
বয়স ৬৫ বছর। জীবনের প্রায় ৪০টি বছর কেটে গেছে নৌকার বৈঠা হাতে। প্রতিদিন নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে মানুষ পারাপার করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই স্ত্রীকে নিয়ে চলছে তাঁর সংসার। নিজের কোনো জায়গাজমি নেই, নেই স্থায়ী কোনো আয়ের উৎস। বর্তমানে চরে অন্যের জায়গায় বসবাস করছেন তিনি। জীবনের শেষ বয়সেও থামেনি তার সংগ্রাম। তিনি ধানু হাওলাদার। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার ৮ নম্বর দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের ধানুর খেওয়া ঘাটে প্রতিদিন দেখা মেলে এই প্রবীণ মাঝির। মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে মানুষ পারাপার করেই দীর্ঘ চার দশক ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। নৌকার সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু পেশার নয়, এই নৌকাই তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। ধানু হাওলাদারের নৌকায় নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যেতে একজন যাত্রীর ভাড়া ১০ টাকা। আবার ওপার থেকে ফিরে এলে দিতে হয় আরও ১০ টাকা। তবে সব যাত্রী যে নিয়মিত ভাড়া দেন, তা নয়। অনেক সময় কেউ ভাড়া না দিলেও কিছু বলেন না তিনি। মানুষের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে কখনো কখনো বিনা ভাড়াতেও পারাপার করে দেন। সারাদিন নৌকা চালিয়ে যে আয় হয়, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাতে হয় তাকে। ধানু হাওলাদার জানান, বাজারের দিন ঘাটে মানুষের যাতায়াত বেশি থাকে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের মানুষ বাজারে আসা-যাওয়া করলে সেদিন তার আয় কিছুটা ভালো হয়। বাজারের দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। তবে অন্য দিনগুলোতে যাত্রী কম থাকায় আয় নেমে আসে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। ধানু হাওলাদার বলেন, বাজারের দিন মানুষ চর থেকে বেশি আসে।
ওইদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা ইনকাম হয়। অন্য দিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা হয়। একবার নদীর ওই পারে গেলে ১০ টাকা, আবার আসলে ১০ টাকা। অনেকে আবার টাকা দেয় না, তখন কিছু বলি না। এই সামান্য আয় দিয়েই শুধু নিজের জীবন নয়, একসময় ছয় সন্তানকে মানুষ করেছেন ধানু হাওলাদার। অভাব-অনটনের সংসারে নৌকা চালিয়ে সন্তানদের বড় করেছেন। ছয় ছেলে-মেয়ের বিয়ে-শাদিও দিয়েছেন এই নৌকা চালিয়ে উপার্জন করা অর্থ দিয়ে। তার এক মেয়েকে এসএসসি পর্যন্ত পড়াতে পেরেছেন। সন্তানরা এখন সবাই যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। ফলে বৃদ্ধ বয়সে স্ত্রীকে নিয়ে নিজের জীবনযুদ্ধ নিজেকেই চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো-৪০ বছর নৌকা চালিয়েও নিজের জন্য এক টুকরো জায়গাজমি করতে পারেননি ধানু হাওলাদার। বর্তমানে দক্ষিণ চরবংশীর চরে অন্যের জায়গায় স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছেন। নিজের কোনো জমি বা স্থায়ী সম্পদ না থাকায় ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।
শুধু জায়গাজমিই নয়, ৬৫ বছর বয়সেও বয়স্ক ভাতা থেকে বঞ্চিত এই প্রবীণ মাঝি। বয়সের ভারে শরীর আগের মতো শক্তিশালী না হলেও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন নৌকা নিয়ে নদীতে নামতে হয়। রোদণ্ডবৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া-সবকিছু উপেক্ষা করে যাত্রী পারাপার করতে হয় তাকে।
ধানু হাওলাদারের আক্ষেপ, দীর্ঘদিন ধরে নৌকা চালিয়ে মানুষের সেবা করলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাননি। মেম্বার-চেয়ারম্যানদের কাছে সহযোগিতা চেয়েও সাড়া মেলেনি বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, মেম্বার-চেয়ারম্যানরা কখনো কোনো অনুদান দেয় না। কিছু চাইলেও দেয় না। এত বছর নৌকা চালিয়ে সংসার চালালাম। এখন বয়স হয়েছে, কিন্তু কোনো সহযোগিতা পাইনি। ধানু হাওলাদারের জীবনের গল্প শুধু একজন মাঝির গল্প নয়; এটি নদীঘেরা চরাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। ১০ টাকার ভাড়ায় মানুষ পারাপার করে যে অর্থ তিনি আয় করেন, তা হয়ত অনেকের কাছে সামান্য। কিন্তু এই সামান্য আয় দিয়েই তিনি একসময় ছয় সন্তানকে বড় করেছেন, তাদের বিয়ে দিয়েছেন এবং এখনও স্ত্রীকে নিয়ে জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন।
বৃদ্ধ বয়সে সরকারি সহায়তা, বয়স্ক ভাতা কিংবা একটি স্থায়ী আশ্রয়ের প্রত্যাশা তাঁর। নিজের কোনো জায়গাজমি না থাকায় অন্যের জায়গায় বসবাস করা ধানু হাওলাদার চান, জীবনের শেষ সময়ে যেন অন্তত একটু নিরাপদে স্ত্রীকে নিয়ে থাকতে পারেন। তবে সেই আশায় এখনও প্রতিদিন নৌকার বৈঠা হাতে নদীতে নামেন তিনি। এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে মানুষ পারাপার করেন, আর ১০ টাকার বিনিময়ে চালিয়ে যান নিজের জীবনসংগ্রাম।