
কুমিল্লার চান্দিনায় নীরবে ঘটে গেছে এক রূপালী বিপ্লব। দিগন্তবিস্তৃত মেঠোপথ ধরে হেঁটে গেলে চোখে পড়ে কেবল ছোট-বড় মাছের দীঘি ও মৎস্য প্রজেক্ট। চান্দিনার আনাচে-কানাচে এখন চাষীদের মাঝে চলছে স্বাস্থ্যকর এক প্রতিযোগিতা, কে কত বেশি মাছ উৎপাদন করতে পারেন, কার প্রজেক্ট কত বিশাল। কেবল তরুণ কিংবা অভিজ্ঞ চাষীরাই নন, শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত সর্বস্তরের ভূমির মালিকরা এখন পুরোদমে ঝুঁকছেন মাছ চাষের দিকে। লাভজনক এই ব্যবসায় নিজেদের মেধা ও শ্রম ঢেলে দিয়ে তারা আজ কেবল নিজেদের ভাগ্যই বদলাননি, পুরো চান্দিনাকে দেশের মৎস্য সম্পদের এক সমৃদ্ধ কেন্দ্রে পরিণত করেছেন।
প্রজেক্টগুলোতে ঘুরে তাকালেই চোখে পড়ে প্রাণবন্ত এক কর্মযজ্ঞ। প্রজেক্টের নীল জলে নির্দিষ্ট সময় পর পর ভেসে উঠছে রূপালী মাছের ঝাঁক। পরম মমতায় চাষীরা খাদ্যের ছররা ছিটিয়ে দিচ্ছেন পানিতে। আবার শালিক, চিল বা অন্যান্য ক্ষতিকর পাখিদের হাত থেকে সাধের প্রজেক্ট ও মূল্যবান মাছ রক্ষা করতে জলাশয়ের ওপর খাটিয়ে দেয়া হয়েছে সুবিশাল সুরক্ষাজাল। এ যেন কেবল একটি ব্যবসা নয়, প্রতিটি প্রজেক্টই চাষীদের রক্ত-ঘামে গড়ে ওঠা স্বপ্ন আর সাহসের এক অনন্য প্রতীক। তবে মাছ উৎপাদনের এই কর্মযজ্ঞ কেবল চাষীদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। চাষীদের তৈরি করা এই সমৃদ্ধ মৎস্য সম্পদকে দেশের কোণে কোণে পৌঁছে দিতে নেমেছেন দূরদর্শী মৎস্য ব্যবসায়ীরা। প্রজেক্টের মাছ কে কার আগে এবং কত দামে কিনতে পারবেন, তা নিয়ে তাদের মধ্যেও চলছে এক প্রতিযোগিতামূলক বাজার। চান্দিনার আনাচে-কানাচে ঘুরে ঘুরে ব্যবসায়ীরা এককালীন চুক্তিতে মৎস্য প্রজেক্ট কিনে নেন। দিনের আলো নিভে রাত নামলেই শুরু হয় মূল তৎপরতা। প্রজেক্টের শান্ত জলে জাল ফেলে রাতের আঁধারেই মাছ ধরা হয়। মেপেঝোঁপে ট্রাক কিংবা পিকআপে তুলে রাতারাতি সেই তাজা মাছ চালান হয়ে যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুরসহ দেশের বড় বড় আড়তগুলোতে। ভোর হওয়ার আগেই দেশের কোটি মানুষের পাতে চান্দিনার মাছ পৌঁছে দেয়ার এই নিরবচ্ছিন্ন উদ্যোগ যেন এক অলিখিত মিরাকল। এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে গড়ে উঠেছে এক সুবিশাল সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনী। মাছ চাষের এই গতিশীল অর্থনীতি উপজেলার হাজার হাজার বেকার মানুষের জন্য খুলে দিয়েছে কাজের নতুন দুয়ার। রাত জেগে প্রজেক্ট থেকে মাছ ধরা, ওজন মাপা, সতর্কতার সাথে গাড়িতে মাছ সাজানো এবং দূরের আড়তে গিয়ে হিসেব-নিকাশ শেষে টাকা নিয়ে ফিরে আসা, সবকিছুতেই ভূমিকা রাখছে এই খেটে খাওয়া মানুষগুলো। প্রতিটি রাতের শ্রমের বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন ছয়শত থেকে সাতশত টাকা পর্যন্ত হাজিরা, যা দিয়ে সচ্ছলভাবে চলছে তাদের পরিবার। মেহার গ্রামের দীর্ঘদিনের মৎস্য ব্যবসায়ী রোকন সরকার জানান, বিগত ১০-১৫ বছর ধরে এই ব্যবসার সাথে যুক্ত থেকে তিনি আজ কেবল নিজের অবস্থানই তৈরি করেননি, বরং প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন বেকার মানুষকে স্থায়ী উপার্জনের পথ দেখিয়েছেন। ব্যবসায়ী আবুল কালামের ভাষায়, এই খাত কেবল স্থানীয় শ্রমিকদেরই জীবিকা দিচ্ছে না, বরং মাছ পরিবহনের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ট্রাক ও পিকআপ পরিবহন চালকদের জীবনযাত্রায় যোগ করছে নতুন গতি। চান্দিনার মৎস্য বিপ্লবের সবচেয়ে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহাসিক 'গোবরার বিল'। একসময় যেখানে হাজার হাজার একর জমিতে বছরে মাত্র একটি ধান ফসল হতো এবং বাকিটা সময় বিস্তীর্ণ প্রান্তর একলা পড়ে থাকত, আজ সেই পরিত্যক্ত গোবরার বিল রূপ নিয়েছে কোটি টাকার অর্থনৈতিক অঞ্চলে। চান্দিনাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত উদ্যমী চাষীরা এই এক ফসলী জমিগুলো লিজ নিয়ে গড়ে তুলেছেন আধুনিক মৎস্য প্রজেক্ট। যে জমিতে আগে শুধুই শূন্যতা বাসা বাঁধত, আজ সেখানে জলে ভেসে উঠছে হাজার হাজার চাষীর লক্ষ লক্ষ টাকার স্বপ্ন। চান্দিনার এই নীরব মাছ বিপ্লব আজ প্রমাণ করে দিয়েছে, সঠিক উদ্যোগ, মানুষের কর্মস্পৃহা এবং সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো অনাবাদী প্রান্তরও হতে পারে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল চালিকাশক্তি।