদবাগানিদের জন্য আগের ২৭ শতাংশ গৃহকর ছাড়ের সঙ্গে এবার আরও দুই শতাংশ যুক্ত করা হয়েছে বলে জানান প্রশাসক সাখাওয়াত।
তিনি বলেন, এবারের বাজেটে নাগরিক দুর্ভোগ লাঘবকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, সুপেয় পানির সরবরাহ বৃদ্ধি, মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার, খাল খনন ও পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে বাড়তি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
পাশাপাশি নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতেও অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯৩০ কোটি টাকা। এতে ১৩০ কোটির বেশি উদ্বৃত্ত রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এবার বাজেটের অর্থায়নের প্রধান উৎস হিসেবে নিজস্ব রাজস্ব আয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানালেও ৫২ শতাংশ আয় বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প সহায়তা হিসেবে দেখানো হয়েছে। এবং ৬৭ শতাংশ ব্যয়ও একই খাতের মধ্য থেকে ব্যয়ের কথা বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে, রাজস্ব আদায় বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনবল বাড়ানোর প্রতি নজর দেওয়ার কথা জানান সিটি প্রশাসক। রাজস্ব আদায়ের ৪৬ শতাংশ এই খাতের উন্নয়নের জন্য ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবারের বাজেটে।
এছাড়া পানি সরবরাহ খাতের আয়, সরকারি উন্নয়ন সহায়তা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে প্রাপ্ত অর্থও বাজেট বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন পাইপলাইন, ২৮০ কিলোমিটার বিতরণ পাইপলাইন, ১৪টি ডিস্ট্রিক্ট মিটারড এরিয়া (ডিএমএ), ৩৫ হাজার স্মার্ট পানির সংযোগ, ৩৫ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ বা পুনর্নিরমাণ এবং পাঁচ হেক্টর জায়গাজুড়ে পার্ক, খেলার মাঠ ও কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এছাড়া ২৭টি ওয়ার্ডে মোট ৫৪টি পানির পাম্প স্থাপন, জালকুড়ির স্থায়ী ডাম্পিং গ্রাউন্ড চালু, কদমরসুলে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য অধিগ্রহণকৃত জমিতে অবকাঠামো নির্মাণ, হকার পুনর্বাসন, বিকল্প সড়ক নির্মাণ, ধর্মীয় স্থাপনার উন্নয়ন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে ৩০টি স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প নির্মাণের বিষয়ও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ সময় প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান আরও বলেন, অতীতে রাজনৈতিক বিভাজন ও রশি টানাটানির কারণে নারায়ণগঞ্জ নগরী কাঙ্ক্ষিক্ষত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় নারায়ণগঞ্জকে সুখী, সমৃদ্ধশালী, ব্যবসা, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
নগর পরিকল্পনাবিদ মঈনুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত বাজেট ঘোষণায় উপস্থিত ছিলেন, নারায়ণগঞ্জ ৫ আসনের সাংসদ আবুল কালাম, নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাসুকুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, নাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) নূর কুতুবুল আলম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আজগর হোসেন এবং প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হেমায়েত হোসেনসহ বিএনপি, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনের শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনের নেতারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।