ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

প্রায় দুই দশক তালাবদ্ধ শেখ ফজলল করিমের স্মৃতি পাঠাগার

প্রায় দুই দশক তালাবদ্ধ শেখ ফজলল করিমের স্মৃতি পাঠাগার

'কোথায় স্বর্গ/কোথায় নরক কে বলে তা বহুদুর/মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক/মানুষেতে সুরাসুর'-কালজয়ী এই অমর পংক্তির স্রষ্টা, 'সাহিত্য বিশারদ', 'কাব্যরত্নাকর' ও 'নীতিভূষণ' উপাধিতে ভূষিত কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতিচিহ্নগুলো আজ চরম অবহেলা আর অযত্নে অবলুপ্তির পথে। যার লেখনী যুগের পর যুগ মানুষকে মানবতার পরম শিক্ষা দিয়ে আসছে, লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনায় অবস্থিত সেই মহাকবির স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন ও ব্যবহৃত বিরল সরঞ্জামাদি ধূলিসাৎ হতে চলেছে। সরকারি সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে এই চারণকবির উজ্জ্বল ইতিহাস।

রংপুর জেলার (বর্তমানে লালমনিরহাট) কালীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক কাকিনায় জন্ম নেন কবি শেখ ফজলল করিম। ১৮৮২ সালের ১৪ এপ্রিল তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আমীর উল্লাহ্‌ সরদার ছিলেন কাকিনা মহারাজার বিশ্বস্ত রাজকর্মচারী এবং মা কোকিলা বিবি। কাকিনা মিডল ইংলিশ স্কুল (বর্তমানে কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়) ও রংপুর জেলা স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হলেও তা দীর্ঘায়িত হয়নি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে গঙ্গাচড়ার কোলকোন্দের বিদুষী নারী বসিরন নেছা খাতুনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তিনি সাংসারিক জীবনে প্রবেশ করেন।

?সামান্য চাকরি জীবন ছেড়ে তিনি অল্প বয়স থেকেই নিজেকে সাহিত্য ও সমাজসেবায় সঁপে দেন। নিজস্ব সঞ্চিত দেড় সহস্রাধিক টাকা ব্যয়ে কাকিনায় 'সাহাবিয়া প্রিন্টিং ওয়ার্কস্‌' নামে ছাপাখানা বসান এবং সেখান থেকে ১৯০৮ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত নিয়মিত সম্পাদনা করেন 'বাসনা' নামের খ্যাতনামা মাসিক পত্রিকা। এছাড়া এখান থেকে 'জমজম', 'কল্লোলিনী' ও 'রত্নপ্রদীপ' প্রকাশিত হতো।

?গদ্য ও পদ্য মিলিয়ে তাঁর প্রায় ৪৫টি গ্রন্থ রয়েছে। এর মধ্যে 'তৃষ্ণা', 'পরিত্রাণ কাব্য', 'ভগ্নবীণা', 'লাইলী-মজনু', 'পথ ও পাথেয়' এবং 'আফগানিস্তানের ইতিহাস' অন্যতম। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন সময়ে তিনি 'নীতিভূষণ', 'সাহিত্য বিশারদ' ও 'কাব্যভূষণ' উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৩৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর কাকিনাতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন এই মহাজাগতিক সাহিত্যসাধক।

কাকিনায় কবির বাস্তুভিটায় গিয়ে দেখা যায়, জীর্ণ আধাপাকা ঘরের একটি কক্ষে চরম অযত্নে পড়ে আছে কবির ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী কাঠের খাট, আরামচেয়ার, প্রিয় টুপি, দোয়াত-কলম, অতি ক্ষুদ্রাকৃতির পবিত্র কোরআন শরীফ, ম্যাগনিফায়িং গ্লাস, বোতাম ও অন্যান্য দুর্লভ সরঞ্জাম। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় কবির উত্তরসূরিরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে এগুলো আগলে রাখার চেষ্টা করছেন, যা এখন তাঁদের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে।

অন্যদিকে, কাকিনা বাজারে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কের পাশে ২০০৫ সালে তৎকালীন সরকারের উপমন্ত্রী (বর্তমান ত্রাণ মন্ত্রী) আসাদুল হাবিব দুলুর উদ্যোগে 'কবি শেখ ফজলল করিম স্মৃতি গণপাঠাগার' নির্মিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে তা তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অযত্ন-অবহেলায় জ্ঞানচর্চার অন্যতম এই কেন্দ্রটির ফটক দখল করে গড়ে উঠেছে দোকানপাট, আর চারপাশ রূপ নিয়েছে বর্জ্যের স্তূপে। স্থানীয়দের দাবি-কবির নামে তিস্তা সেতুর নামকরণের দাবি উপেক্ষিত হলেও কবির স্মৃতিগুলো অন্তত রক্ষা করা হোক।

ঢাকা টাঙ্গাইল থেকে আসা দর্শনার্থী বলেন, দেশের এত বড় একজন পণ্ডিত মানুষ কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতি দেখতে এসেছি। অযত্ন আর অবহেলায় কবির ব্যবহৃত জিনিসগুলো নষ্ট হচ্ছে। সরকারের সংস্কৃতিক মন্ত্রনালয় বা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ একটু উদ্যোগ নিলে এসব সংরক্ষন সম্ভব। আমরা চাই সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিবে।

কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহাদত আল সিয়াম আক্ষেপ প্রকাশ করে বলে, কবির স্মৃতি এভাবে নষ্ট হতে দেখে আমরা ব্যথিত। পাঠাগারটি দ্রুত চালু ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

কবির নাতির ছেলে (পুতি) শেখ ফিরোজ বলেন, দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিদিন অনেক সাহিত্যানুরাগী আসেন। কিন্তু লোকবল ও আর্থিক সংকটে স্বজনদের পক্ষে এই স্মৃতি রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের উচিত অবিলম্বে একটি জাদুঘর নির্মাণ করে এগুলো সংরক্ষণ করা। একইসাথে কবির কালজয়ী 'কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক' কবিতাটি পাঠ্যপুস্তকে পুনঃরায় অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।

স্থানীয় বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবির বাবু বলেন, লালমনিরহাটের প্রধান গর্ব কবি শেখ ফজলল করিম। পাঠাগারটি অবিলম্বে চালু করে কবির সরঞ্জাম সংরক্ষণে আধুনিক জাদুঘর গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, বন্ধ হয়ে থাকা পাঠাগারটি দ্রুত চালু করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি কবির ব্যবহৃত দুর্লভ স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হবে।

?প্রবাহমান সময়ের গতিতে কবি বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর অনন্য সৃষ্টি। নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাসের আলো দেখাতে কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতি রক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে-এমনটাই প্রত্যাশা লালমনিরহাটবাসীর।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত