প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে সময় যেন ক্রমাগত ছুটছে; কিন্তু আমরা নিজেরা ক্রমেই ক্লান্ত হচ্ছি। শহরের যানজট, অফিসের টার্গেট, পারিবারিক চাপ, সামাজিক তুলনা; সব মিলিয়ে আমাদের প্রতিদিনের জীবন এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই যুদ্ধ বাইরের নয়; এটি ভেতরের। নাম তার মানসিক স্বাস্থ্যসংকট। মানুষ আজ আগের চেয়ে বেশি শিক্ষিত, সংযুক্ত, ব্যস্ত এবং উচ্চাভিলাষী। অথচ একইসঙ্গে আগের চেয়ে বেশি নিঃসঙ্গ, উদ্বিগ্ন ও ক্লান্ত। এই বৈপরীত্যই আধুনিক জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর বাস্তবতা।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই শুরু হয় এক প্রতিযোগিতা, সময়কে হারানোর প্রতিযোগিতা। ঘড়ির কাঁটা, অফিসের রিপোর্ট, স্কুলের রুটিন, মোবাইল নোটিফিকেশন; সবকিছুই আমাদের মনে এক ধরনের স্থায়ী চাপ সৃষ্টি করে। আজকের মানুষ যতই সফল হোক না কেন, তার জীবনের ছন্দ এখন মেশিনের মতো নির্ধারিত, পুনরাবৃত্ত আর কখনও কখনও অর্থহীন। আমরা দিন-রাত স্ক্রিনে ডুবে আছি; স্মার্টফোন, টিভি, ল্যাপটপ।
এই ক্রমাগত তথ্য-আক্রমণ মস্তিষ্ককে বিশ্রাম নিতে দেয় না। ডিজিটাল ডিটক্স, অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময় প্রযুক্তিমুক্ত থাকা মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে কার্যকর।
রাতে যখন বাড়ি ফিরে আসে, তখন শরীর ক্লান্ত হলেও মন শান্ত হয় না। কারণ সেদিনও সে অপূর্ণ থেকে যায়, কিছু না কিছু করতে না পারার অপরাধবোধে। এভাবেই জন্ম নেয় মানসিক ক্লান্তি, যা ধীরে ধীরে উদ্বেগ, অনিদ্রা, অবসাদ ও হতাশায় রূপ মানসিক স্বাস্থ্য মানে শুধু মানসিক রোগের অনুপস্থিতি নয়; বরং এমন এক ভারসাম্য, যেখানে মানুষ নিজের অনুভূতি বুঝতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে এবং নিজের জীবনে অর্থ খুঁজে পায়।
দুঃখজনকভাবে, আমাদের সমাজে এখনও মানসিক স্বাস্থ্যকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কেউ শারীরিক অসুস্থ হলে আমরা সমবেদনা জানাই; কিন্তু কেউ যদি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, আমরা বলি, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’, ‘এত ছোট ব্যাপারে মন খারাপ করিস কেন?’
এই সামাজিক মানসিকতাই মানুষকে চুপ থাকতে শেখায়। সে নিজের কষ্ট আড়াল করে, মুখে হাসি রাখে, অথচ ভেতরে যুদ্ধ চলে অবিরাম।
ঢাকা-চট্টগ্রাম বা অন্য বড় শহরগুলোতে জীবন এখন ‘দৌড়’ আর ‘ডেডলাইন’-এর সমার্থক। দিন শুরু হয় ট্রাফিকে, শেষ হয় কম্পিউটারের সামনে। মানুষে মানুষে সংযোগ আছে প্রযুক্তির মাধ্যমে; কিন্তু হৃদয়ের সংযোগ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। একজন তরুণী অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকে; ঘরে ফিরে দেখেন পরিবারে কারও সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। একজন মধ্যবয়সী মানুষ অফিসের চাপে প্রতিদিন ওষুধ খায়; কিন্তু কারও সঙ্গে নিজের চিন্তা শেয়ার করার জায়গা নেই। একজন ছাত্র অনলাইনে সারাদিন যুক্ত; কিন্তু তার ভিতরের নিঃসঙ্গতা বোঝার কেউ নেই। এই নিঃসঙ্গতাই আজ শহুরে মানসিক সমস্যার সবচেয়ে বড় উৎস।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই ভার্চুয়াল জগতে সবাই নিজের জীবনের সুন্দর অংশটুকু দেখায়; ভ্রমণ, চাকরি, প্রেম, সাফল্য। ফলে আমরা নিজেদের জীবনকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করি। যখন দেখি, অন্যরা ভালো আছে, অথচ আমরা এখনও সংগ্রামে; তখন মনে জন্ম নেয় হীনমন্যতা, অপরাধবোধ এবং আত্মদ্বন্দ্ব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি চারজনের একজন কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। বাংলাদেশে এ সংখ্যা প্রায় ১.৫ কোটি মানুষ, কিন্তু চিকিৎসার বাইরে ৯২ শতাংশ রোগী। ২০২২ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৮ শতাংশ বিষণ্ণতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত। কিন্তু মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা বা পরামর্শ নিচ্ছেন। এটি শুধু ভয়াবহ নয়, এটি এক নীরব মহামারি।
অফিস, ব্যবসা বা পেশাগত জীবনে এখন প্রতিযোগিতা চরম। ‘স্মার্ট হতে হবে’, ‘টার্গেট পূরণ করতে হবে’, ‘সবসময় ব্যস্ত থাকতে হবে’ এই সংস্কৃতি মানুষকে ক্লান্ত করে ফেলছে। বাংলাদেশের কর্পোরেট কর্মীদের একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপে ভুগছেন। তারা নিয়মিত ঘুমের সমস্যা, একাগ্রতার অভাব, উত্তেজনা, এমনকি বার্নআউট সিনড্রোমে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ‘Career anxiety’ এবং ‘Imposter syndrome’ ভয়াবহ আকার নিচ্ছে, যেখানে তারা নিজেদের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহে ভোগেন, সবসময় মনে হয় ‘আমি যথেষ্ট ভালো নই।’
একসময় পরিবার ছিল মানসিক আশ্রয়ের জায়গা। আজ সেটি অনেকাংশে পরিণত হয়েছে দায়িত্বের কাঠামোতে। বাবা-মা অফিসে ব্যস্ত, সন্তানরা গ্যাজেটে ডুবে, দাদা-দাদি একা; একই ছাদের নিচে থেকেও যেন সবাই আলাদা। গ্রামীণ সমাজেও দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। পরস্পর নির্ভরতা ও যৌথ পারিবারিক মূল্যবোধ কমছে। ফলে মানসিক চাপ ও একাকীত্ব এখন শুধু শহরের নয়, গ্রামেরও বাস্তবতা।
নারীরা আজ শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছেন; কিন্তু মানসিক চাপে তারা এখনও সবচেয়ে বেশি ভোগেন। অফিসের চাপ, গৃহস্থালির দায়িত্ব, সামাজিক প্রত্যাশা, এবং নিরাপত্তাহীনতা; সব মিলিয়ে নারীদের মানসিক সুস্থতা সবচেয়ে ঝুঁকিতে। বিশেষ করে গার্মেন্টস কর্মী, শিক্ষার্থী ও গৃহিণীরা বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের শিকার হচ্ছেন। সমাজ তাদের কথা শুনতে চায় না; বরং ‘সহ্য করো’ সংস্কৃতি নারীদের কষ্টকে আরও গভীর করে তোলে।
বাংলাদেশে এখনও মানসিক চিকিৎসার কথা বলা এক ধরনের সামাজিক ট্যাবু। মানুষের বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য মানুষকে চিকিৎসা নিতে নিরুৎসাহিত করে। এখনও অনেকেই মনে করেন, বিষণ্ণতা বা উদ্বেগ ইচ্ছার জোরে ঠিক করা যায়। ফলে মানুষ নিজের ভেতরের যন্ত্রণা লুকিয়ে রাখে, যা পরে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে, আত্মহত্যা তার একটি চরম উদাহরণ। ডঐঙ বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেন, যাদের অধিকাংশই মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন; কিন্তু কোনো সহায়তা পাননি।
মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন-
মানসিক স্বাস্থ্যকে জাতীয় পর্যায়ে একটি স্বাস্থ্য অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা চালু করতে হবে, যাতে তরুণরা নিজেদের আবেগ বুঝতে শেখে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে মানসিক পরামর্শদাতা থাকা উচিত। কর্মীদের কাজের চাপ, বার্নআউট বা হতাশা নিয়ে কথা বলার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য মাত্র ০.৫ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। এ সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং টেলিকাউন্সেলিংয়ের মতো উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে খোলা আলোচনা প্রয়োজন; বাচ্চা, বাবা-মা, সঙ্গী সবাই যেন অনুভূতির কথা বলতে পারে। শোনার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে, কারণ অনেক সময় শোনাই সান্ত¡নার প্রথম ধাপ। প্রতিদিন কিছু সময় নিজের জন্য রাখতে হবে; হাঁটা, বই পড়া, ধ্যান, সংগীত বা নীরব থাকা। শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম খাবারও মানসিক সুস্থতার মূলভিত্তি।
মানসিক স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি বেঁচে থাকার মৌলিক শর্ত। আমাদের সমাজে যদি সহানুভূতি, শ্রবণ ও সম্মান ফিরে আসে, তাহলে অনেক মানসিক সংকট নিজে থেকেই কমে যাবে। কারণ, অনেক সময় একজন মানুষ চিকিৎসা নয়, শুধু একজন শ্রোতা চায়। মানসিক স্বাস্থ্য এখন আর কোনো একক ব্যক্তির বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের অংশ। একটি জাতি তখনই টেকসই হয়, যখন তার মানুষ শুধু শারীরিকভাবে নয় মানসিকভাবেও সুস্থ থাকে।
আজকের ব্যস্ত জীবন আমাদের যে অজানা যুদ্ধে ফেলে দিয়েছে, তার প্রতিরোধ একটাই; সচেতনতা, সহানুভূতি ও সময়। নিজেকে একটু সময় দিন, প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলুন, প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকুন এবং প্রয়োজন হলে সাহায্য নিতে দ্বিধা করবেন না। কারণ আমরা সবাই যোদ্ধা এই অজানা যুদ্ধে। পার্থক্য শুধু এই যে, কেউ লড়ছে নীরবে, কেউ লড়ছে একা। সময় এসেছে এই নীরবতাকে ভাঙার।
আরিফুল ইসলাম রাফি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়